মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৩, ২৮ আষাঢ় ১৪২০
হাস্য কৌতুকে রবীন্দ্রনাথ
মোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল
রবীন্দ্রনাথকে আমরা জানি একজন সুখী লোক, একজন জমিদারের ছেলে, যাঁর কোন অভাব-অনটন নেই, সম্মানীয় ব্যক্তি, কবি ও একজন নিবিড় প্রেমিকের মাত্রায়।
রবীন্দ্রনাথের রসবোধ ছিল অতি উচ্চ মানের। রবীন্দ্রনাথ হাস্য-কৌতুক খুব ভালবাসতেন। সাহিত্যের একটি বিশাল জায়গাজুড়ে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের হাস্য- কৌতুক। শুধু সাহিত্যেই বা বলি কেন? ব্যক্তিগত দৈনন্দিন জীবনে আলাপ আলোচনায়ও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন হাস্য রসের নিপুণ কারিগর। এখানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি হাস্য-কৌতুক তুলে ধরা হলো-
গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় সে আমলে একজন বিখ্যাত নামকরা সঙ্গীত শিল্পী। প্রচুর ভক্ত-শ্রোতা, খুব নামডাক তার। কলকাতার জোড়া সাঁকোর ঠাকুর বাড়িতেই একবার বসেছে তাঁর বিখ্যাত গানের জলসা। রবীন্দ্রনাথও উপস্থিত ছিলেন সেই আসরে তার একজন ভক্ত শ্রোতা হিসেবে। গোপেশ্বর বাবু গান শুরু করলেন। এবার শ্রোতারা ধরলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একখানা গান গাইতে হবে। তা না হলে তার নিস্তার নেই। কবি অগত্যা রাজি হলেন, হাসি মুখে বলতে লাগলেন গোপেশ্বরের পর কি এবার দাড়িশ্বরের পালা?
রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তি নিকেতনে অবস্থান করছিলেন। কি ব্যাপারে যেন একটা সভা বসেছে শান্তি নিকেতনে। সভার শুরুতে যে ঘরটিতে সভা বসেছে তার সম্বন্ধে কেউ কেউ আলাপ করছিলেন ঘরটি বেশ জাঁকজমক ও সুন্দর। রবীন্দ্রনাথ হঠাৎ বলে উঠলেন-এ ঘরটিতে একটা বাঁ-দোর আছে। কবির কথা শুনে ঘরসুদ্ধ লোক একেবারে হতবাক। ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন। রবীন্দ্রনাথ তাদের অবস্থা দেখে মুচকি হেসে ফেললেন। বললেন বাঁদর নয়, আমি বাঁ-দোরের কথা বলছি। দেখছ না ঘরটির ডান দিকে একটি দরজা এবং বাঁ-দিকেও একটি দরজা।
রবীন্দ্রনাথ এক গ্রামে গেছেন বেড়াতে। আপ্যায়নের মহা আয়োজন। খাওয়ার দাওয়াত পড়ল এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। বহু আইটেম দিয়ে গৃহস্বামী খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। কবি বসলেন খেতে। সঙ্গে আছেন ক্ষিতি মোহন সেন শাস্ত্রী। গৃহস্বামী নিজে পরিবেশন করছেন। শাস্ত্রী মশাই ডিম খেতে গিয়েই বুঝলেন ডিমটা পচা। কী করবেন আড় চোখে দেখছিলেন কবি কী করেন। কবিও ডিম পচা বলে বুঝলেন। বুঝেও তিনি ডিমটা ভাতের সঙ্গে মুখে দিয়ে দিলেন। শাস্ত্রী মহাশয় পড়লেন মহা বিপদে। পচা ডিম তিনি খাবেন কী করে? গুরুর দেখাদেখি অগত্যা ওই পচা ডিমটিই তাকে গিলতে হলো। কিন্তু তার পেটটা তৎক্ষণাৎ প্রমাদ গুনল। সেই পচা ডিমটি এক মুহূর্তও সহ্য করল না, শাস্ত্রী মশাই সঙ্গে সঙ্গেই করলেন বমি। পরবর্তীতে সুযোগ পেয়ে কবিকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এই পচা ডিমটি হজম করলেন কী করে? আমি তো খেয়েই বমি। রবীন্দ্রনাথ হেসে বললেন। ‘আমি তো পচা ডিম খাইনি তাই বমিও করিনি।’ শাস্ত্রী মশাই অবাক হয়ে বললেন, সে কী কথা। আমি স্বচক্ষে দেখলুম ডিমটি আপনি মুখে দিলেন। কবি উত্তরে বললেন, আমিও কি সেই ডিম খেয়েছি নাকি? আমি সাদা দাড়ির ভেতর দিয়ে সেই ডিম চাপকানের মধ্যে চালান করে দিয়েছি। এখন মানে মানে বাড়ি ফিরতে পারলেই বাঁচি।
এক সাহিত্য সভায় রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত ছিলেন। সেই সভায় সাহিত্যিক বনফুল অর্থাৎ বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন। সেই সাহিত্য আসরে বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায় একটি অসম্ভব ভাল বক্তৃতা দিলেন। সভায় উপস্থিত সবাই তার বক্তৃতার খুব প্রশংসা করতে লাগল। রবীন্দ্রানাথ তখন বললেন, বলাই তো ভাল বক্তৃতা দেবেই কারণ বলাই তো ওর কাজ।
একবার এক বৈজ্ঞানিকের পুত্র কবির সাথে দেখা করতে আসেন। ছেলেটির ছিল মস্তিষ্ক বিকৃতি। কবির কাছে সে বায়না ধরলো কবিকে হাপু গান শোনাবে। কবি ধৈর্য ধরেই ছেলেটির গান শুনলেন। গান গেয়ে ছেলেটি বিদায় নিলে কবি বললেন, গানই বটে! একেবারে মেশিনগান।
রবীন্দ্রনাথ তখন অস্তাচলে, প্রায় শেষ শয্যায়। একদিন রবীন্দ্রনাথের ভক্ত সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অসুস্থ রবীন্দ্রনাথকে বললেন, ‘আমরা আপনার শত বার্ষিকী করব।’ রবীন্দ্রনাথ উত্তরে বললেন, শত বার্ষিকী মানে তা মাত্র পঁচিশ টাকা। ওতে আমার কোনও মোহ নেই। কিন্তু শত বার্ষিকী মানে পঁচিশ টাকা কেন? হাসির রাজা শিবরাম চক্রবর্তীর স্টাইলে রবীন্দ্রনাথ ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। শত বার্ষিকী মানে শত বার সিকি মানে পঁচিশ টাকা, তাইতো?
রবীন্দ্রনাথ তখন মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীর আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। কবি নিরামিষ খেতে পছন্দ করতেন। রোজই বিভিন্ন রকমের নিরামিষ রান্না হয়। একদিন হঠাৎ মগজ (ইৎধরহ) আনা হয়েেেছ। কবি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এ পদার্থটি কী? মৈত্রেয়ী দেবী উত্তর দিলেন ইৎধরহ। কবির চোখে-মুখে কপট গাম্ভীর্যের রেখা ফুটে উঠল। বললেন, বিশ্ব কবির ‘ব্রেনে’ ঘাটতি পড়েছে। এ কথাটি সোজাসুজি জানালেই হতো। এত কৌশল করা কেন। থাকগে, এ তর্কের চাইতে জরুরী ব্যাপার যখন সামনে তখন আর হাত গুটিয়ে বসে থাকা কেন।
শান্তি নিকেতনে অধ্যাপনা করতে এসেছিল ক্ষিতি মোহন সেন। অধ্যাপনায় মন লাগাতে না পেরে ভাবলেন অধ্যাপনা ছেড়ে কবিরাজি করবেন। বৈদ্যের ছেলে, অতএব বাবার ব্যবসাই করবেন। রবীন্দ্রনাথ তখন ইউরোপে প্রবাসে। কবির অনুপস্থিতিতে যাওয়াটা ঠিক হবে না। তিনি কবির আগমনের অপেক্ষায় রইলেন। যথাসময়ে কবি ইউরোপ থেকে ফিরে এলেন। এসেই তিনি শান্তি নিকেতনের অন্য এক অধ্যাপকের কাছে শুনতে পেলেন, ক্ষিতি মোহন বাবু অধ্যাপনা ছেড়ে কবিরাজি করবেন। শুনে তো কবি বিস্ময়ে হতবাক। কবি তৎক্ষণাৎ ক্ষিতি মোহন বাবুকে ডেকে পাঠালেন। কবির মনোভাব বুঝতে পেরে ক্ষিতি মোহন বাবু চিন্তায় পড়লেন। তিনি কবির কাছে এসে উপস্থিত হলেন। কবি তাকে বললেন, আপনি নাকি অধ্যাপনা ছেড়ে কবিরাজী করবেন বলে স্থির করেছেন?
কবির এ কথার উত্তরে ক্ষিতি বাবু এবার হাসতে হাসতে বললেন, কি আর করি, কবি যেখানে রাজি নন। কবিরাজী আর সেখানে কী করে হয়।
চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তখন বিখ্যাত ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। তিনি শিলাইদহ গেছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা আনতে। রবীন্দ্রনাথ তখন রয়েছেন পদ্মার ওপরে বজরায়। নদীর ঘাট অবধি একটি তক্তার সাঁকো বজরা অবধি পেতে দেয়া আছে। পা টিপে টিপে সেই তক্তা ধরে চারুচন্দ্র নৌকায় উঠে আসছেন। বজরার ছাদ থেকে রবীন্দ্রনাথ সাবধান করলেন চারু, সাবধানে পা ফেলো। এ জোড়াসাঁকো নয়।
সাহিত্যিক বনফুলের ছোট ভাই একবার কবির সঙ্গে দেখা করার জন্য শান্তিনিকেতন আসেন। কবি তখন কানে ভাল শুনতে পান না। কবির সেক্রেটারি অনিল কুমার তাই তাকে বলে দিলেন কবির সাথে একটু জোরে কথা বলতে। কবি এখন কানে ভাল শুনতে পান না। কবিকে বলা হলো, ইনি সাহিত্যিক বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ছোট ভাই। কবি তৎক্ষণাৎ ঠাট্টা করে বললেন তুমি বলাইয়ের ভাই কানাই নাকি? ভদ্রলোক কবির সেক্রেটারির পূর্ব নির্দেশ মোতাবেক চেঁচিয়ে বললেন, না আমি অরবিন্দ। কবি একগাল হেসে বললেন, ‘কানাই নয়, এ দেখছি একেবারে সানাই।’
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তখন খুবই অসুস্থ। শান্তি নিকেতন থেকে কবিকে কলকাতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। ঠিক সে সময় একটি ফুটফুটে ছোট্ট মেয়ে বায়না ধরে বসল কবিকে তার অটোগ্রাফ দিতে হবে। রবীন্দ্রনাথ তার খাতায় কাঁপা হাতে অটোগ্রাফ লিখে দিল। তবু মেয়েটির মন ভরল না। মেয়েটি কেঁদে কেটে বায়না ধরল-কবির অটোগ্রাফের পাশে কবিতা লিখে দিতে হবে। ছোট্ট মেয়েটিকে নিরাশ করলেন না কবি। তিনি তাৎক্ষণিক লিখলেন-
মোর কাছে চাহ তুমি পদ্য
চাহিলেই মিলে কি’তা সদ্য।
তাই আজ শুধু লিখিলাম
নিজের নাম,
এর বেশি কিছু নহে অদ্য।