মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৩, ২৮ আষাঢ় ১৪২০
ব্যাঙরা
মূল : মো ইয়ান
অনুবাদ : হারুনুর রশিদ
মো ইয়ানের সর্বাধিক আলোচিত উপন্যাস ফ্রগস। যাতে তিনি চীনের একসন্তান নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। যাতে উঠে এসেছে গর্ভপাতের নিষ্ঠুরতা। যার জন্য সরকারের অবৈধ আইন অনেকটাই দায়ী। এ অন্যায় গর্ভপাতের কারণে প্রতিবছর চীনে লাখ লাখ নবজাতককে হত্যা করা হয়। এ উপন্যাসের সারাংশ জার্মানের স্পাইজেল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এর ইংরেজী অনুবাদ করেছেন হাওয়ার্ড গোল্ডব্লাট।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ফুপুর বিয়ের বিরোধী। প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই। বাবা, ভাই ও ভাবীরা সবাই ব্যাপারটা জানত। স্বভাবতই বিষয়টা আমাদের মতবিরোধ সৃষ্টি করার মতো। আমরা বয়সে ছোট হলেও ফুপুর বড় খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। ওয়াঙ শিয়াওতের সাথে তার বৈবাহিক সম্পর্ক পরিবারের জন্য ছিল এক ধরনের গর্ব। ইয়াং লিন তার পরবর্তী বড়। কিন্তু ওয়াঙ-এর তুলনায় ফুপুর সাথে তাকে মানায়নি। তিনি এক জন চাকুরে। বিবাহে তার চাকরিকে যোগত্যা হিসেবে প্রাধান্য দেয়া হয়। ফুপু কুয়ানকে ও বিয়ে করতে পারত। কিন্তু ফুপু কুয়ানকে অপমান করেছে। কুয়ান হয় তো হাওশের তুলনায় ভালো হতো। এরপর ভাবলাম; তিনি হয় তো কোনো বয়স্ক পুরুষে আলোড়িত হবেন। আর একটা যথার্থ পরিকল্পনা; তৈরি করলাম। এমন কি আলোচনা ও করলাম; শেষ বয়সে কে তার প্রকৃত স্বামী হতে পারে ?
কিন্তু কোন পূর্ব লক্ষণ ছাড়া তিনি হাওদাওশেকে বিয়ে করলেন। লিটল লায়ন ও আমরা তখন বেইজিং-এ ছিলাম। খবরটা শোনার পর নিজেদের কানকে বিশ্বাস করতে পারিনি। এ অবিশ্বাস্য বাস্তবতায় হতাশ আমরা। কয়েক বছর পর ফুপু ‘মুন চাইল্ড’ নামের একটি টিভি প্রোগামে তারকা হিসেবে আবির্ভূত । প্রোগামটি ছিল হাওদাওশেকে নিয়ে। যদিও ক্যামেরা সার্বক্ষণিক ফুফুর দিকে ছিল। তার কথা বলা, অতিথি সাংবাদিকদের অভ্যর্থনা -কোন কিছুই বাদ যাচ্ছিল না। ফুফু বলছিল, ‘যদি আমাকে প্রশ্ন করা হয়; কেনো আমি হাওদাওশে কে বিয়ে করলাম? তবে আমাকে ব্যাঙের গল্প, তার ভ্রমণের কর্মশালা, তার স্টোর রুম ও তার আক্ষরিক ফলক থেকে শুরু করতে হবে। যখন সে শান্তভাবে তার কাজের বেঞ্চে বসে, চোখে উদাসীনতা প্রকাশ করে, মুখে এক ধরনের শূন্যতা ফুটে উঠে স্বপ্নীল বৃদ্ধ ঘোড়ার ন্যায়। সত্যি কি; সকল মহৎ শিল্পী বৃদ্ধ ঘোড়ায় পরিণত হয়, যখন তারা একবার জনপ্রিয় হয়। আমি আশ্চর্য হই। হাওদাওশের নাম কানে গুনগুন বাজতে থাকে। যদি ও তার সাথে মাত্র কয়েকবার সাক্ষাৎ করেছি। ঐ রাতেই প্রথম আমি তাকে দেখি । আমার আগের ঘরের সন্তান শিয়ান কুয়ান পাইলট হয়ে যোগ দান করার অনুষ্ঠানে তাকে ডিনারের দাওয়াত দিল। বছরের পর বছর চলে গেল, আর তাকে দেখলাম না। আবার একবার দেখা হলো, শুধু টিভিতে। তার দাড়ি ও চুল সাদা । কিন্তু তার মনোভাব তখনও চির তরুণ,স্বচ্ছ ও স্থির। তাকে সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তি বলা যায়।” এ প্রোগামে দেখেই আমরা জানতে পারলাম ফুপু কেন হাওদাওশেকে বিয়ে করেছে?
ফুপু একটি সিগারেট জ্বালাল। তারপর এক দীর্ঘ টান এবং কথা বলা। তার স্বরে দুঃখ প্রকাশ পাচ্ছিল। ‘বিয়ে আসলে স্বর্গে নির্ধারিত হয়। এ কথা বলে তারুণ্যের আদর্শবাদী চেতনা জাগ্রত করতে চাই না। কেননা আমিও বাস্তববাদী। যেহেতু এটা বিয়ের বিষয় তাই ভাগ্যের উপর নির্ভর তো করতে হয়।’ হাওদাওশের দিকে ইশারা করে বললেন, ‘তাকে প্রশ্ন করুন? আপনারা কি মনে করেন সে কি কখনো স্বপ্ন দেখেছে আমাকে বিয়ে করার?’
‘১৯৯৭ সালে যখন আমার বয়স ৬০। হাসপাতালের উর্ধতন কর্মকর্তা আমাকে অবসর নিতে বলে । ইতিমধ্যে অবসরের পাঁচ বছর অতিবাহিত হয়েছে। হাসপাতালের অকৃতজ্ঞ পরিচালক হুয়াং-এর হারামজাদ পুত্র মিলানহুয়াং জুন-এর কথা সবারই জানা। সে হেক্সি গ্রামের অধিবাসী। কিছুদিন মেডিকেল কলেজে অতিবাহিত করেছে। পাশ করে বেরুলো একেবারে মূর্খের মতো। যেমন সে ভর্তি হওয়ার পূর্বে ছিল। সে সিরিঞ্জে ওষুধ খুঁজে পেত না। স্টেটিসকোপের মাধ্যমে হৃদকম্পন ও বুঝতে পারত না। সে কখনো ইঞ্চ, বার, কিউবিট এ শব্দগুলোর নাম শুনেনি । তার হসপিটালে ভর্তি হয়ে কে সুস্থ হবে? রোগি বরংচ যেনো স্কুলে ভর্তি হল। স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক চেনকে আমার ব্যক্তিগত পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ। এ জঘন্য জন্তুটার সামন্যতম জ্ঞান ও নেই। মেয়ে মানুষের সাথে খেলা, তাদের উপহার দেয়া, গাধাগুলোকে চুমু দেয়া, আর মহিলাদের বিরক্তি করা; এই কাজেই তো তার দক্ষতা।”
তখন ফুপু তার স্তনে চাপ দিলেন এবং জোরে পা ঝাঁকিয়ে হাঁটলেন। রাগান্বিত হয়ে বলল, ‘আমি কতো বোকা সেই নেকড়েকে আমার দরজায় আসতে দিয়েছি। সে হসপিটালে মেয়েদের সাথে যা তা করার সুযোগ দিলাম। ওয়াং শিয়ামেই ওয়াং গ্রামের সতের বছরের মেয়ে। সে ছিল সুন্দরী, মাথা ভর্তি চুলের খোঁপা, গোলাগাল মুখ ও হাতির দাঁতের ন্যায় কোমল সাদা চামড়ার শুভ্রতার অধিকারিণী। তার হাতগুলো উড়ত প্রজাপতির ডানার মতো, চোখগুলো যেনো কথা বলত। আর যে তাকে দেখবে সে এমনটাই বিশ্বাস করবে। যদি পরিচালক ‘ঝাং ইয়ে মু’ তাকে দেখত, সে আর বেশি আকর্ষণীয় কৌতুক অভিনেতা হতো কং লিয়র ও ঝাং ঝিভির তুলনায়। দুঃখজনকভাবে, সে অসভ্য দুশ্চরিত্র মিলান হুয়াং তাকে প্রথম দেখল। সে ওয়াং গ্রামে ছুটে গেল। মেয়েটির মা-বাবার সাথে কথা বলল। মিষ্টিকথা বলে তাদের বুঝাল। প্রস্তাব দিল; যদি তারা তাদের মেয়েকে হসপিটালে পাঠায়, তবে সে মহিলাদের সমস্যার চিকিৎসা করতে পারবে। সে বলল মেয়েটি আমার ছাত্রী হতে পারবে। অথচ মেয়েটি একদিন ও আমার সাথে কাটায়নি। সে চরিত্রহীন মেয়েটিকে তার নিজের কাছে রাখল। তার প্রতিদিনের সেবক ও রাতের সহগামিনীর মতো। তার নষ্টামির এটাই শেষ ছিল না। সে দিনে ও তাকে নিয়ে বিছানায় যেত। এমনকি মানুষ ও তাদের দেখেছে। একসময় তার তৃপ্তি পুরোটাই মিটে যায়। তার পর ঐ গ্রামে যাওয়া একেবারে বন্ধ করে দিল। অথচ ওখানে সরকারী খরচে তার খাবার ব্যবস্থা ছিল। অন্য বড় কোন শহরে বদলি হওয়ার আশা তার এ আচরণের মূল কারণ। হয় তো আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না সে দেখতে কেমন? সে একটা লম্বা গাধা, কালো ঠোঁট, রক্তাত দাঁতের মাড়ি বিশিষ্ট এবং বিষাক্ত শ্বাস প্রশ্বাসের অধিকারী।
এরকম চেহারা নিয়েও মনে করত; স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক হওয়ার যোগ্যতা আছে তার। প্রত্যেক সময় সে ওয়াং শিয়ামোকে মদ্যপান করানো ও অফিসারদের খাবার খাওয়ানো ও আনন্দিত করতে একা নিয়ে যেত। তাকে তাদের সামনে উপস্থাপন করত, আনন্দের খোরাক হিসেবে। এটাই ছিল শয়তানের শয়তানি ও নষ্টামি। একদিন সেই ছোট্ট শয়তান আমাকে তার অফিসে ডাকল। অফিসের মহিলা কর্মচারীরা সবাই তাকে ভয় পেত। আমি তাকে মোটেও ভয় পেতাম না। আমি একটা ছোট ছুরি রাখতাম নিজের কাছে। প্রয়োজনের সময় তার উপর এটা চালাতে মোটে ও ইতস্তত করতাম না। সে আমাকে দেখে চা খাওয়া বন্ধ করল, হাসল, এবং বাকি চা টুকু মেঝেতে রাখল।
আমি বলি, ‘পরিচালক হুয়াং আপনি আমার কাছ থেকে কী আশা করেন? আসুন কাজের কথায় আসা যাক।’
সে বিশ্রীভাবে মুচকি হাসল। আর বলল ‘মহৎ ফুপু’। আমি মনে মনে বলি, ‘নিকুচি করি তার মহৎ ফুপু বলাকে’। ‘আপনি আমাকে ঐ জন্ম গ্রহণের দিনটা দান করেছেন। আমাকে বড় হতে দেখেছেন। তবে কেন আমি আপনার ছেলে হতে পারি না?” ব্যাঙের ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙর ডাক কখনো মনে হয় ঢোলের শব্দের মতো। কিন্তু তার কান্না সেদিন মানুষের মতো মনে হলো। যেন হাজারো নবজাতক শিশু কাঁদছে। আমি বললাম, ‘আমি এতা সম্মানের যোগ্য নই। আপনি হচ্ছেন হাসপাতালের পরিচালক। যেখানে আমি একজন সাধারণ মহিলা ডাক্তার। যদি আপনি আমার সন্তান হতেন, তবে আমি গর্বিত মায়ের মতো মৃত্যুবরণ করতাম। সুতরাং মনে যা কিছু আছে, বলুন।’ সে আরো বেশি হি হি করে হাসলো ডাকার আসল উদ্দেশ্য বলার আগে। বলল, ‘আমি একটা ভুল করেছি, যা প্রত্যেক অফিসাররা আগে বা পরে করে থাকে। আমার নিজের ভুলের কারণে ওয়াং শিয়াওমে গর্ববতী হয়েছে।’
আমি বললাম, ‘স্বাগতম; এখন শিয়াওমে তোমার ড্রাগনের বীর্য বহন করছে। আর এ হসপিটাল স্থায়ী নেতৃত্বের নিশ্চয়তা পাচ্ছে।’ সে বলল, ‘মহৎ ফুপু আমাকে পরিহাস করো না। আমি গত কয়েকদিন যাবত খুবই চিন্তিত। খেতেও পারছি না ঘুমাতেও পারছি না।’
আপনারা কি মনে করেন এ হারামজাদা ঘুমাতে ও পারছে না খেতে ও পারছে না?
সে আরো বলল, ‘ওয়াং চাচ্ছে আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দেই। যদি স্ত্রীকে তালাক না দেই, সে নাকি দেশের মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করবে।’ আমি বললাম ‘সত্যি’ আমার তো মনে হয় দ্বিতীয় স্ত্রী তো এখনকার কর্মকর্তাদের একটি প্রিয় বিষয়। একটি বাংলো কেনেন। ওকে সেখানেই রাখেন। আপনি তো তা করতে পারেন।’ সে বলল, ‘আপনাকে অনুরোধ; এরূপ রসিকতা করবেন না দয়া করে। আমি জনসম্মুখে যেতে পারব না দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় স্ত্রী নিয়ে। যদি ও আমার আরো বাংলো কেনার ক্ষমতা আছে।’ আমি বললাম, ‘তবে সামনে অগ্রসর হও আর তালাক দাও’ সে তার গাধার মতো চোহারাকে প্রসারিত করলো। আর বলল, ‘আপনি ভালো করে জানেন আমার শ্বশুর একজন শুয়োর কসাই। আমার শালা ভয়ংকর গু-া। আমাকে খুন করা তো ওদের কিছুই না, যদি তারা এ ব্যাপারে জানতে পারে।’ আমি বললাম, ‘কিন্তু আপনি হচ্ছেন এখানকার কর্মকর্তাদের স্যার।’ সে বলল ঠিক আছে এটা যথেষ্ট। আপনার বয়স্ক চোখে হসপিটালের পরিচালক একজন নগণ্য ব্যক্তি। কিন্তু বাইরে শহরের রাস্তায় সে শ্বাস প্রশ্বাস নির্গমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিহাস করার পরিবর্তে কেন এগিয়ে এসে সাহায্য করছেন না?’
আমি বললাম, ‘এ পৃথিবীতে এমন কি আছে যা আপনার জন্য করতে পারি?’
সে বলল, ‘ শিয়াওমে আপনাকে সম্মান করে। সে অনেক বার বলেছে; আপনি হচ্ছেন এমন একজন যার কথা সে শুনে।’
‘তুমি আমাকে কী করতে বলছ?’
মিলান হুয়াং বলল, ‘তাকে গর্ভপাত করতে বলুন।’
আমি দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললাম, ‘আমি নিজ হাতকে আর নষ্ট করব না, এধরনের নিষ্ঠুর কাজ করব না। সারা জীবনে আমি দু হাজারের বেশি মেয়ের গর্ভপাত করার জন্য দায়ী। আর এটা আর কখনো করব না। তুমি তাকে জন্ম হওয়ার সুযোগ দাও। তোমার পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। শিয়াওমে খুবই সুন্দর মেয়ে। সে তোমাকে খুব সুন্দর ছেলে অথবা মেয়ে উপহার দিবে। এতে তোমার খুশি হওয়া উচিত। তুমি তাকে বলো যখন সময় হবে, তখন নবজাতকের জন্মের সময় আমি এখানে থাকব।’ এ বলে আমার জুতা ঠিক করলাম, আর অফিস থেকে বের হয়ে পড়লাম। এ ধরনের উত্তর দিতে পেরে বেশ খুশি হলাম। আমার এ সিদ্ধান্ত রুমে ফিরে এসে এক গ্লাস পানি পান করা পর্যন্ত টিকল। ভাবলাম, মিলন হুয়াং এর উওরাধিকারীর মতো কেউ এত খারাপ হতে পারে না । কী লজ্জার ওয়াং শিয়াওমে তার বাচ্চার মা! আমি অনেক বাচ্চাকে প্রসব করিয়েছে। দেখেছি বাচ্চার স্বভাব ভালো বা খারাপ হয় তার জ্বীনগত বৈশিষ্ট্য ও লালন-পালন করার পরিবেশের কারণে। আপনারা উত্তরাধিকারী আইনগুলোর সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু এই জ্ঞান অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত । এর সমালোচনা চলে না। আপনি মঠে মিলানহুয়াং- এর সন্তানকে রাখতে পারেন। সে একজন কামুক ভিক্ষু হবে। কোন ব্যাপারই না; আমি যতই দুঃখবোধ করি শিয়াওমের জন্য। আমি যতই অনইচ্ছিুক হই, তাকে এ কথা শুনাতে। এ বাচ্চা পৃথিবীতে জন্ম হওয়ার পর সৃষ্ট সমস্যার কোন সমাধান খুঁজে পেলাম না। যদি পৃথিবীর আর কোন কামুক ভিক্ষু থাকে, তবে তা হবে সে। কিন্তু ঠিক তখনই শিয়াওমে নিজে আমার কাছে এলো। পা জড়িয়ে ধরল। তার চোখের পানি আর নাকি কান্নায় আমার ট্রাউজার ময়লা করে ফেলল। সে কাঁদছিল আর বলছিল ‘খালা; সে আমাকে ফাঁদে ফেলেছে, আমাকে মিথ্যা বলেছে। আমি এ হারামজাদাকে বিয়ে করব না। যদিও সে আমার জন্য চারজন কাজের লোক ও গাড়ি পাঠায়। আমাকে সাহায্য করেন। আমি চাই না আমরা গর্ভে তার সন্তান থাকুক। ’
ফুপু আরেকটা সিগারেট জ্বালাল। জোর করে একটান শেষে আদিমভাবে ধোঁয়া ছাড়ল। তারপর আমি তার মুখ দেখলাম। তখন বললেন, ‘আমি তাকে গর্ভপাত করতে সাহায্য করলাম। একসময় যে ফুল ফুটার কথা ছিল, সেই ওয়াং শিয়াওমে এখন ধ্বংস হয়ে গেছে। সে এখন পতিতা।’ ফুপু তার গল্প শেষ করলেন। চোখ মুছলেন। আবার বলতে শুরু করেন, ‘শপথ করেছি, এ ধরনের কাজ আর করব না। এমনকি কোন মেয়ে যদি শিম্পাঞ্জির বাচ্চা ও গর্ভে ধারণ করে তাও না। বাচ্চাটার পান করার আওয়াজ, শূন্য বতলে কোন কিছু চুষে পান করার মতো। তার ভৌতিক হাত যেনো আমার অন্তরকে জোর করে চেপে ধরেছে, যতক্ষণ না আমি বরফের মতো ভেঙে পড়ি। যখন কাজটা শেষ করলাম, তখন যেনো মেঝেতে ভাঁজে ভাঁজে ভেঙে পড়েছি।’
‘আপনারা ঠিকই বলছেন। আমি মৌলিক বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছি।’ এত কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘আমি বৃদ্ধা হয়ে গেছি। আর এখনো বলিনি কেন তাকে বিয়ে করেছি? আমার অবসর নেয়ার কথা ঘোষণা করলাম চাঁদের ৭ম মাসের, ১৫ তারিখে। কিন্তু সে অসভ্য মিলান প্রচলিত নিয়মে অবসর নিতে বলল। আর প্যারোলে মাসে ৮০০ ইউয়ানের বিনিময়ে থাকতে বলল।’ তার মুখে থুতু মারলাম। বললাম, ‘আমি তোমার জন্য অনেক খেটেছি। হাসপাতালের মোট আয়ের প্রতি দশ ইউয়ানের মধ্যে আমাকে আট ইউয়ানের জন্য তোমার ধন্যবাদ দেয়া উচিত। মিলন হুয়াং; তুমি কি মনে কর প্রতি মাসে আটশ ইউয়ানে আমার শ্রম কিনতে পারবে? একজন বিদেশী শ্রমিক ও তার চেয়ে বেশি পায়। অর্ধেক জীবন খেটে মরেছি। এখন সময় বিশ্রাম নেয়ার। সময় এসেছে গাওমি শহরের নিজের বাড়িতে ফিরে যাবার।’ সে আমার ব্যবহারে হতাশ। গত দুবছরের অধিকাংশ সময় আমকে ভোগাতে অনেক সময় অতিবাহিত করেছে। আমি হচ্ছি এমন মেয়ে যে ভালভাবে এসব দেখে নিয়েছে। ছোট মানুষ হলেও এসব জাপানি শয়তানগুলোকে ভয় পাই না। ঠিক আছে, ঠিক আছে, আবার বিয়ে করার গল্পটা শুরু করছি।
‘যদি আপনারা জানতে চান কেন হওদাওশে-কে বিয়ে করলাম? তবে আমাকে ব্যাঙের গল্প শুরু করতে হবে। অবসরের রাতে কিছু পুরানো বন্ধুরা খাবারের সময় একসাথে হলো। আমি মদে উল্লাসিত। পুরো বতলের কমই পান করি। কিন্তু এটা ছিল সস্তা মদ। শে শিয়াওছে, রেস্টুরেন্টের মালিকের ছেলে একটা অতিরিক্ত নেশাময় বতল আনল। প্রত্যেকে এর নেশায় কাঁপছিল। কোনমতে দাঁড়াতেও পারছিল না। শে শিওায়ছের মুখে ফেনা এসে গেল । তার চোখ ঘুরছিল।’
ফুপু বলল, সে টলতে টলতে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে হসপিটালের ডরমিটরির সম্মুখে গেল। কিন্তু কোন মতে একটি ছোট জলাবদ্ধ স্থানে এসে থামল। এর বাতাস গমনাগমনের দুই দিক উচু ছাউনি দ্বারা পরিবেষ্টিত । চাঁদের আলো তার চারপাশে প্রতিফলিত চকচকে আয়নার ন্যায়। ব্যাঙ-ব্যাঙাচির আওয়াজ প্রথমে একদিক থেকে, পরে অন্যদিক থেকে আসে। সামনে ও পেছন থেকে আসে। যেনো রণসঙ্গীতের সমস্বরে গানের মত আওয়াজ। তারপর ব্যাঙের ডাক সমস্বরে আসতে থাকল চারদিক থেকে। তার ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে যেনো আকাশপূর্ণ। হঠাৎ এর মাঝেই সম্পূর্ণ নীরবতা নেমে আসল। একসময় নীরবতা ভাঙে পাখির কিচির-মিচিরের মতো আওয়াজে। মেডিকেল কর্মজীবনে দূরের পথে তিনি এখান থেকে সেখানে গিয়েছেন গভীর রাতে। কিন্তু কখনো এমন ভয় পাননি। সে রাতে তিনি ভয়ে প্রকম্পিত হলেন। ব্যাঙের ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙর ডাক তার কাছে ঢোলের শব্দের মতো বিকট মনে হতে লাগল। সে রাতে ব্যাঙের ডাক মানুষের কান্নার চিৎকারের রূপ কেন নিল তা তিনি বুঝলেন না? প্রায় হাজারো নবজাতক শিশু যেনো একসাথে কাঁদছিল। এ আওয়াজ সবসময় তার প্রিয় বিষয়। তিনি বলেন, ‘একজন শিশু বিশেষজ্ঞের জন্য পৃথিবীর যে কোন আওয়াজ নবজাতকের কান্নার তুলনায় হৃদয়গ্রাহী হতে পারে না।’ সে রাতের মদ তাকে ঠা-া ঘর্মাক্ত দেহের গেঞ্জির মতো করে তুলে। তিনি বলেন, ‘এটা ভেব না আমি মদ্যপ, তাই কল্পনার জগতে ছিলাম। কেননা যখন ঘাম আমার লোমকূপ দিয়ে বের হয় মাথা ব্যথা কমে গেল। মনটা পরিষ্কার হলো।’ ফুপু সেই কর্দমাক্ত পথ দিয়ে নেমে আসল । ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ডাক থেকে পালতে চাইল। কিন্তু কীভাবে? তিনি যত পালাতে চেষ্টা করল, তত দুঃখিত ব্যাঙগুলোর সমস্বরের ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙর শব্দ চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরল। দৌড়াতে চেষ্টা করলেন কিন্তু পারলেন না। আঠালো মাটির এই পথ তার জুতার তলার সাথে লেগে গেছে। জুতা একবার কাদা থেকে ছোটার পর পুনরায় লাগছিল। যেন কাঁদা তার জুতাকে, তামার কাঁটা দিয়ে কামড়ে ধরে আছে পথের মেঝেতে। শব্দগুলো তার নিকট আসল সমুদ্র বাতাসের মতো। তাকে ঘিরে ফেলল তাদের ভয়ানক গর্জনে। মনে হলে, তারা যেনো তাকে ধারাবাহিক ভাবে কামড়াচ্ছে। যেনো বড় বড়ো নখে তারা তাকে আচড়ে দিচ্ছে। যখন সে পিছলে পড়ল, আরো কিছু কাটা যেনো যুক্ত হলো। তিনি জুতা খুলে ফেললেন, যেনো খালি পায়ে হাঁটতে পারে। তা যেনো উল্টো কাদার আকড়ে ধরার ক্ষমতা বাড়িয়ে দিল। বড় ব্যাঙের মতো তিনি তার হাত-পায়ের ওপর আছড়ে পড়লেন। আর বুকে ভর দিয়ে চলতে থাকলেন। কাদা তখন তার হাঁটুতে, রানে ও পায়ে লেগে গেল। কিন্তু তিনি গুরুত্ব দিলেন না। তিনি বুকে ভর দিয়ে চলতে লাগলেন। সে সময় ঘন ছাউনির আড়াল থেকে অসংখ্য ব্যাঙ দ্রুত বেরিয়ে আসল। কিছু ছিল গাড়ো সবুজ। আর অন্যগুলো সোনালি ও হলুদ। কিছু এত বড় যেনো ইলেকট্রিক স্ত্রি, কতগুলো খেজুরের মতো। কতগুলো সোনালি পি-ের ন্যায়। এর অন্যগুলো ছিল মটরশুটির মতো লাল। তারা তাকে সমুদ্রের ঝড়ের ন্যায় আক্রমণ করে। তাদের গর্জনে তাকে ঘিরে ফেলে। মনে হলো তারা যেনো তাকে ধারাবাহিক ভাবে কামড়াচ্ছে। তাদের যেনো বড় নখে তাকে তারা আচড়ে দিচ্ছে। তারা দ্রুত তার পিঠে, গলায় ও মাথায় উপচে পড়ে। ব্যাঙের ওজন তাকে মাটির ওপর এলো পাথারি করে শুইয়ে দেয়। সে বলল, ‘তার বড় ভয় ব্যাঙের আচড়ানো বা কামড়ানোর কারণে নয়। বরং তাদের বিরক্তিকর. অসহ্যকর, ঠা-া ও তৈলাক্ত চামড়া আর স্পর্শের ভয়াভহ অনুভূতি। ফুপু বলেন, ‘তারা আমাকে আবদ্ধ করে মূত্রে; না মনে হয় তা মূত্র নয় বীর্য।’ তার হঠাৎ মনে হল দাদির বলা একটি যৌনকাৃক্সক্ষী ব্যাঙের গল্প। একজন মেয়ে এক রাতে নদীর তীরে শিতল বাতাস খাচ্ছিল এবং ঘুমিয়ে পড়ল। আর সে স্বপ্নে এক সবুজ পোশাকধারী যুবকের সাথে যৌনমিলন হলো। যখন সে জাগ্রত হলো, তখন সে ছিল গর্ভবতী। আর সে প্রসব করল একগুচ্ছ ব্যাঙাচি। এই ভয়াবহ চিত্রের বর্ণনা একটি ভীতিকর অবস্থা তৈরি করে। সে পায়ে ভর দিয়ে লাফাল। শরীর থেকে ব্যাঙ সরালো কাদা সরানোর মতো। কিন্তু সব সে ছাড়াতে পারল না। কিছু তার কাপড়ে, চুলে আঁকড়ে ধরে। এমনকি দুটো কানের লতিতে কামড়ে ধরে। এরা ছিল একজোড়া ভয়াবহ কানের দুলের মতো। এক সময় তিনি দৌড়ানো বন্ধ করেন। আর কাদা তার আকড়ে ধরার শক্তি হারায়। তারপর তিনি আবার দৌড় শুরু করেন। তার শরীর ঝাঁকান। দুই হাতে তার কাপড় ও চামড়া ঝেড়ে নেন। প্রত্যক বার একটা ব্যাঙই ছুড়ে ফেলত, যা তাকে বার বার আকড়ে ধরত। আর প্রত্যক বার চিৎকার দিতেন। সেই দুটো ব্যাঙ তারে কানে ঝুলে ছিল ছোট বাচ্চার দুধ চোষার ন্যায়। তিনি যখন তাদের ফেলে দিলেন, তার কানের কিছু অংশ তাদের সাথে ছিড়ে গেল। ফুপু চিৎকার দিচ্ছিলেন আর দৌড়াচ্ছিলেন। কিন্তু ব্যাঙের ভিড় ভেঙে মুক্ত হতে পারছিলেন না। দশ হাজারের ও বেশি ব্যাঙ তার পিছনে শক্ত হাত বিনির্মাণ করল। তারা ডাকছিল, দৌড়াচ্ছিল, ধাক্কা খাচ্ছিল ও জড়ো হচ্ছিল। যেনো কোন অন্ধকার ঝড় তাকে ধাওয়া করল। যখন সে রাস্তার দিকে দৌড়াল, ব্যাঙেরা তার পথে ঝাঁপিয়ে পড়ল। অগ্রসর হওয়ার পথেএকটা বাধা তৈরি করল। যেখানে অন্য ব্যাঙগুলো সেই ছাউনি থেকে বেরিয়ে আক্রমণ চালাচ্ছিল। তার কালো পোশাক তাদের আক্রমণে ছিড়ে গেল। আক্রমণকারী ব্যাঙগুলো কাপড় ছিদ্র করে ফেলে। তারা পূর্ণোদ্যমে উত্তেজনায় তার গলার মাংস কামড়ে নিল মাটিতে পড়ার পূর্বে।
তিনি পুরো নদীর তীরে দৌড়েছিলেন। চাঁদের আলোয় চমকিত একটা ছোট পাথরের ব্রীজ দেখলেন। শরীরে তখন কোন কাপড় ছিল না। তিনি ব্রিজে পৌঁছলেন সম্পুর্ণ দিগম্বর হয়ে। আর দৌড়ে হাওদাওশের নিকট গিয়ে উপস্থিত ।ভদ্রতার কোন বালাই তখন ছিল না। মনে ছিল না যে, তিনি সম্পূর্ণ উলঙ্গ। পাম গাছের অন্তরীপে একজন মানুষ দেখলাম। বাঁশের ছোবড়ার তৈরি টুপি পরে একজন ব্রিজের মাঝে বসে হাতে কি যেন পিষছিল। ‘আমি পরে জানলাম সে একটা মাটির খ- পিষছিল। চাদের সন্তান চাঁদনী রাতে মাটির খ- থেকে তৈরি করা যায়। জানতাম না সে কে? কিন্তু কোন পরোয়া করলাম না। সে যে-ই হোক না কেন? তার দায়িত্ব আমাকে রক্ষা করা। সেই মানুষটার বাহুতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। যখন আমার স্তন তার উষ্ণ বুকের ছোঁয়া পেল, তার পিঠে ব্যাঙের স্যাঁতস্যাঁতে ঠা-া, তৈলাক্ত দুর্গন্ধময় ব্যাঙের ছোঁয়ার পরিবর্তে আমি তাঁর বুকের অন্তরীপে আশ্রয় নিলাম। চিৎকার দিলাম, ‘বড় ভাই আমাক রক্ষা কর।’ তৎক্ষণাত জ্ঞান হারালাম।
ব্যাঙের ভিড়-এর ছবি মনে অঙ্কন করে ফুপু বর্ণনা দীর্ঘায়িত করল। ভয়াবহ গল্প বলে হৃদকম্পনের উত্থান ও পতন বাড়িয়ে দিল। একটু পর ক্যামেরা ফেরানো হলো হাওদাওশের দিকে। সে তখন স্ট্যাচুর মতো বসে। পরবর্তী দৃশ্যে ‘ছোট পাথরের ব্রিজ’ নামের একটি মাটির টুকরা শিল্পকর্মকে দেখানো হলো। তারপর ক্যামেরায় আবার ফুপু দৃষ্টিগোচর হলেন।
ফুপু বলল, ‘ঘুম থেকে জেগে আমাকে হাওদাওশের ইটের বিছানায় পুরুষের পোষাকে খুঁজে পেলাম। দুই হাতে সে আমাকে বাটি ভর্তি সুপ দিল। যার সাধারণ ঘ্রাণ মাথা পরিষ্কার করে দেয়। এক চুমুক দেয়ার পর চিন্তা করলাম, আমি কতটুকু ব্যথা পেয়েছি? শরীর কেমন গরম? সেই ঠা-া ও তৈলাক্ত অনুভূতি এর মধ্যে চলে গেছে। আমার শরীরে ছিল চুলকানি, ব্যথাময় আচড়। ভালো জ্বর অনুভব করলাম। আর কিছুটা বলা যায় জ্বরে দুর্বলও। হাওদাওশের শিমের সুপ খেয়ে কিছুটা দুর্বলতা কাটিয়ে উঠলাম। যেন আমার চামড়ার একটা স্তর ঝেরে ফেললাম। আর হাড্ডিগুলো যেনো ব্যথা শুরু করল। বহু মানুষের পুনর্জন্ম হওয়ার গল্প শুনেছি। এখন জানলাম আমি ও তাদের মত একজন। যখন সুস্থ হলাম হাওদাওশেকে বললাম, ‘চলো আমরা বিয়ে করি।’
হাওয়ার্ড গোল্ডব্লাট এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় অনূদিত