মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ৫ এপ্রিল ২০১৩, ২২ চৈত্র ১৪১৯
সত্তরের সাত শিল্পীর চিত্রকলা
খুরশীদ আলম পাটওয়ারী
দলগত প্রদর্শনী সব সময়ই চিত্রকলার শিক্ষার্থী এবং চিত্রকলায় উৎসাহী জনদের কাছে উৎসাহ-উদ্দীপক। কারণ এতে ভিন্ন ভিন্ন শিল্পীর বাছাই করা কাজগুলো উপস্থাপনের ফলে বৈচিত্র্যের পাশাপাশি সুর চির একটি সম্মিলনও ঘটে। বৈচিত্র্যই হলো বিবর্তনের কাঁচামাল। শিল্পকলা চর্চার ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি করে প্রযোজ্য।
সম্প্রতি বেঙ্গল শিল্পালয়ে সত্তরের দশকের সাতজন বিশিষ্ট শিল্পীর ‘সত্তরের সাত’ শীর্ষক একটি দলগত প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। প্রদর্শনীতে সাতজন শিল্পীর ৮টি করে মোট চিত্রকর্মের সংখ্যা ৫৬টি। অংশগ্রহণকারী শিল্পীবৃন্দ হলেন আলমগীর হক, ফরিদা জামান, নাইমা হক, নাসিম আহমেদ নাদভী, সাধনা ইসলাম,শ ওকালতুজ্জামান এবং টিএ কামাল কবীর। বলা বাহুল্য এঁরা সকলেই সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক ডিগ্রী নিয়েছেন। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর রাজনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টির ক্ষত তথা আর্থসামাজিক অবস্থায় তখনকার সময়টি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যময়। স্বাজাত্যবোধের প্রবল চেতনা তখন শিল্পীদের মধ্যে প্রোথিত করেছিল এক নবজাগরণ। এতে করে নব নব উদ্দীপনা আর দেশ ও জাতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ শিল্পীরা নানারকম সৃষ্টি আর সৃজনে ছিলেন উদ্দীপিত।
সাতজন শিল্পী একই সময়ধারার প্রতিনিধিত্ব করলেও তাঁদের চিন্তা, চেতনা, করণ কৌশল এবং মাধ্যমের ব্যবহারে রয়েছে ব্যাপক ভিন্নতা। বিমূর্ত, আধা বিমূর্ত বা বাস্তব রীতি যে ধারাতেই ছবি আঁকেন না কেন তাদের চিত্রকর্মগুলো প্রকরণে ও প্রকাশ রীতিতে ভিন্ন। এজন্যই একই সময়ে শিক্ষা-দীক্ষায় ব্যাপৃত থেকে পারস্পরিক শিল্প অভিজ্ঞতা বিনিময়ে নিজেরা উদ্যমী হয়ে উঠলেও তাঁদের গন্তব্য হয়েছে নানামুখী। নানা আঙ্গিকে তাঁরা সময়কে ধারণ করেছেন স্মৃতিকাতরও হয়েছেন নানা ভঙ্গিতে।
নব্বইয়ের দশক থেকে কানাডা প্রবাসী শিল্পী আলমগীর হক তাঁর নিজস্ব ধারার প্রিন্ট মেকিং নিয়ে ব্যস্ত আছেন। শিরোনামহীন চিত্রকর্মগুলো তিনি করেছেন ক্যানভাসে এক্রিলিক মাধ্যমের আশ্রয়ে। এখানে রঙের ব্যবহার, জ্যামিতিক স্পেস ছেড়ে কাজ করায় প্রকৃতিজাত এক ধরনের সাঙ্গিতিক অনুরণন টের পাওয়া যায়। তাঁর ছবিতে এক ধরনের স্নিগ্ধ সমাহিত অনুভব মেলে। শিল্পী আলমগীর হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএফএ সম্পন্ন করেছেন। ১৯৭৭-২০১২ পর্যন্ত সময়ে তিনি বাংলাদেশ, ভারত, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেনে ১৮টি একক এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনেক যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন।
শিল্পী ফরিদা জামান ইতোমধ্যে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং শিল্পসমৃদ্ধ চিত্রকর্মের জন্য প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন। গ্রামীণ আবহ, মাছ, জাল ইত্যাকার নানা অনুষঙ্গ তাঁর চিত্রকর্মে উপস্থিত হয় নিসর্গের উপাদান হিসেবে। ক্যানভাসে এক্রিলিক মাধ্যমে সৃজিত তাঁর সন্ধ্যা এবং সকাল শীর্ষক ছবি দুটি বিমূর্ত ধাঁচে করা। রঙের মুন্সীয়ানায় ছবি দুটো অনবদ্য হয়েছে। দিনের এ দুটি সময়ে দর্শকের মনসিজ রসায়নের অনুভব মেলে ছবি দুটোর সামনে উপস্থিত হলে। শিল্পী ফরিদা জামানও বিএফএ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং এমএফএ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। অতঃপর ১৯৯৫ সালে বিশ্বভারতী শান্তিনিকেতন থেকে তিনি ডক্টরেট করেন। চিত্রকলায় কমনওয়েলথ পুরস্কার, মহিলা পরিষদ পুরস্কার ছাড়াও অনেক দেশের নানারকম পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করছেন।
নাইমা হক কোলাজ ও মিশ্র মাধ্যমে করা চিত্রকর্ম উপস্থাপনে পারদর্শী। অতি অল্প সংখ্যক রেখার আঁচড় ও বিন্দুর সমন্বয়ে তিনি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলেন এক ভিন্ন ধরনের ইকোলজি যা তাঁর চিত্রকর্মকে একটি সামগ্রিক পূর্ণতা দেয়। উপবেশনরত পেছন থেকে দেখা একটি নারীর অর্ধ নগ্ন প্রতিকৃতির ছবি আছে এ প্রদর্শনীতে। সূক্ষ্ম রেখা আর সাদা কালো রঙে উপস্থাপিত ছবিটি অবয়ব, আকৃতি আর স্পেসের কারণে অনবদ্য হয়েছে। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এই নারীদেহ চিত্রিত হয়েছে মিহি ও মোটা রেখার বেষ্টনে। আনত মুখম-ল, খোঁপায়িত কেশ, পরিধেয়র ঝিলিক সব মিলিয়ে নারী হয়ে উঠেছে আত্মমুগ্ধতার প্রতীক। শিল্পী নাইমা হক ইতোমধ্যে দ্বিশতাধিক যৌথ প্রদর্শনী আর কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন। তিনিও চারুকলার একজন অধ্যাপক।
শিল্পী নাসিম আহমেদ নাদভীর চিত্রকর্মে প্রকৃতি উৎসারিত এক ধরনের বিশুদ্ধতার আভাস পাওয়া যায়। তাঁর কাজে আকাশ, পানি, জমি, একাকার হয়ে যায়। শীতের সকাল শীর্ষক তাঁর চিত্রকর্মটি কাগজে কালি মাধ্যমে করা। সাদা কালোর জাদুকরী আঁচড়ে শীতের সকাল দেখে যে কোন দর্শক স্মৃতিতাড়িত না হয়ে পারবেন না। দূরে বসতি, কুয়াশা, গাছপালা ক্যানভাসে একটি পরিপূর্ণতা নিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। শিল্পী নাদভী ৩টি একক এবং দ্বিতশতাধিক যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন।
শিল্পী শওকাতুজ্জামান তাঁর শিল্পকর্মের মধ্যে বাঙালীর শেকড়, স্বতন্ত্র আবহ ফুটিয়ে তোলেন। নিসর্গ, ফুল, প্রকৃতি তাঁর চিত্রকর্মে প্রবল হয়ে ওঠে। ‘ফুল’ শীর্ষক এক্রিলিক মাধ্যমে করা ছবিটিতে রঙের পরিস্ফুটনে তিনি সিদ্ধহস্ততা দেখিয়েছেন। চর্তুভুজাকার এই ছবিটি অত্যন্ত নান্দনিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। শিল্পী শওকাতুজ্জামান ঢাকায় বিএফএ ডিগ্রী নেয়ার পর এমএফএ করেছেন বিশ্বভারতী থেকে। দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত তিনি।
শিল্পী সাধনা ইসলামের ছবিতে লোকায়ত বাংলা, নকশিকাঁথা, গ্রামীণ ফর্মগুলো পাওয়া যায় নিপুণভাবে। ‘গ্রামীণ বাংলাদেশ’ শীর্ষক তাঁর ছবিতে পুরো ক্যানভাসজুড়েই রয়েছে শিশুতোষ নানা ফর্ম যেমন ঘর, নৌকা, গাছ, পাখি, হাঁস উৎসবের উপাদান ইত্যাদি। শিল্পী তিনটি একক এবং দেশ-বিদেশে ৪৬টি যূথবদ্ধ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন।
টিএ কামাল কবির বিমূর্ত ধাঁচে নীল, সবুজ, লাল এবং হালকা রঙের মিশ্রণে এক্রিলিক মাধ্যমে চিত্রকর্ম উপস্থাপন করেছেন এ প্রদর্শনীতে। স্বাধীনতা আর একাকীত্ব বিষয়ে তাঁর চিত্রকর্ম রঙের বিশিষ্টতায় উজ্জ্বল। শিল্পীর নীল রঙ ব্যবহার দৃষ্টি কাড়ে ১৯৭৪ সালে ঢাকাস্থ চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বিএফএ করেছেন তিনি। তখন বার্ষিক চিত্রকলা প্রতিযোগিতায় ১ম স্থান অধিকার করেন। তিনটি একক ও ৪৮টি দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে তিনি অংশ নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের প্রজন্মের শিল্পী এই সাতজনের শিল্পকর্ম নিয়ে আয়োজিত প্রদর্শনীটিতে উপস্থাপিত ছবিগুলোতে এক ধরনের চিন্তা-ভাবনা ও চৈতন্যগত সাযুজ্য আছে। কিন্তু উপস্থাপনায় রয়েছে ভিন্নতা যা দর্শককে আকৃষ্ট না করে পারে না।