মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ৫ এপ্রিল ২০১৩, ২২ চৈত্র ১৪১৯
বিতংস
কাদের মাহমুদ
ধারাবাহিক উপন্যাস
এক.
কেমন আছেন আপনি? ভালো তো? আরে, আমায় চিনতে পারছেন না? কেন? আমি তো আপনার আশে-পাশেই থাকি। একটু খেয়াল করুন, দেখবেন চিনতে পারছেন।
আচ্ছা, না হয় না-ই চিনলেন। একটা প্রশ্নের উত্তর দিন তো দেখি? বাংলাদেশে বিবাহযোগ্য কন্যার চেয়ে বিবাহযোগ্য পুত্রের সংখ্যা কি কম? কী বললেন! পরিসংখ্যান বিভাগে কাজ করেন অথচ দেশের তরুণ সম্প্রদায় সম্পর্কে এই বড় একটি তথ্য আপনি জানেন না! সত্যি কী অবাক কথা! তবে ...
... যাক, চিন্তা করলে বলতে হয়, আপনাকে অথবা আপনার দফতরকে দোষ দেয়া যায়, এ কথা পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ নানান পদের। একটি পদ হচ্ছে, বিবাহযোগ্য নারী এবং বিবাহযোগ্য পুরুষের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা আপনাদের কাছে নেই অথবা আইন বিভাগ থেকে সরবরাহ করা হয়নি। আমি শুনেছি, আমার বাবার দাদীর বিয়ে হয়েছিল ৭ বছর বয়েসে, অর্থাৎ তার শৈশবে। আজকাল তো শুনি, বাংলাদেশে কোনো কোনো মেয়ের বিয়ে দেয়া হচ্ছে ১২ কি ১৩ বছর বয়েসে, অর্থাৎ তাদের কৈশোর কালে। আবার কোনো কোনো পুরুষ বিয়ে করছে ৬০ বছর বয়সে, অর্থাৎ তাদের বার্ধক্য। ফলে কথা দাঁড়াল, এরা কেউই তরুণ-তরুণী নয়। অথচ তারা বিয়ে করছে, আর বিয়ে করলেই তো বিয়ের পরিসংখ্যানের মধ্যে ওরা পড়ে যাচ্ছে। সংজ্ঞা মতে, বিয়ের আগে মেয়ে থাকে বিবাহযোগ্য কুমারী আর পুরুষ থাকে বিবাহযোগ্য কুমার, অবশ্য যদি এই বিয়ের আগে তাদের আর কোনো বিয়ে না-হয়ে থাকে। প্রথমবার বিয়ে হবার পর, নারীর কুমারীত্ব ও পুরুষের কৌমার্য- দুটোই সচরাচর নষ্ট হয়ে যায়। যায় না? যাক, আপনি কিন্তু একজন বড় বোদ্ধা মানুষ। আমার প্রশ্নটি শুনে ঠিকই আঁচ করেছিলেন, আমি আদতে জানতে চেয়েছিলাম কুমারীদের চেয়ে কুমাদের সংখ্যা কম কি-না।
আমার কী মনে হয় জানেন? মানে হয়, আমাদের দেশে যারা কুমার তারা অপরাপর নানা ধান্ধায় এতোই ব্যতিব্যস্ত যে ওরা বিয়ে করার বিষয়টি ভাববার সময়ই পায় না। যেমন, কেউ চাকরি খোঁজে; কেউ চাকরির পাওয়ায় জন্যে মামা-চাচা-দুলাভাই তল্লাস করে; কেউ রাজনৈতিক পার্টিতে নাম লিখিয়ে সভা-সমিতি, মিছিল-বিক্ষোভ করে চাকরি পাওয়ার তক্কে থাকে। কেউ বিদেশে চাকরির জন্যে পাসপোর্ট ও ভিসার পেছনে ছোটে। এদের কেউ কেউ ঔ যে একবার বিদেশে যায়, সেখানকার নব্যদাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে সহজে আর ফিরতে পারে না-কেউ কেউ বে-আইনিভাবে দেশান্তরী হতে গিয়ে সাগরের জলে ডুবে মারা। আবার, চাকরি ফেলে কেউ কেউ ব্যবসা করার নামে জালিয়াতির মক্কেল ধরতে যায়। কেউ হঠাৎ বড়লোক হবার মিছে আশায় হায় হায় কোম্পানির দফতরে ঘোরে; কেউ টাকা ধার করে ফটকা বাজারে বসে তাকে। এমনি হাজারো ধান্ধায় আমাদের কুমাররা যৌবনের সেরা সময়গুলো ব্যয় করছে। তাই বিয়ের বাজারে কুমারীদের মতো ওদের অতো বেশি দেখা যায় না। কুমারী মেয়েদের কুমারী মেয়েদের কথাই আগে বলছি, কারণ বাজারে তো সবার আগে ওদেরই বিক্রি হবার কথা। এরপরে আসতে পারে অন্য প্রকরণের মেয়েরদের কথা। যেমন- তরুণী তবে তালাকী, যুবতী তবে বিধবা, সন্তানবর্তী তবে এখনো যৌবনবর্তী, বিশেষত ধনী। সেলেব্রেটি বা স্বনামধন্যদেরও এ পক্ষে ফেলতে পারেন।
যা হোক, আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন, একটি (একজন নয়?) মেয়ে হয়ে আমি কী করে বা কেনই বা কুমার-কুমারীর সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন করছি। আমাদের দেশের মেয়েরা তো সচরাচর এ ধরনের প্রশ্ন করে না! বিয়ের ব্যাপারে একমাত্র একটা প্রশ্নের উত্তরই মেয়েদের কাছে সবচচেয়ে জনপ্রিয়। আর সে উত্তরটা হচ্ছে, কবুল।
বিয়ের আসরে সচরাচর প্রচ- হৈচৈময় আওয়াজ হয়। এর মধ্যেই ঘোমটা ঢাকা কনেকে পর্দার আড়াল থেকে পুরুষকণ্ঠে প্রশ্ন করা হয়, অমুক সাং-এর অমুক পিতার পুত্র অমুক ব্যক্তি, [যাকে তুমি এখনো সচক্ষে দেখো নাই, যে নিজেও তোমাকে সচক্ষে দেখেনি,] সে অতো টাকা দেন-মোহরে তোমাকে বিয়ে করতে চায়, তুমি কি রাজি?
কনের উত্তর উচ্চরিত হয়, জি। কবুল।
কিন্তু কনের স্বকণ্ঠে উচ্চরিত হলেও, ক্ষীণ-কণ্ঠ-উত্তরটি প্রশ্নকারীর স্বকর্ণে সচরাচর প্রবেশ করতে পারে না। তখন কনেকে ঘিরে-থাকা তার আপন নারীকুল সমস্বরে, সজোরে ও সোল্লাসে বলতে থাকে, বলেছে! কবুল বলেছে! কবুল বলছে! তখন প্রশ্নকর্তা সন্তুষ্টর সঙ্গে উচ্চারণ করেন, আল্হামদুলিল্লাহ। এখন বলুন তো শুনি, আমি এই যে বর্ণনা দিলাম, এটা কি সহি? মানে যথার্থ হয়েছে কি? ধন্যবাদ! আমার বর্ণনাকে সহি বলার জন্যে আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ!
এবার আসা যাক, আপনার বা আপনাদের দফতরের নির্দোষিতার দ্বিতীয় পদটিতে। সেটি কী? সেটি হলো, আপনাদের চাকুরিতে বেতন আছে তবে কোন উপরি নেই। সমমর্যাদার অন্যান্য কর্মচারীদের তুলনায় বেতন আপনাদের কম নয় বরং বেশিই। তবুও আপনাদের আর্থিক হাল বড় শোচনীয়। কারণ আপনাদের উপরি পাওয়ার পথ নেই। তাই মাইনের টাকা শেষ হলে ধার-দেনা করে সংসার চালাতে আপনারা বাধ্য হন। এই অবস্থায়, আর দশ জনের তুলনায়, আপনারা নিজ ছেলে-মেয়েদের মনের মতো করে মানুষ করতে পারছেন না। ওদের ভালো বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেন না। ভালো কোচিং দেওয়াতে পারেন না। বরং ওরা যে কোন দিকে গিয়ে কী করে, ধর্মঘট করে না কি মাস্তানী করে, না কি ছিনতাই করে, না কি মাদক সেবন করে, না কি জালয়াতি করে তা খেয়াল করে রাখতে পারছেন না। আহা রে! কী কষ্টই না আপনারা সংসারের দুর্গতির দুশ্চিন্তায় সর্বদা ব্যতিব্যস্ত থাকেন বলে নিজ দফতরের কাছে মনোনিবেশ করতে পারেন না। খোঁজ করে দেখতে পারেন না, বিবাহের সময় কনে ও বরের বয়স কতো। তারা কুমারী, না কুমার।
এখন বলুন তো শুনি, আমি এই যে বর্ণনা দিলাম, এটা কি সহি? মানে যথার্থ হয়েছে কি? ধন্যবাদ! আমার বর্ণনাকে সহি বলার জন্যে আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ!
আপনি এখন নিশ্চয় ভাবছেন, আমি অতো সব খবর রাখি কী করে? আমি কি গোয়েন্দা বিভাগের চাঁই? ছি! ছি! কী যে বলেন!
তবে আমি কি বেতারে কিম্বা এমন কোন টেলিভিশনের সংবাদ পাঠিকা যা লোকে দেখে না–তাই আমাকে দেখেও আপনি চিনতে পারছেন না? তওবা! তওবা! কী যে বলেন। তবে?
তাহলে এখন বিষয়টা খুলেই বলা দরকার। হ্যাঁ, বলছি, শুনুন! প্রথমে আমার দিকে একটু তাকান; তাকিয়ে দেখুন! কোন অসুবিধা নেই, তাকান! দেখুন! ভালো করেই তাকিয়ে দেখুন! দেখছেন তো? বেশ! এখন তো বুঝতে পারছেন দেখতে কেমন মেয়ে আমি? না আছে সুডৌল শরীর, না আছে নয়ন ভোলানো রূপ। গায়ের রংটা পূর্ব-পুরুষ দ্রাবিড়দের মতো। মিশমিশে কালো। নাকটা বোঁচা। দাঁতগুলো দেখলে মানে হবে কোনো একটা বানর মুখ-খিঁচিয়ে রয়েছে। আমি এতোই বেঁটে যে আমি দাঁড়িয়ে থাকলেও আপনার মনে হবে আমি বসে রয়েছি এখন আপনিই বলুন বিয়ের বাজারে–বেচা বলুন আর কেনা বলুন-কোনোটার কোনো যোগ্যতাই কি আমার আছে?
আমার বাবা ও মায়ের ব্যাঙ্ক...
না না বলতে হবে না। বুঝেছি, ওদের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের কথা জানতে চাইছেন তো? না, কোনো লাভ হবে না। আমার বাবা ও মা এতোই গরিব যে, ওদের কোনো ব্যাঙ্ক একাউন্ট কখনোই ছিলো না, এখনো হয়তো নেই।
ও-ও!
খাবি খাচ্ছেন তো। জানতোম। খাবিই খাবেন। যাক। এখন এক কাপ চা এনে দেবো? চা খেতে চান না। তবে বেশ, বেশ। এবার তবে শান্ত হয়ে একটু বসুন। হ্যাঁ, কারণ এবারে আপনাকে এক কোটি টাকা দামের একটা প্রশ্ন করবো। এক কোটি টাকা! ... কোটি টাকা দামের!
জ্বি, জ্বি। তবে ঘাবড়াবেন না। ঘাবড়াবার কিস্সু নেই। এ দাম কেউ দেয় না, কেউ নেয়ও না। আামেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে যেমন বলে সিক্সটি ফাইভ মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন, এটা তারই নকল বলতে পারেন অথবা অনুরূপ। এতে শুধু প্রশ্নের গুরুত্ব বুঝায়, এরই আর কি। জ্বি।
আচ্ছা, এখনই প্রশ্নটা করতে বলছেন?
জ্বি, আচ্ছা, করছি। মনে করুন, আপনি পাত্রী খুঁজছেন। কার জন্যে? আপনার কোনো প্রিয়জন, যেমন ধরুন, আপনার আদরের ছোট ভাই, কি আপনার একমাত্র ছেলের বউ করে ঘরে তুলবার জন্যে মনের মতো একটি পাত্রী খুঁজছেন। করিৎকর্মা ঘটকের তৎপরতায় এরিমধ্যে অনেক ক’টি মেয়ে দেখেছেন। ঢের ছোটাছুটি করেছেন কিন্তু কাউকেই আপনার পছন্দ হয়নি। ঘটকের আজ আবারো আশা নিয়ে এসেছেন কনে দেখতে। এক কাপ চা পান ক’রে বৈঠকঘরে প্রতীক্ষায় বসে আছেন। কী হবে বা হবে না, ভাবতে ভাবতে খানিকটা অন্যমনস্কও হয়ে পড়েছেন। হঠাৎ ভেতরের দরজাটি খুলে গেলো। ভেতরে থেকে ধীর পায়ে প্রবেশ করলো একটি মেয়ে। পরনে তার বধূর সাজ। এই সাজের আড়ালে ঘোমটা ঢাকা কে এই মেয়েটি? আপনি ভাবেন। আগে কি দেখেছেন কোথাও? না, না, দেখেননি। তবে এই মেয়েটি আর কেউ নয়, ঐ যে একটু আগে বর্ণনা দিয়েছি যে-আমার, যে-আমি আপনার সামনে এখন দাঁড়িয়ে আছি, সে-ই আমি, আমি কনে হয়ে আপনার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। এখন আমাকে দেখে আপনার মন কী বলবে? বলবে কি, আহা কী দেখলাম! এ যেন সোনার প্রতিমা! নাকি আপনার আশাহত মন তিক্ত-বিরক্ত হয়ে উঠবে? অপরিণামদর্শী ও অবিবেচক ঘটকের উপর আপনি কি মহা-খ্যাপা হয়ে উঠবেন? আমার পিতা-মাতার নির্বুদ্ধিতায় যারপরনাই রুষ্ট হয়ে উঠবেন কি? অকুস্থল থেকে আপনি তৎক্ষণাৎ উঠে যেতে চাইবেন কি?
কী, প্রশ্নটি শুনে ও এর উত্তর খুঁজে আপনার মনোযাতনা হচ্ছে? হতে পারে। আপনি হয়তো মনে মনে আদর্শবান ব্যক্তি; ছোটবেলায় শিখেছিলেন, ‘সদা সত্য বলিবে।’ গল্প-কবিতায় পড়েছিলেন, মানুষের রূপ তো কেবল বাহ্যিকÑকেবল ত্বকের লেপন, প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে অন্তরে। রবিঠাকুরের লেখা কৃষ্ণকলির কবিতা পড়েছিলেন; ‘কালো, যতোই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।’ কবি বস্তুত বলেছিলেন, মানুষকে গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করতে নেই। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কালোরঙ মানুষের নেতা মার্টিন লুথার কিংকে হত্যার পর আপনি শোকাহত হয়েছিলেন। শুনেছিলেন, বর্ণভেদ বড় ঘৃণ্য আবেগ। কিন্তু তবুও আপনার সমুখে উপস্থিত হবু বধূটি যে কয়লার মতো কালো। এর উপর বেঁটে, কুশ্রী ও কদাকার! বাঙালির ঘরে অবশ্যি এমন মেয়ে আরো রয়েছে। শহরের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে কাজ করার জন্যে কামরাঙ্গীর চর থেকে ছুটে আসা যে জনস্রোত একেবারে প্রদোষের আলোয় হেঁটে যায়, আর সন্ধ্যার অপরাহ্নের আঁধারিতে ফিরে যায়, সেই প্রবাহের ভাঁজে ভাঁজে এমন অসংখ্য অপুষ্ট অন্ত্যজ মেয়েকে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু ... কিন্তু এমন মেয়েকে নিজের ছেলে বা ভাইয়ের বউ করেন কী ক’রে? এ কথা ভাবতেও আপনার মধ্যবিত্ত অন্তর পুড়ে যাচ্ছে, মনে তীব্র জ্বালা-যাতনা হচ্ছে। হচ্ছে না? হচ্ছে, অবশ্যি হচ্ছে। ... আসিবে কি যাইবে কি, দ্বিধা কেন? না, আমি আপনাকে আর যাতনা দিতে চাই না। আমি জানি এ বড় কঠিন প্রশ্ন। এ জন্যেই একে বলেছি, এক কোটি টাকা দামের প্রশ্ন।
এবার এক কাপ চা পান করবেন?
ঠিক আছে, আপনি বসুন, আমি চা নিয়ে আসছি। পাশেই জব্বর মিয়ার টি-স্টল।
দুই.
তৈরি হোন! এবার মূল গল্পটায় প্রবেশ করবো। হ্যাঁ, গল্প করতেই তো বসেছি; তাই না?
একদিন আমিও কুমারী কন্যা ছিলামÑ বলাই বাহুল্য, তবু বলতে হয়। অনেক হবু শ্বশুর ও হবু-শাশুড়ি বা বর পক্ষের এমনি কেউ একা অথবা সদলবলে আমাকেও দেখতে আসতেন। তখন আমার বাবা ও মা নিজেদের দৈন্য আপাতত ভুলে গিয়ে ওদের সাধ্যাতীত আপ্যায়নের আয়োজন করতেন। কিন্তু লাভ হয়নি। একে একে সবাই আমার ও আমার পরিবারের উপর তিক্ত-বিরক্ত হয়ে এবং ঘটকের উপর-খ্যাপা হয়ে তৎক্ষণিক উঠে চ’লে যেতেন। যেন আর কখনো আমাদের মুখ দেখতে না হয়।
আমার নবীনা ও অবোধ মন বারবার দুঃখ পেতো। কারণ দুটো। প্রথম কারণ, একটি স্বামী পাওয়াটাই তখনকার-আমার ছিলো একমাত্র ধ্যান ও ধারণা। দ্বিতীয় কারণ, আমার চেনা-জানা সমবয়েসী ও সমশ্রেণীর মেয়েরা একে একে কবুল ব’লে বাপের বাড়ি ছেড়ে স্বামীর ঘরে গিয়ে উঠছিল। বাদ ছিলো হাতেগোনা কয়েকটি মেয়ে। ওদের হাল-হকিকত আমার চেয়েও শোচনীয় ছিলো; -না, না, আমি অবশ্যি পাড়ার বস্তির মেয়েদের কথা বলছি না। আমি যতদূর জানি, বস্তির মেয়ে ও বাসার কাজের বুয়াদের এ সব ঝামেলা নেই। বিয়ে করতে ওদের যেমন আমাদের মতো সমস্যা হয় না, তালাক দেয়ার ব্যাপারেও কোন বিভ্রাট হয় না। বলতে পারেন, আমাদের চেয়ে ওরা অনেক বেশি সংস্কার মুক্ত। প্রয়োজনে ওরা বিয়ে করে। বিয়েটা অচল প্রমাণিত হলে ওরা তালাকও দেয়। কোনো কলঙ্ক ওরা গায়ে মাখে না। জি, তা-ই। তাছাড়া, কি-ই বা উপায় আছে এই ব্যাচারীদের!
যে কথা বলছিলাম, আমাকে দর্শন মাত্রেই বরপক্ষ চ’লে যেতো। তবে একটি পক্ষ বর বাদ ছিলো। ঠিক বর পক্ষ নয়, বস্তুত হবু বরটির কথাই বলছি। ঘটককে সাথে নিয়ে সে একদিন ফিরে এসেছিলো। আমরা তো অবাক। গবিরের ঘরে আপদ এলো না কি!
কেন ফিরে এসেছিলো? এ প্রশ্নে সঠিক উত্তর আমরা কেউ জানতাম না। কেবল সে জানতো। কিন্তু আমাদের সে বলেনি। বরং বেশ ইনিয়েবিনিয়ে অঢেল কথা বলেছিলো। সে বলেছিলো, দেখুন! এ পাড়ায় আপনারা নতুন এসেছেন। তাই আপনারা আমাকে চেনেন না। এক সময় আমাকে এ পাড়ার সবাই চিনতো। সবাই জানতো আমার চরিত্র কী। সময়ে এমন কোন দুষ্ট কর্ম নেই যা আমি করিনি। স্কুলে থাকতে আমি মেয়েদের অহরহ উত্ত্যক্ত করেছি। লোকের বাড়ির জিনিসপত্র নিয়মিত চুরি করেছি। লোকে আমার বাবা-মায়ের কাছে নালিশ করেছে কিন্তু কোন প্রতিকার পায়নি। কারণ বাবা-মা’কে আমি তোয়াক্কাই করতাম না। আরো বয়স হবার পর, আমি গু-ামি, পা-ামী মস্তানি-সবই করেছি। সমাজের নেতারা আমাকে এড়িয়ে চলতো। পার্টির লোকেরা আমাকে সমাদর করতো। ফলে টাকা পয়সারও অভাব হয়নি। খরচ করেছি দেদারসে। আমি চলেছি আমার দলবল নিয়ে। সাধারণ লোকে আমার ভয়ে পথে বের হতো না। আমাকে দেখতে পেলে ওরা আত্মরক্ষার আড়াল খুঁজতো। আমি কেন এমন করতাম? এ প্রশ্নের উত্তর আমি সঠিক ক’রে এখনো জানি না। তবে আমি কি মজা পেতাম? হ্যাঁ, মজা তো পেতাম বটেই। ছোটবেলায় মায়ের কাছে কিছু আবদার করলে মা বলতো, আমি কোথায় পাবো এ সব? তোর বাবাকে বল। বাবার কাছে কিছু চাইলে প্রচ- ধমক খেতাম; বাবা বলতো, আমার পয়সা খরচ করতে চাস? যা, ভাগ্্ এখান থেকে! আমার বাবার তো অভাব ছিলো না। বাড়ি, গাড়ি সবই ছিলো। কিন্তু এক পুরুষের বড়লোক তো! পূর্বপুরুষের কার্পণ্য ওর মজ্জায় লুকিয়ে থাকতো। খরচ করতে জানতো না। তাই বাবার কাছে কিছু চেয়েও পেতাম না। অথচ আমি দেখতাম, আমি যা যা চাইতাম ওগুলো সবই আমার চারপাশের ছেলেদের আছে। আমার মধ্যে দারুণ অসন্তুষ্টি জাগতো। এক সময় লোভ জাগতো। শেষে, এক সময় সুযোগ খুঁজতে শুরু করি। তখন সুযোগের দুয়ার যেন আপনা থেকেই আমার সামনে এসে খুলে যেতো। জ্বি, তা-ই। তবে ... তবে কি জানেন ... আমার মনে হয় মানুষের মনটা টাকার চাকরির মতো। এর এপিঠ আর ওপিঠ আছে। একটু ঘুরলেই এর পিঠ বদল হ’য়ে যায়। তবে কখন পিঠ্ বদল হয় মানুষ তা বুঝতেও পারে না। আমারও তা-ই হলো। নিজে জানতাম না, একদিন, নিজের আচরণে আমার নিজেরই মনে দুঃখ এলো। নিজেকে বললাম, আমি আর বদমায়েশ থাকবো না। ভালো হয়ে যাবো। সত্যি আমি পাল্টে গেলাম। এ পাড়া ছেড়েও চ’লে গেলাম। কয়েক বছর পরে, এখন পাড়ায় এসেছি। না, না, এখনো আমি অন্য পাড়াতেই থাকি। ওখানে আমার থাকার একটা ঘর আছে। একা থাকি? কি করি! কি করি! ও, একটা চাকরি করি। ছোটখাটো একটা চাকরি। এখন বিয়ে করতে চাই। সংসারি হতে চাই, বুঝতেই পারছেন। জ্বি, জ্বি, কয়েকটি মেয়ে দেখিছি। ঘটক সাহেব দেখিয়েছেন। ওদের প্রত্যেকে আমার পছন্দ হয়। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয়, ওরা কেউ আমাকে পছন্দ করতে রাজী নয়। জ্বি। জ্বি। ঠিকই ধ’রেছেন, ওরা আগে আমাকে খুব ভয় পেতো। ঔ ভয় এখনো ওদের মনে বাসা বেঁধে রয়েছে। তাই ওরা আমার প্রস্তাবে রাজী হতে পারছে না। আমার আশ্বাসের উপর ওরা বিশ্বাস রাখতে পারছে না। ... জ্বি হ্যাঁ, ঠিক বলছেন, আপনারা আমাকে আগে চিনতেন না। জ্বি না। আমি অতীতে আপনাদের কখনো ক্ষতি করিনি; আপনাদের ক্ষতি করার কোন প্রশ্নই ছিলো না। ভয়ও অবশ্যই দেখাই নি; কী ক’রে দেখাবো, আপনারা তো আমাকে চিনতেনই না। আর বুঝতেই পারছেন, অতীতের আমি তো এখনকার আমি নই। আমি এখন নতুন আমি। একটি সৎ জীবন যাপন করাই আমার উদ্দেশ্য। আমি ভালো হয়ে গেছি, ভালো হয়েই থাকতে চাই। আর কিছু নয়। আগে আমার বেশভূষাই ছিলো কদর্য; ভীষণ দর্শন। মাথার চুলের ছাঁট ছিলো লোমহর্ষক। আমি হাঁটতাম পা চালিয়ে, বুক চেতিয়ে। আমার কণ্ঠস্বর ছিলো উচ্চ ও কর্কশ। এখন ... এখন শুনুন, আমার কণ্ঠস্বর কতো মোলায়েম! আমি কত বিনীত, তাই না? আমি হাঁটি বিনম্র পায়ে। আমার চুলের ছাঁট অতি মামুলি। আমার পরনে দেখুন কী অতিসাধারণ জামা-কাপড়। আমাকে বিশ্বাস করুন, অতীতের কোন ছাপই আমার মধ্যে আজ খুঁজে পাবেন না। এখন নতুন আমি।... আপনারা আমায় কক্ষা করবেন, কারণ, আমার কথাগুলো এখন বড় অগোছালো, কখনো অসংলগ্ন, কখনো দুর্বল, Ñ বলতে পারেন অর্ধ-শিক্ষিতের ভাষণ! তবে আপনারা আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন।
এই ভাষণের পর কী হলো!
আমাদের বাড়িতে তখন শুধু আমার বাবাই বিএ পাস করা, অর্থাৎ পূর্ণ ডিগ্রিধারী ছিলেন; তবে ভাষণটি আমার বাবাকেই মুগ্ধ করেছিলো, পরে মাকেও করেছিলো। আবেগময় ভাষণে ভুলবে না, এমন বাঙালি বোধহয় হয় না। ওঁরা দু’জনাই ওকে বিশ্বাস করেছিলেন। তাই তাৎক্ষণিক রাজী হয়ে যান।
আর আমি? আমার মায়ের দেরাজে নানা রকম বইপত্র থাকতো। ঔ বয়সের মধ্যে আমি ঔ দেরাজ থেকে নিয়ে সরস সিনেমা পত্রিকার সাথে সাথে নারী জাগরণী অনেকের লেখা প’ড়ে ফেলেছিলাম। যেমন ধরুনÑ রোকেয়া সাখাওয়াৎ, বেগম সুফিয়া কামাল, এমন কি হালের তসলিমা নাসরিন। আমার মগজের এক কোণে তাই অঢেল চর্চিত বাণী বুদ্্ বুদ্্ ক’রে ফুটতো। বিশ্ববিজয়ের স্বপ্ন না দেখলেও, মনটি তো নারী স্বাধীনতার স্বপ্নেই ঠাসা থাকতো। কিন্তু ...
ছেলেটি আগে সত্যিকারের বদ ছিলো। ভয়ানক বদ। তবে এখন ভালো হয়ে গেছে। খুব ভালো। এতো ভালো যে ভাবাই যায় না। এ সব কথা ব’লে আমার বাবা ও মা আমার কাছে চানতে চান, এখন তুই কি বলিস, মা?
এমন প্রশ্ন আমার মা অথবা আমার বাবা কোনোদিন আমাকে করেননি। এর আগে কোনোদিন কখনো কোন গুরুতর বিয়ে বিষয়ে ওরা আমার মতামত চাননি। চাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। তাই এমন প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্যে আমি মোটেই তৈরি ছিলাম না। আমি বরং বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি। তখন আমি কী বলি? আমার বলার কী আছে? যে লোকটা একবার খারাপ ছিলো, Ñখুবই খারাপ ছিলো, সে এখন ভালো হয়ে গেছে ব’লে বলছে। মা ও বাবা দুূ’জনাই তা বলছেন। ওরা কি আর ভুল বলবেন? ওরা আমার চেয়ে বসয়ে বড়ও, আমার চেয়ে কত জ্ঞানী! ওরা বুঝতে পারছেন, লোকটা সাফ হয়ে গেছে। এ তো সুখবর। আনন্দের কথা। মানুষ তো পাল্টাতে পারে। কিন্তু এই মানুষটি কি আবারো খারাপ হয়ে যেতে পারে না? খারাপ থেকে ভালো যেমন হয়, ভালো থেকে কি খারাপ হয় না? আমি এমন প্রশ্নের উত্তর নিজের মধ্যে খুঁজে পাই না। এর উত্তর কি আমার মা অথবা আমার বাবার কাছে আছে? হয়তো আছে। তাহলে ওঁদের কাছে জানতে চাইবো কি? কিন্তু তখনি দারিদ্র্য ও জীবনের ঘাতে-প্রতিঘাতে ক্ষত বিক্ষত নিজের জনক ও জননীর মুখের দিকে আমি মুখ তুলে তাকিয়ে ছিলাম। দেখেছিলাম, ওদের দু’জনার মুখেই আনন্দ ও আশার এক নতুনবিভা জ্বলজ্বল করছে। কন্যা বিদায়ের সম্ভাবনায় ওঁরা উদ্বেল। সেই অনির্বচনীয় দৃশ্য দেখে আমার দু’চোখ ফেটে অশ্রু নেমে আসে। আমি আমার নিজের সব দুঃখ, সব শঙ্কা, সব ভয় তৎক্ষণা ভুলে যাই। ঔ মুহূর্তে বলার মতো কিছুই খুঁজে পাইনি আমি। বরের বয়সটা যে আমার প্রায় দ্বিগুণ সে বিষয় কথাটিও আমি বিস্মৃত হয়েছিলাম। সত্যি, একেবারে সত্যি বলছি। আপনি ভাবছেন, নারী কী আপরিণামদর্শী!
জ্বি। আমিও কবুল বলেছিলাম
কাজী সাহেব এতই দ্রুত এসে হাজির হয়েছিলেন যেন তিনি আমাদের পাশের বাসাতেই অপেক্ষা করছিলেন মাহেন্দ্রক্ষণটির জন্যে। বিয়ে পড়ানোর কর্তব্যটিও তিনি সুচারুভাবে পালন করেছিলেন।
কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ মাত্র। পাড়াটার সরকারি নাম যা-ই লেখা থাক, রিকশাওয়ালারা পিন্সিলপাড়া বললে চট্্ ক’রে চিনে ফেলে। সেখানেই পাঁচতলায় একটি ফ্ল্যাট বদরুল আলমের। একটি শোবার ঘর। গোসলখানা একটি। প্রতিটিরই আয়তন ন্যূনতম। এক চিলতে বসার জায়গা, সেখানে প্লাস্টিকের দুটো চেয়ার। আরেক পাশে রান্নার ব্যবস্থা, এক বার্নারের গ্যাসের চুলা; ধোয়া-পাকলা করার জন্যে পানির কল; হাঁড়ি-পাতিল আর বাসন-কোসন রাখার কয়েকটি তাক।
বিয়ের রাতেই বদরুল আলম আমাকে এখানে এনে তুলেছিলো। বাসরঘর ব’লে মেয়েরা অশৈশব যা কল্পনা ক’রে থাকে, এর বালাই বাড়ি থেকে বিদায় নেবার সময়ই আমি ঝেরে ফেলে এসেছিলাম। আমার মাথায় সস্নেহ হাত রেখে আমার মা একটা ছোটখাটো ভাষণ দিয়েছিলেন। শেষে বলেছিলেন, বুঝলি, যেখানে যাচ্ছিস সেখানে কিছু আশা করতে যাবি না। নগদ যা পাবি তা-ই হাত পেতে নিবি। দেখবি, দুঃখ পাবি না। বাপের বাড়িতে জীবন-ভর দুঃখ করার কষ্টটা হবে না। ব’লে মা কেঁদে ফেলেননি। আমিও না।
বদরুলের শোয়ার ঘরটিতে একটি ছোট বিছানা- একজন মানুষ আরামে লম্বালম্বি শুতে পারে এতে। এর পাশে গোটা দুয়েক স্যুটকেস। কোন আলনা নেই; মেঝের উপর জামা-কাপড় আর জুতো ও স্যান্ডেলের স্তূপ। জানালার শিকে একটি ছোট আয়না আটকানো।
আমি বরাবর বড় ঘুমকাতুরে মানুষ; বিছানার উপর খানিক বসলেই কখন ঘুমের ঢোলে ঢ’লে পড়েছিলাম মনে ছিলো না। ভোরে জেগে উঠে শিউরে উঠেছিলাম। দেখি, বদরুল বসার ঘরের দুটো চেয়ারকে একত্র ক’রে এর উপরে কাৎ হয়ে ঘুমাচ্ছে।
আমার শব্দ পেয়ে বদরুলও জেগে ওঠে। এক গাল মিষ্টি হাসিতে মুখ ভরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, কী, ঘুম হলো?
বিব্রত আমি কেবল মাথা কাৎ ক’রে সায় দিই। বলতে চেয়েও বলতে পারিনি, কী লজ্জা! আমি বিছানায় ঘুমিয়েছি তুমি ঘুমিয়েছো চেয়ারের উপর। কী লজ্জা!
(চলবে)