মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ৫ এপ্রিল ২০১৩, ২২ চৈত্র ১৪১৯
গিয়াং নাম-এর কবিতা
মুক্তিযোদ্ধা কবি গিয়াং নাম ১৯২৯ সালে ভিয়েতনামের খান হোয়া প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যখন স্নাতক হন তখন আগস্ট বিপ্লব দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৬ সালে ফরাসী দখলদার বাহিনী তার মাতৃভূমি গ্রাস করে। তিনি বাড়ি ত্যাগ করে অন্য দুই ভাইয়ের সাথে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। কিশোর বয়স থেকেই তিনি কবিতা ভালবাসতেন। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য অনুষদে তিনি বেশ পরিচিত ছিলেন। ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি স্থানীয় পত্রপত্রিকায় লিখতে থাকেন।
জেনেভা চুক্তির পরে গিয়াং নাম রণাঙ্গন থেকে ফিরে এসে দখলদারি শাসকের বিরুদ্ধে কাজ করতে শুরু করেন সায়গন, নাহ ত্রাং প্রভৃতি শহরে। এ সময় সায়গনের পত্রপত্রিকায় ছদ্মনামে কবিতা লিখতে থাকেন। রক্ত পিপাসু স্বৈরশাসক নগোদিন দিয়েমের চোখে সন্দেহভাজন হলে তাঁর গোপন কর্মকা- থেমে যায়। ১৯৫৯ সালে সায়গন ত্যাগ করে প্রতিরক্ষা অঞ্চলে চলে যান।
১৯৬০ সালে গিয়াং নাম সহকর্মী সাহিত্যিক লি ভ্যান সাম, বুই কিমল্যাং এবং নাট্যকার ত্রান হু উ ত্রাং একত্র হয়ে অন্যান্য শিল্পী সাহিত্যিকদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘এ্যাসোসিয়েশন অব লিবারেশন আর্টিস্ট অ্যান্ড রাইটার্স।’ তাঁর নেতৃত্বে হাজার বছরের সৃজনশীল সাহিত্য জাতীয় রূপ লাভ করে।
তিনি অনেক কবিতা, ছোটগল্প এবং রোমাঞ্চ সাহিত্য রচনা করেছেন। মূল ভাষার কবিতায় গ্রামীণ জনপদের লোকসাহিত্যের সুর রয়েছে। ইংরেজি অনুবাদে সে সুর হারিয়ে গেলেও প্রাকৃতিক পরিবেশ এর সাথে সাধারণ মানুষের সহাবস্থানের বর্ণনায় তার কিছুটা অনুমান করা যায়। তাঁর কবিতাগুলো বর্ণনাবহুল তাই দীর্ঘ। মেকং অববাহিকার সাধারণ মানুষের জেগে ওঠার কাহিনীগুলো বীর, কখনও করুণ রসে কবিতায় উঠে এসেছে।

গ্রামের চিঠি
আঁকাবাঁকা বেগুনী কালির অক্ষরগুলো
মোটা ময়লা কাগজে লেখা চিঠি
ছোট্ট হাতের উত্তাপ অনুভব করি
খামের ওপর গ্রামদেশের ডাকঘরের ছাপ।

“ওগো প্রিয়, তোমার চিঠি এলো জলেভেজা দিনগুলোতে
মুহূর্তের জন্য মাত্র ঘোমটা খোলে বসন্তরোদের আলো
এখনও তুমুল ঢল নামছে লালমাটিতে
সব সময় আমি দেশের কথা ভাবি। এখন কোথায় আছো!”

আমাদের বাচ্চারা ভালোই আছে, আমার শরীরও ভালো
মোটামুটি নির্ভয়ে আছি। বনভূমির নীচের এলাকা
বাড়ির পেছনের পাহারা নিশ্চিন্ত এখানে আমরা
তুমি বাড়ি এলে এবার ঝাল সুপ বানাবো তোমার জন্য

মাঝে মাঝে বাচ্চারা তোমাকে দেখতে না পেয়ে ঘুুমোতে পারে না
ওরা কাঁদে, আমিও তখন চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না
কিছু পুরনো গরম কাপড় কিনে পাঠাতে ভুল করো না
বাচ্চারা যদি একটু আরামে তাকে, আমার কষ্ট এমনিতে কমে যাবে।

শুধু বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন মানুষের নানা পণ্যের বোঝা বইতে হয়
বড় কষ্টের কাজ। বন্ধুরা আমাদের বাচ্চাদের নিজ দায়িত্বে রাখে
ভালোবেসেই রাখে যেন ওরা কাছের আত্মীয়
আমি জানি কেন রাখে, তুমিও জানো, জানো না নাকি?

এবারের বর্ষায় আমাদের ঘরের অবস্থা খুব খারাপ
ঘরের চাল ভেঙ্গে পড়েছে, খুব ঠা-া নামে ঘরে
তবুও নিজেকে অসুখী মনে করি না, কারণ আমি জানি
তুমি আমাদের চেয়ে অনেক কষ্টে আছো কোন দূরে কোথায়।

রাবার বন, পাহাড়, শিশিরে ভিজে কাঁদে
ওহ, কী যে কষ্টের বরফ শীতল রাতগুলো
তুমি স্ত্রী-সন্তানদের জন্য কষ্ট করছো
ঘাম ঝরাচ্ছো জীবনের জন্য, দেশের জন্য।

আমি দেখতে পাই তুমি এখন একটি রাবার গাছের নীচে
আগামীকালের জন্য রাবার রস সংগ্রহ করছো
সে রস চতুর্থ বারের নিঃসরণ, কী সংগ্রামই না তুমি করে যাচ্ছো
তোমার পাশে অনেক কমরেডও।

মাথা নুয়ে আসে চিঠির বাক্যের ওপর
সারা রাত ধরে হৃদয়ে আঁচড় কাটে
তোমাকে দেখতে পাই হৃদয়ে, দারোজার পেছনে
সারা রাত ধরে চিৎকার করে বাতাস মাথার ওপর।

বাড়ির অর্ধেক খোলা
শুকনো বাহুতে বাচ্চা কোলে বাজারে যাচ্ছো
বিয়ের পোশাক পুরনো হয়ে গেছে, ছিঁড়েও যাচ্ছে
এখন শুধু দু’চোখে ভাতের স্বপ্ন।

কে তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে, অসহায় করেছে আমাদের বাচ্চাদের?
দূরত্ব মনে হয় বাড়ছেই
রাবার দুধ জমে রক্ত হচ্ছে
পানি যখন উপচে ওঠে মাটির বাঁধ ভেঙ্গেই যায়।

দেখতে পাচ্ছো প্রিয়তমা, রোদের আলো ফিরে এসেছে।
দীর্ঘ দাসত্বের রাত পোহাবে
প্রবল আত্মবিশ্বাস তোমার কাছে আসবোই
আমাদের পাশে আছে সমস্ত জনগণ।

গালে লাল লাল ফোঁটা

গোপন সভা থেকে ফিরে এসে খুঁজে পেলাম
নতুন এক মা আর ছোট এক বোনকেÑ অপেক্ষা করছিল
মা মশারি টানিয়ে দিলেন
ছোট্ট বোনটি দিলো তার নিজের বালিশ।

ইতস্তত বললাম
“আমি তো মশারিতে ঘুমোই না
পরম মমতায় তিরস্কার করলেন মা
‘বাবা’, তুমি মিথ্যা বলছো কেন?”

সামান্য বিরক্তির চোখে চেয়ে ছোট্ট বোনটি
দরোজার বাইরে গিয়ে বললো
“মা আর আমার নিজের মশারি আছে।
হাত-পা ধুয়ে শুয়ে পড়ুন।”

ঘামে ভেজা আমার শার্ট
কতো পথ হাঁটছি কোথাও ধোওয়া হয়নি
এই মা আর বোনের দয়ায় তা হলো
বিছানায় গিয়ে ঘুমোবার চেষ্টা করছি।

চুলের গন্ধ ছড়াচ্ছে এখনও
বালিশের কভার। দু’টি পাখি
উড়ছে নীল আকাশে। যখন ঘুমোলাম
ওরা উড়ে এলো মাথার ওপর।

কী কঠিন আটটি বছর
কীট পতঙ্গ, উকুন, ঝোপঝাড়
ওহ, যখন আমরা নদী পার হয়েছি
কী কামড়ইনা কামড়ালো মশারা।

তলিয়ে গেলাম গভীর ঘুমে, পূর্ণ তৃপ্তির পরে জেগে দেখি
মা বসে আছেন বিছানার পাশে, শান্ত আর মমতাময়
আর ছোট বোনটি পাতাসহ একটি ডাল
হাতে নিয়ে মশা তাড়াচ্ছে।

সকালে বিদায় নিলাম
মা পিছু পিছু দরোজা পর্যন্ত এলেন
বলতে সাহস হলো না, ধন্যবাদ।
ফিরে যান মা ফিরে যান।

বোনটির ছোট্ট হাত ধরলাম
হঠাৎ বেদনা বিষণœতা অনুভব করলাম, দেখলাম
লাল লাল ফোঁটা, মশার কামড়ের দাগ তার গোলাপি গালে
“তুমি মিথ্যা বলেছো ছোট্ট বোন।”
সে হেসে দৌড়ে পালালো
বনের গাছপালার ভেতর দিয়ে দেখলাম
তার ছোট্ট হাত নড়ছে। বিদায়।

মা এখন বুঝতে পারছি
আপনার গভীর ভালোবাসা, ছোট্ট বোনের আর দেশের
এখনও আমার হৃদয়ে
অসংখ্য মশা কামড়ায়।
এগারোটি বছর

যখন সে যায়
তখনও খেতের ভুট্টা তোলা হয়নি
তার পায়ের স্যান্ডেলের দাগ নদীর পাড়ে বালুতে আঁকা রয়েছিল
বাড়ি ফিরে অনেক রাত মেয়েটি ঘুমোতে পারেনি।
সে আমাকে বলেছিল এক পরিচিত জনের ছবিটা রেখে দিতে
‘কে সে?’ সে হেসে বলেছে শুধু ‘বলা যাবে না।’

তার পরে এগারোটি বছর আমাদের দেখা নেই
এতগুলো বছর পাকা রুটি ফলগুলো লোকটার জন্য অপেক্ষা করেছে
যখন পাখিরা গান গাইছে গাছে গাছে
মেয়েটি তার চিঠির অপেক্ষা করছিল যেন রোদে পোড়া মাটির প্রতীক্ষা বৃষ্টির
সে ভাবতো সেঁকা ক্যাসাভার শেকড় ভাগ করে খাওয়ার কথা
অপেক্ষার এগারোটি বছর
এগারোটি বসন্তে রক্ত ঝরা
বাড়ি ছেড়ে এসে আমি সৈনিক হলাম
একটি শাখার একমাত্র পাতার চিত্রকল্প হয়ে রইলো মেয়েটি
চাঁদ, তারা আর নদীর জোয়ার দেখিয়ে দিতে ডাকছিল তাকে
শপথের বাণী
মাঝে মাঝে বুকে কষ্ট হতো অভিযুক্ত সাম্যবাদী রাতগুলোতে
তার দুঃখের কথা ভেবে
তার চিঠির অক্ষরগুলো তার মতোই হালকা পাতলা, লিখতো

‘দয়া করে ছবিটা খুব যতেœর সাথে রাখবেন।’

জীবন নাটকের এগারোটি বছর

এগারোটি যুদ্ধের হেমন্ত
জুনের এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় মেয়েটিকে সাথে নিয়ে
নদীর পাড় ছিল জোনাকীর আলোতে রঙিন
চিৎকার শোনা যাচ্ছিল শত্রু শিবির দখল করার
রাইফেলটি তার হাতে দেবার সময় জোনাকীর আলোতেও দেখি
তার গাল বেয়ে ঝরছে চোখের পানি
‘আমি সুখী, এখন আমি শত্রুকে লক্ষ্য করে গুলি করতে পারি
যদি আগামীকাল মরেও যাই।’
এটা কি নগুয়েত নগার সহজ কবিতার কথা?
এখন জীবনে ঢুকে গেছে, পরিপাটি চুল মোড়ানো পাজামা।
সে এখন ছোট্ট লিবারেশন আর্মি গার্ল
নৌকো বেয়ে আমাদের কাই নদী পার করে দিয়েছে
হলুদ তারা জেগে আছে পর্বতের চূড়ার ওপর
কোনও প্রিয়জনকে আলো দিয়ে ঢেকে দেবে।

বড় হওয়ার এগারোটি বছর
এগারোটি বছর বিজয় বসন্তের
এখনও আমরা খাই সেদ্ধ ভুট্টা আর টকসবজি
জীবন ছিল উজ্জ্বল বাজার আর স্কুলে
একদিন যুদ্ধ শেষে বিজয়ের আনন্দে ফিরে এসেছি
ধুলোর মেঘের মধ্যে হতবুদ্ধি হয়ে তাকে ডাকলাম ‘আপু’!
তার একটি পা শত্রুর গুলিতে ভেঙ্গে গেছে, লাফিয়ে চলতে হয়
তাকে বলা হয়েছিল আত্মসমর্পণ করতে, রাইফেলটি ভেঙে ফেললÑ ‘না’।
ঘূর্ণিবায়ু বইছে বনভূমির ওপর
তোমার কি মনে আছে সে তার চুল শুকাতো এমন বাতাসে
পুকুর আর কুয়োর পাশের সাদা লেবু ফুল গাঁথতো চুলে
হয়তো দেশকেই জিজ্ঞাসা, যদিও মৃত্যু এগিয়ে আসছে রণাঙ্গনের দিকে

সর্বশেষ যুদ্ধে তোমরা জিতেছো
ফিরে এসো তুমি তার কাছে, শপথ পূর্ণ হবে তোমার
ছবিটি এখনও আমার কাছে, ফিরিয়ে দিতে মনে ছিল না
যখন পাখিরা ফিরে আসবে, তোমাকে খুঁজবো ঐ উঁচু আকাশে।
অনুবাদ করেছেন কাজী মহম্মদ আশরাফ