মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ৫ এপ্রিল ২০১৩, ২২ চৈত্র ১৪১৯
জাদুসম্রাট পিসি সরকার
মোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল
পারফরর্মিং আর্টসের মধ্যে সম্ভবত ম্যাজিকই একমাত্র শিল্প যা কখনও মানুষকে দুঃখ দেয় না। ফুটবল, ক্রিকেট, টেনিসভক্তরা প্রিয় দল বা মানুষ ব্যর্থ হলে মাঠের মধ্যে কী রকম উন্মত্ত আচরণ করেন, দুঃখ পান, কেঁধে ফেলেন বা মাঝে মাঝে আত্মহত্যা করেন, তা তো খবরের কাগজের পাতা খুললেই রোজই দেখা যায়। বিলায়েত খান কিংবা নিখিল ব্যানার্জীর সেতার শুনতে শুনতে অনেকের চোখে জল এসে যায়। ম্যাজিক কিন্তু চোখে জল আনে না। মন খারাপ করা মানুষ হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসে। ঘণ্টা তিনেক কাটাবার পর নির্ভেজাল বিনোদনের এ রকম মাধ্যম দুনিয়ায় আর দ্বিতীয়টি আছে বলে আমার মনে হয় না।
আধুনিক বাঙালীদের মধ্যে যে কয়জন ক্ষণজন্মা মানুষ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন, ঐন্দ্রিজালিক পিসি সরকার তাঁদের মধ্যে অন্যতম। জাদুশিল্পী পিসি সরকারের পুরো নাম প্রতুল চন্দ্র সরকার। ১৯১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আমাদের বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার আশেকপুর গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। স্থানীয় শিবনাথ হাইস্কুলে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয়। পিতার নাম ছিল ভগবান চন্দ্র সরকার। মায়ের নাম ছিল কুসুম কামিনী দেবী। পিসি সরকাররা ছিলেন দু’ ভাই। পিসি সরকার বড়, ছোট ভাই অতুল চন্দ্র সরকার- এসি সরকার।
বাল্যকাল থেকেই জাদুবিদ্যার প্রতি কৌতূহল এবং কিছুটা বংশগত ঐতিহ্যও তাঁকে এ পেশায় আগ্রহী করে তোলে। সেকালের বিখ্যাত জাদুকর গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন তাঁর জাদুবিদ্যার গুরু। সপ্তম-অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় তিনি জাদু দেখানো শুরু করেন। পরবর্তীকালে টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় সহপাঠীদের জাদু দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিতেন। তবে সাধারণ লেখাপড়া এতে বাধাগ্রস্ত হয়নি। ১৯২৯ সালে প্রবেশিকা এবং ১৯৩৩ সালে গণিত শাস্ত্রে অনার্সসহ বিএ পাস করে তিনি জাদুকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। জাদু জগতে ব্যাপক প্রচার লাভের উদ্দেশ্যে তিনি এক সময় নিজের পদবি সরকার বাদ দিয়ে ইংরেজী ‘সোরকার’ শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করেন। কারণ শব্দটির অর্থ ‘জাদুকর’। তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহণ করার পর তিনি আবার নিজের সরকার পদবিই গ্রহণ করেন।
পিসি সরকার শুধু জাদুশিল্পীই ছিলেন না, তিনি একজন লেখকও ছিলেন। জাদুবিদ্যা বিষয়ে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ইংরেজী, বাংলা ও হিন্দী ভাষায় প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা ২০টি। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-ম্যাজিক শিক্ষা, হান্ড্রেড ম্যাজিকস ইউ ক্যান ডু, ছেলেদের ম্যাজিক, ম্যাজিকের কৌশল, সহজ ম্যাজিক, ম্যাজিকের খেলা, মেস মেরিজাম, জাদুবিদ্যা, হিন্দু ম্যাজিক, হিপনোটিজম, ইন্দ্রজাল প্রভৃতি।
জাদু শিল্পে পিসি সরকারের কৃতিত্ব হলে তিনি বহু প্রাচীন জাদু খেলার মূল সূত্র আবিষ্কার করেন। ‘এক্সরে আই’ করাত দিয়ে মানুষ দিখ-িত করা। তার এই খেলাটি দেখে দর্শকগণ অভিভূত হয়ে পড়েন। তাঁর অপূর্ব প্রকাশভঙ্গির অসাধারণ বাস্তবতার গুণে অনেকে অজ্ঞান হয়ে যান। দ্বিখ-িত তরুণীটির কুশল বার্তা জিজ্ঞাসা নিয়ে বিবিসি অফিসে এত টেলিফোন আসতে থাকে যে, দু’ঘণ্টা পর্যন্ত অফিসের সমস্ত টেলিফোন লাইন জাম হয়ে যায়। নিউইয়র্কের টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ এই খেলাটি দেখাবার জন্য তাঁকে বিশেষ বিমানে আমেরিকায় নিয়ে যায়। আমেরিকায় তিনি অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা ও সম্মান লাভ করেন।
‘ওয়াটার অব ইন্ডিয়া’ পিসি সরকারের আরেকটি জনপ্রিয় খেলা। ১৯৩৪ সালে তিনি সর্ব প্রথম বিদেশে গমন করেন এবং ৭০টির মতো দেশে জাদু প্রদর্শন করে ব্যাপক খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এ সময় তিনি পর্যাপ্ত অর্থও উপার্জন করেন।
কলকাতা ইম্পেরিয়াল রেস্টুরেন্টে শেরেবাংলা একে ফজলুল হককে যে জাদু দেখিয়ে তিনি মুগ্ধ করেন, তার শিরোনাম ছিল বাংলার মন্ত্রী ম-লীর পদত্যাগ এ শিরোনামের একটি সাদা কাগজে প্রথমে তিনি শেরেবাংলা ফজলুল হককে কিছু লিখতে বলেন এবং তার নিচে মন্ত্রিগণ স্বাক্ষর করেন। কিছুক্ষণ পর শেরেবাংলা ফজলুল হক তাঁর নিজের লেখার পরিবর্তে দেখেন আমরা সর্বসম্মতিক্রমে সকলেই এই মুহূর্তে মন্ত্রীরা পদত্যাগ করলাম এবং আজ হতে জাদুকর পিসি সরকারই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। এটা ছিল ঋড়ৎপব ৎিরঃরহম-এর জাদু। ফোর্স রাইটিং খেলাটি দেখিয়ে ভারতের সংবাদপত্র মহলে মহাআলোড়ন ফেলে দেন। ঠিক তার পরই বিদেশে একটি বিশেষ দ্রুতগামী রেলগাড়ি আসার মাত্র ৩৮ সেকেন্ড আগে তিনি হাতকড়ি বন্ধ অবস্থায় ট্রেন লাইন থেকে মুক্ত হয়ে আসেন। এই হাতকড়িটি খুলতে ১৭টি চাবি ব্যবহার করা হতো। সেই জন্য ইংল্যান্ডের জাদুকর সম্মিলনীর তৎকালীন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি উইল গোল্ড, স্টোন তাঁকে বলেছিলেন, তুমি জন্মসিদ্ধ জাদুকর। তাঁর জাদু বিভিন্ন দূরদর্শনে যথা অস্ট্রেলিয়ান টেলিভিশন, বিবিসি, শিকাগোর ডারলিউ জিএনটিভি এবং নিউইয়র্কের এনবিসি ও সিবিএস টেলিভিশনে বহুবার প্রদর্শিত হয়েছে।
কলকাতার জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্রের নায়ক উত্তম কুমারকে দিয়ে তিনি তার বিশ্ববিখ্যাত জাদু খেলা ‘কায়া যায় ছায়া থাকে’ খেলাটি দেখিয়েছিলেন। পিসি সরকার উত্তম কুমারকে স্টেজে আমন্ত্রণ জানান এবং পেছনে একটি সাদা স্ক্রিনে তাঁকে দাঁড়িয়ে রাখেন। পর্দায় তীব্র সার্চ লাইটের আলো ফেলার সঙ্গে সঙ্গে উত্তম কুমারের ছায়া পর্দায় ভেসে ওঠে। স্টেজে তিনি তাঁকে আসন গ্রহণ করতে বলেন। কিন্তু কি আশ্চর্য উত্তম কুমার পর্দা থেকে সরে গেলেও তার ছায়াকে তিনি পর্দায় বন্দি করে রাখেন। ‘কায়া যায় ছায়া থাকে’ পিসি সরকারের এক অত্যাশ্চর্য খেলা। ১৯৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় উত্তমকুমারকে দিয়ে তিনি এই খেলাটি দেখিয়েছিলেন। সারা পৃথিবীতে পিসি সরকার ছাড়া এ খেলা আজ পর্যন্ত কেউ দেখাতে পারে না।
১৯৫৭ ও ১৯৬৭ সালে আমেরিকায় এবং ১৯৬২ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কো ও লেনিনগ্রাদ শহরে জাদু প্রদর্শন করে তিনি বিপুল সুনাম অর্জন করেন। পিসি সরকারই প্রথম রাজকীয় পোশাক এবং আকর্ষণীয় পাগড়ি পরে জাদু প্রদর্শনের প্রচলন করেন।
জাদু দেখিয়ে পিসি সরকার দেশে বিদেশে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। সর্বশ্রেষ্ঠ স্টেজ ম্যাজিকের জন্য আমেরিকার জাদুবিদ্যার নোবেল প্রাইজ বলে খ্যাত ‘দি ফিনিক্স এ্যাওয়ার্ড’ তিনি দু’বার লাভ করেন। এছাড়া তিনি ‘গোল্ডবার’ পুরস্কার, ‘সুবর্ণ লরেন মালা’ নামে জাদুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় জার্মান পুরস্কার, হল্যান্ডের ‘ট্রিকস পুরস্কার’ এবং ১৯৬৪ সালে ভারত সরকার প্রদত্ত ‘পদ্মশ্রী’ উপাধি লাভ করেন। জাদু খেলার কৃতিত্বের জন্য তৎকালীন মিয়ানমারের (বার্মার) প্রধানমন্ত্রী মার্কিন নু তার নাম দিয়েছিলেন ‘এশিয়ার গর্ব।’
পিসি সরকার ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বার্থে ১৯৩৭ সালে জাপান সফরের সমস্ত অর্থ দান করেন। তিনি ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মান, বেলজিয়াম এবং জাপানে ম্যাজিশিয়ান ক্লাবের সদস্য এবং বিলাতের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির আজীবন সদস্য ছিলেন। ইউরোপের বিখ্যাত লেখকরা তাঁর ওপর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। সে গুলোর মধ্যে ঝড়ৎধপধৎ; সধযধৎধলধ ড়ভ সধমরপ গ্রন্থ দুটি উল্লেখযোগ্য।
পিসি সরকারের জাদুর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে রঙিন চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও তাঁর ফটোগ্রাফিক এ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। জাদু শিল্পে অসাধারণ পারদর্শীতার জন্য বিশ্ববাসীর কাছ থেকে ‘জাদু সম্রাট’ ও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সম্রাট উপাধি লাভ করেন।
সংসার জীবনেও পিসি সরকার খুব সুখী ছিলেন। পিসি সরকার ১৯৭০ সালের ১৩ জানুয়ারি জাপানের আশাহিকা ওয়ার নিকটবর্র্তী জিগেৎসু শহরে জাদু প্রদর্শন করতে গিয়ে অকস্মাত মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৭ বছর।
পিসি সরকার এক ছেলে ও দু’মেয়ে রেখে গেছেন। তাঁর ছেলে পিসি সরকার জুনিয়রও একজন বিশ্ববিখ্যাত ম্যাজিশিয়ান। তিনি বর্তমানে দেশে বিদেশেও ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি একজন লেখকও বটে।
জাদু শিল্পকে যিনি বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্রতে ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্বের বুকে বাংলার ও বাঙালীকে গৌরবোজ্জ্বল জাতি হিসেবে নতুনভাবে পরিচিত করেছেন, সেই প্রতুল চন্দ্র সরকারকে (পিসি সরকার) আমরা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। আমাদের বাঙালীর বুক আজও তাঁর জন্য গর্বে ফুলে ওঠে।