মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ৫ এপ্রিল ২০১৩, ২২ চৈত্র ১৪১৯
বই পরিচিতি
প্রখরজীবন বোধের গল্প
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
ইজাজ আহ্মেদ মিলন একজন তরুণ কবি। তাঁর কবিতা আধুনিক এবং তাতে সমাজ চিত্রের ছাপ আছে। বছর চার আগে তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘নষ্ট শরীর ভিজেনা রৌদ্রজলে’ (এই কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি সিটি ব্যাংক ও ইমপ্রেস টেলিফিল্ম (চ্যানেল আই প্রবর্তিত ‘সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছিলেন) এবং গেল বছর প্রকাশিত দ্বিতীয় বই ‘দেহারণ্যের ভাঁজে শূন্যতার বিলাপ’ আমার হাতে আসে। তখনই তাঁর লেখার শক্তিমত্তা ও পারদর্শিতার পরিচয় পাই। বয়সে খুবই তরুণ- এই কবি যে একদিন আমাদের সাহিত্য অঙ্গনের প্রথম সারিতে এগিয়ে আসতে পারে তার আভাস তাঁর লেখাতেই রয়েছে।
ইজাজ আহমেদ মিলন প্রতিভাবান একজন সাংবাদিকও। ঢাকার বিভিন্ন মিডিয়ার সঙ্গে তিনি জড়িত। এই এবারের মেলায় তাঁর প্রথম গল্পের বই বেরিয়েছে। নাম ‘ছাতিম গাছের মৃত ছায়া।’ আমি তাঁর কয়েকটি গল্প পড়ার সুযোগ পেয়েছি। গল্পগুলো আগে দেশের এবং দেশের বাইরের বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। গল্পগুলোতে আধুনিক জীবনবোধ প্রখর। ভাষা ও প্রকাশ ভঙ্গিতেও নতুনত্ব আছে। শুধু দেশের বর্তমান সামাজিক অবক্ষয় নয়, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে আমাদের জাতীয় জাগরণের খ- খ- ছবিও আছে গল্পগুলোতে। কোন কোন গল্পে বড় উপন্যাসের পটভূমি আছে। এ প্রজন্মের শক্তিমান লেখক ইজাজ আহ্মেদ মিলন কবিতার মতো গল্প লেখাতেও মুনশিয়ানা দেখিয়েছে। তাঁর কবিতার বইয়ের মতো গল্পের বইও পাঠকদের সমাদর লাভ করবেÑ এটা আমার ধারণা।

ভালোবাসার দিনলিপি
দুলাল মাহমুদের ‘ভালোবাসার দিনলিপি’ বইটি পাঠকের হৃদয়ে একটু অন্য রকম অনুভূতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে বলেই আমার বিশ্বাস। নারী, গুগল, ইয়াহু, ফেসবুক আর চিঠির সমন্বয়ে চিত্রিত প্রচ্ছদই প্রকাশ পায় ভিন্ন ধর্মী কোন রচনা। আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি ও ঐহিত্যবাহী চিঠি আদান-প্রদানের ভিত্তিতে দু’জন মানবমানবী দোলন ও শ্রাবণীর মধ্য গড়ে ওঠা সখ্য, বিরহ-যাতনার মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত সময়গুলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে নিপুণ ভাষাশৈলীর বিন্যাসে। বইটি প্রচলিত রীতির উপন্যাস থেকে ভিন্নধর্মী। প্লটের বিস্তার খুব বেশি নয়। বাস্তব জীবনে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে ঘটে যাওয়া দু’জন মানব মানবীর জীবন আখ্যানের বহির্প্রকাশ ঘটানো হয়েছে। চরিত্রের ঘনঘটা যেমন নেই তেমনি নেই কাহিনীর স্থ’ূলতা। ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দোলন ও শ্রাবনীর পরস্পরের প্রতি তীব্র ভালবাসা, কাছে আসার আকাক্সক্ষা আর ভুল ভ্রান্তিতে সৃষ্ট তীব্র ঘৃণা। বইটিতে আছে অভিমানের সুর, পরস্পরের প্রতি অনুরাগ ও বিরাগ। আলো ও অন্ধকারের মিশেলে তাদের জীবন পরস্পরকে কাছে পাবার ইচ্ছা আবার অনীহাও তুলে ধরা হয়েছে। দেখা যায় সমাজকে উপেক্ষা করে প্রচলিত রীতিভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্ত আবার সিদ্ধান্তহীনতা। বইটি পড়তে পড়তে দেখলাম বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের দোলাচালে বিদ্যমান দুটি জীবনের নিত্য সংগ্রাম। প্রতিনিয়ত দু’জন দু’জনার সাংসারিত জীবনের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে এক সময় সম্পর্কের বেড়াজাল ছিন্ন করতে বদ্ধপরিকর হয় আবার অজানা এক তীব্র আকর্ষণে বাস্তবকে অবাস্তব ধারায় পর্যবসিত করে প্রাণান্ত চেষ্টা চালায় কাছে যেতে। বইটিতে আছে নানামুখী টানাপড়েন। কখনও কখনও মনে হয় এদের ভালবাসা চিরন্তন আবার কখনও কখনও ঘটনার আবর্তে মনে হয় অনেকটাই ঠুনকো। মাঝে মাঝে মনে হয় এদের মাঝে আসলে ভালবাসা নেই, আছে শুধু মোহ। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় এদের অপরিসীম ভালবাসার জোয়ারে সারা বিশ্ব সাজবে নতুন সাজে। বইটি আধুনিক জীবনে দু’জন নরনারীর জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু কথামালার সমষ্টি। একটু ভিন্ন রকম ভালবাসার সম্পর্কের বেড়াজালে আবদ্ধ এই দুই নর-নারী প্রতিনিয়ত একে অপরকে কখনো অন্তর্জালে, কখনো চ্যাটিংয়ে, কখনো দূরালাপনীতে আবার কখনো চিঠিতে ব্যক্ত করেছেন মনের একান্তই না বলা কথা। আবার প্রকাশ করেছেন মনের তীব্র জ্বালা, ক্ষোভ আর অভিমান। এই প্রধান দুই চরিত্রকে কেন্দ্র করে পুরো বইটির কাহিনী আবর্তিত হলেও আছে ছোটখাটো কিছু চরিত্রÑ যা বইটির কাহিনীকে করেছে সমৃদ্ধ। প্রকৃত অর্থে ‘ভালোবাসার দিনলিপি’ বইটি বর্তমান মানুষের জীবনের একটি স্বাভাবিক বিষয়কে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস মাত্র। এককথার বলতে পারি, বইটি পাঠক হৃদয়ে ভিন্নধর্মী স্বাদ নিয়ে আসতে সমর্থ হবে। জোনাকী প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত এই বইটি পাঠককে নতুন করে ভাবাতে সক্ষম হবে বলেই মনে হচ্ছে।
মোঃ আরিফুর রহমান