মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১ এপ্রিল ২০১১, ১৮ চৈত্র ১৪১৭
'কসবি'_গণিকাদের জীবনকাব্য
মহি মুহাম্মদ
বাংলা সাহিত্যে বেশ্যাদের নিয়ে বেশ কয়েকটি উপন্যাস রচিত হয়েছে। তন্মধ্যে শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'জনপদ বধূ', সমরেশ বসুর 'বারো বিলাসিনী', সমরেশ মজুমদারের 'সুধারানী' ও রিজিয়া রহমানের 'রক্তের অক্ষর' উলেস্নখযোগ্য। এই ধারায় সমপ্রতি যুক্ত হলো হরিশংকর জলদাসের (১৯৫৫_)'কসবি'। সেলিনা হোসেনের 'মোহিনীর বিয়ে' উপন্যাসেও বেশ্যাদের জীবনচিত্র উঠে এসেছে। তবে তা রিজিয়া রহমানের রক্তের 'অক্ষর'-এর মতো নয়। আবার 'রক্তের অক্ষর' কিংবা মোহিনীর বিয়ে উপন্যাসের চাইতে বেশ্যাদের ক্লেদাক্ত জীবন পরিপূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে হরিশংকর জলদাসের 'কসবি'তে। 'কসবি' প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল জনকণ্ঠ (২০১০) ঈদসংখ্যায়। লেখকের প্রথম দুটি উপন্যাস যথাক্রমে- জলপুত্র (২০০৮) ও দহনকাল (২০১০) লিখিত হয়েছিল কৈবর্তসমাজের দুঃখদুর্দশা, শোষণ-বঞ্চনার কথা নিয়ে। বিষয়ের আবর্তে গণিকাদের রক্ত-মাংস-পুঁজময় জীবন ও এদের ভাব-ভালোবাসা, স্বপ্ন, চাওয়া-পাওয়ার কাহিনী নির্মাণ করেছেন কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস। অনেককাল অতিক্রম করে বেশ্যাবৃত্তি আজও এ উপমহাদেশে অব্যাহত রয়েছে। এদেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের একটি বেশ্যাপলস্নী_চট্টগ্রামের সাহেবপাড়া। প্রায় তিনশ' বছরের পুরনো এই পলস্নীকে কেন্দ্র করে 'কসবি' উপন্যাসটি রচিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, এ পলস্নী সংশিস্নষ্ট তৎকালের চট্টগ্রামের কাস্টম হাউসের বর্ণনাও উঠে এসেছে এই উপন্যাসে। উলিস্নখিত জনপদের সমকালীন সময়ের মানুষের আচার-আচরণ গতিবিধি ও কালের নির্জন স্বাক্ষর এই উপন্যাসে ধরা হয়েছে।
সুদূর নরসিংদীর বীরপুরের দাসপাড়ার কৃষ্ণা একদিন চট্টগ্রামের সাহেবপাড়ার রূপসী দেবযানী হয়ে উঠল। দেবযানী হয়ে ওঠার গল্প, করম্নণ ইতিহাস যার মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে, সে তাকে খুঁজে বের করেছে কিন্তু প্রতিশোধ সে নিতে পারেনি। প্রকৃতি তার শোধ নিয়েছে। ট্রেনে কাটা পড়ে সে তপন এখন ভিক্ষে করে। দেবযানীর পাশাপাশি সাহেবপাড়ার পূর্ব ও পশ্চিম গলিতে যে সব বেশ্যা এ উপন্যাসে উঠে এসেছে তারা কেউ দেবযানীর সমকক্ষ নয়, তবে সাহেবপাড়ার পদ্মাবতীর রূপের সুনাম একদিন বেশ ছড়িয়ে পড়েছিল। এই দুজনের পাশাপাশি অন্য যে সব বেশ্যাদের কথা এই উপন্যাসে উঠে এসেছে, তারা হলো_চম্পা, বিজলি, আইরিন, বনানী, বেবি, ইলোরা, মার্গারেট, জুলিয়েট, সুইটি, মমতাজ, রীতাকুমারী, কুলসুম, অনিতা, সুরভি, রোকেয়া, উমা প্রম্ন এবং শিউলি। এসব বেশ্যাদের প্রাত্যহিক জীবনের ছক মাসীদের ওপর ন্যসত্ম, মাঝে মধ্যে মাসত্মানদের দ্বারা এদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। মাসিদের রীতি-কৌশল ও গু-া বদমাশদের দৌরাত্ম্য 'কসবি' উপন্যাসে ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। এই উপন্যাসে মোহিনীবালা দাসী, জটিলা, শৈলবালা, মঞ্জু ও জোলেখা মাসির কর্তৃত্ব অঙ্কিত হয়েছে।
বেশ্যাদের কাস্টমার ধরার বড় মাধ্যম হলো-দালাল। এখানে দালালরাও তাদের স্বমহিমায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে- শামছু, সেলিম, জামাল, রতন ও প্রেমাদাশ তাদেরই উত্তরসূরি। বেশ্যাদেরও ভালোবাসার মানুষ আছে। আছে তাদের বাঁধা কাস্টমার। এখানে বিশেষ বা বাঁধা কাস্টমার হিসেবে যে সব চরিত্র উঠে এসেছে সেগুলো হলো_ জব্বার সওদাগর, জয়নাল আবেদীন, খায়রম্নল আহসান চৌধুরী, রাজন ভৌমিক ও এক বিদেশী। বেশ্যাদের রোগে-শোকে ডাক্তার প্রয়োজন। এই উপন্যাসে জীবন ডাক্তার ও মোহাম্মদ বিন কাশেম ডাক্তারের আবির্ভাব ঘটেছে। অন্যান্য সাধারণ চরিত্রে মধ্যে যে সব চরিত্র উঠে এসেছে সেগুলো হলো_ কৈলাস, কালু সর্দার, শৈলেশ, যশোদা, শ্যামাচরণ, আবদুল গফুর, রামকুমার, পুরোহিত, শফি, সোমা, মোক্ষদা, দুলাল, ইকবাল, ধামা ফারম্নক, সুবল, ইউনুছ, রহমান, বলরাম, নির্মলা, ল্যাংড়া রহিছ ইত্যাদি। ছোট বড় সব মিলিয়ে প্রায় ষাটটি চরিত্রের সনি্নবেশ ঘটিয়েছেন লেখক।
বেশ্যাপুত্র কৈলাস এ উপন্যাসে একটি উজ্জ্বল চরিত্র। এই চরিত্রটির মধ্যে দিয়ে লেখক বেশ্যাপলস্নীতে শ্রেণী সংগ্রামের সূচনা ঘটিয়েছেন। বেশ্যাদের দুঃখ-দুর্দশায় এই চরিত্রটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরম্ন করেছিল। কিন্তু মাসত্মানদের হাতে তাকে অকালে প্রাণ হারাতে হয়েছে। বেশ্যাদের পূজা-অচর্নার বিষয়টিও লেখক তুলে ধরেছেন। কার্তিক মাসের চতুর্দশী তিথিতে মহাড়ম্বরে কালীপূজা হয়। এছাড়া ফাগুন মাসে পতিতরা শিবপূজা করে। এদিন পতিতারা শরীর বেচা-কেনা বন্ধ রাখে।
হরিশংকর জলদাস এ সমাজের প্রানত্মিক গণমানুষের দক্ষ রূপকার। তাঁর লেখায় এ সমাজের বঞ্চিত মানুষের হাহাকার, হতাশা, বিবমিষা, রিরংসা, স্বপ্নভঙের কষ্ট ও প্রতিবাদের ভাষা নিপুণ চিত্রকরের চিত্রের মতো উদ্ভাসিত হয়েছে। বেশ্যাদের জীবন নিয়ে বাংলা সাহিত্যে যে কয়টি উপন্যাস রচিত হয়েছে তন্মধ্যে হরিশংকর জলদাসের 'কসবি' উলেস্নখযোগ্য। লেখকের বিষয় বৈচিত্র্যে বাংলা সাহিত্যের উপন্যাসের ধারায় 'কসবি' উলেস্নখযোগ্য হয়ে উঠবে বলে বিশ্বাস রাখা যায়।
কসবি; হরিশংকর জলদাস; প্রকাশক : শুদ্ধস্বর; প্রচ্ছদ : তৌহিন হাসান; মূল্য : ২২৫ টাকা।