মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ৫ নভেম্বর ২০১০, ২১ কার্তিক ১৪১৭
সুলতান সাধুর কর
তানভীর আহমেদ সিডনী
একবিংশ শতাব্দীর জটিলতা আমাদের চতুর্পাশে দীর্ঘ হয়। প্রযুক্তির বিকাশ, বিলাসব্যসনের পথে চলা_ এসবই লোভের দানোটাকে বৃহদাকৃতি করে তোলে। এই প্রাপ্তির আকাঙ্ৰায় ব্যক্তির জীবন ও কর্মে জটিলতা আমদানি হয়। ফলে এ শতকের মানুষের মাঝে জটিল চিন্তন ক্রিয়া করে। মুক্তি চায়, মেলে না। জটিলতার বৃত্তে ঘূর্ণায়মান মানবের জীবনে কখনও কখনও যান্ত্রিকতার ছায়া মুছে প্রকিৃতিসংলগ্নতা আসে, এরই উদ্ভাবন 'সাধুর কর'। কবি আমিনুর রহমান সুলতান রচিত কাব্যগ্রন্থ। ৪০ খানি কবিতার সমবায়ে নির্মিত এ গ্রন্থের ভেতরে ব্যক্তির আকাঙ্ৰা সামস্টিক আকাঙ্ৰারূপে এসেছে।
বেঁচে থাকা ও পার্থিব সুখভোগের লোভে জটিলতার পাকে ডুবে যাওয়া মানুষের ভেতরে যে স্বপ্ন কাজ করে তাকে শব্দ আর বাক্যের নান্দনিক সমন্বয়ে মূর্ত করে তুলেছেন। একুশ নম্বর কবিতায় সাধু কবি আমিনুর রহমান সুলতান লিখেন_
আমাদের স্বপ্ন যেন সাত আসমান
উড়ে যাওয়া, নামে না আখড়ায়
দেয় না ধরা শিশুদের ঘুড়ির মতো...
স্বপ্নহীন মানুষের মানসিক মৃতু্য হয়। দৈহিক মৃতু্যর চেয়ে এ ভয়াবহ, মানুষটি নড়ছে চড়ছে, কথা বলছে_
কিন্তু তার ভেতরে জীবনীশক্তি নেই। তার সকল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মৃত। মৃত এ মানুষের কার্যকারণ আবিষ্কার করা যায় কবিতার সত্মবকে,
সত্তার আগুন নিভে গেলে
মানুষেরা মরে যায়
ভিতরে ভিতরে
আমিনুর রহমান সুলতান আধ্যাত্ম চেতনায় ডুবে সমকালকে ভুলে যান না। বরং সমকাল তাঁর কবিতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তিনি কালের বর্ণনা দেন না, কিন্তু কালকে ছুঁয়ে যান শব্দ ও বাক্যবিন্যাসের উপস্থাপনায়। বাঙালীর সংস্কৃতি চেতনাকে কামড়ে ধরেছে ধর্মাশ্রিত গোষ্ঠী ও ভিন্ন ভূগোলের সংস্কৃতি। এ থেকে উত্তরণের পথ জাতীয় সংস্কৃতিকে অাঁকড়ে ধরা। কবি তখন শিকড়ের দিকে চোখ রাখেন, উন্মুল সংস্কৃতি চর্চারতদের বিপ্রতীপে কবির পথ চলা। রাজধানীর বৈশাখ উদ্যাপনের স্মারক রমনা বটমূলের দিকে চোখ ফেরানো। নাগরিক মানুষ এই প্রতীকের দিকে তাকিয়ে অর্থনৈতিক কারণে ছেড়ে আসা গ্রামীণ জীবনের দিকে তাকায়, যেখানে শীতে রসের গুড় বানানো, কাসন্দ তৈরির নানা আচার আয়োজন। অথবা নতুন ফসলের ফলন উৎসব। তেরো নম্বর কবিতায় 'ধান দূর্বা', 'রমনা বটমূল', 'বৈশাখ', 'শিকড়' ইত্যাদি শব্দগুলোই নিয়ে যায় হাজার বছরে চর্চিত সংস্কৃতিচর্চার দিকে। একই সঙ্গে পাঠকের মনে পড়ে যায় রমনা বটমূল ও ২১ আগস্টের জনসভায় বোমা হামলার স্মৃতি। ধমর্ীয় ও মৌলবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি ও রাজনীতি নিশ্চিহ্ন করার জন্য হত্যা উৎসব। মাঠ ও রাজপথে খ- খ- শরীর আর জমাট রক্ত। এক নতুন শপথে উদ্দীপ্ত হবার উপাদান।
চলিস্নশটি কবিতায় প্রাপ্ত নির্বাচিত শব্দগুলো হলো, ষাঁড়ের লড়াই, তাবিজ, গেরম্নয়া পোশাক, ঘানি, সরষে, পাকা কলা, আখড়া, হাঁওড়, ভেলা, ঝরনা, ধান, ইঁদুর, নৌকা, সমুদ্র, মাকু, জামদানি, সাপ, ঘেটা, কানাওয়ালা, বটমূল, তুষ, বাঁশি, ছাইদানি, সূর্য, সোনা, হাপড়, ডুবুরি, চায়ের বাগান, পেঁচা, ঘাট, খাসজমি, ঘোড়া, কোড়াপাখি, মাছ ইত্যাদি। এই শব্দগুলো যেন বাংলাদেশের রূপ, রস ও গন্ধকেই তুলে আনে। বাঙালীর ঐতিহ্য ও বাসত্মবতার ক্লিষ্টতা কবির রচনায় চিত্রিত।
জীবন যন্ত্রণার জটিলতায়, সংৰুব্ধ কবি নিজেকে সাধুর অবস্থানে উপনীত করেন। তিনি তখন আমাদের অর্থশাস্ত্রের শিৰক হয়ে উঠেন,
পিঁপড়ার যে খিদে অল্পেতে মিটানো যায়
তাকে পোষা যায়
যায় না তোমাকে
বাজার অর্থনীতির এই সমাজে দাঁড়িয়ে কবি সম্পর্কের বিবেচনা করবেন অর্থশাস্ত্রের তত্ত্বে। এই সুখপাঠ্য গ্রন্থটি পাঠে নানামাত্রিক অর্থ সন্ধানের সুযোগ রয়ে গেছে। আগ্রহী ও বিশেস্নষণপ্রবণ পাঠক কবিতাসমূহের বিশেস্নষণ করবেন প্রত্যাশা করি।

সাধুর কর; আমিনুর রহমান সুলতান; বিজয় প্রকাশন; প্রচ্ছদ : ধ্রম্নব এষ; প্রকাশকাল : আগস্ট ২০১০; মূল্য : ৫০.০০ টাকা।