মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ৩ অক্টোবর ২০১১, ১৮ আশ্বিন ১৪১৮
নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান অর্থনীতিবিদরা
ব্যাংকগুলোর তদারকিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা নিয়ে সিপিডির আশঙ্কা
আতিকুর রহমান ॥ ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূল স্রোতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতেই নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশের অর্থনীতিবীদরা। অন্যদিকে এই মুহূর্তে দেশে নতুন কোন বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন নেই বলেও মতামত রয়েছে অনেক অর্থনীতিবিদের। পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়েই প্রায় এক যুগ পর এগিয়ে চলছে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার এই প্রক্রিয়া। গত শনিবার বেসরকারী খাতে নতুন বাণিজ্যিক ব্যাংক স্থাপনের জন্য আবেদন চেয়ে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক স্বাক্ষরিত এ বিজ্ঞপ্তিতে আগামী ৩০ নবেম্বরের মধ্যে আবেদনপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। আবেদনের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বরাবরে ১০ লাখ টাকার অফেরতযোগ্য ব্যাংক ড্রাফট জমা দেয়ার পাশাপাশি নতুন ব্যাংকের বিষয়ে একটি নীতিমালাও প্রকাশ করা হয়েছে।
নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, 'দেশের অর্থনীতির পরিধি দিন দিন বাড়ছে। তাই আর্থিক সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। সর্বস্তরের মানুষের সঞ্চিত সম্পদ জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত করতেই দেশে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠারও দরকার আছে।'
সিপিডির এই নির্বাহী পরিচালক বলেন, অর্থনীতির আকারে নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন থাকলেও এর প্রক্রিয়াটা নিয়মমাফিক হয়নি।
মোসত্মাফিজুর রহমান আরও বলেন, দেশে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর সুপারভিশন করতে হিমশিম খাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ওপর নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ৰেত্রে আরোপিত শর্তগুলো সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে কিনা! বাংলাদেশ ব্যাংকের পৰে এই বিষয়গুলো মনিটরিং করার মতো সৰমতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সিপিডির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইকোনমিঙ্রে বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মাহবুব আলী জনকণ্ঠকে বলেন, 'প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মনোপলি প্রবণতা থেকে বের হতে এবং ব্যাংকিং খাতে সুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টির লৰ্যে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা একটা সময়োপযোগী পদৰেপ। কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে কৃষকের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পেঁৗছে দেয়ার স্বার্থেই নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার দরকার।'
তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় নতুন ব্যাংক স্থাপনে আরোপিত শর্তগুলো নিশ্চিতকরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্তিশালী ভূমিকা থাকতে হবে। অন্যথায় এর সুফল থেকে বঞ্চিত হবে দেশের প্রানত্মিক জনগোষ্ঠী।
মূলত এ লৰ্যেই নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হচ্ছে বলে দাবি করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গর্বনর ড. আতিউর রহমান। তিনি বলেন, দেশের প্রানত্মিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূল স্রোতের সঙ্গে যুক্ত করতেই নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন। গ্রামাঞ্চলের ওইসব দরিদ্র লোকদের সঞ্চিত সম্পদ অর্থনীতির মূল ধারায় যোগ করতে পারলে জাতীয় অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে বলে মনে করেন গবর্নর।
দেশের প্রচলিত ব্যাংকগুলোতে কর্মরতরা বলেন, ডিপোজিট সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকে প্রচুর চাপ রয়েছে। ডিপোজিটের জন্য ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হচ্ছে। তারল্য সঙ্কটের এই পরিস্থিতিতে নতুন ব্যাংক খোলার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন তাঁরা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা মির্জা এবিএম আজিজুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, এই মুহূর্তে দেশে নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। অর্থনীতির আকার ছোট হওয়াতে এর প্রভাবে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সুদের হার আরও বাড়বে। কারণ, ব্যাংকগুলোকে টিকে থাকার তাকিদেই এমনটা করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
অর্থনীতিবিদ আলী আহমদ বলেন, 'এই মুহূর্তে দেশে নতুন ব্যাংকের দরকার না থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শর্তগুলোর যথাযথ বাসত্মবায়ন সম্ভব হলে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই শর্ত পালনে নতুন ব্যাংকগুলোকে কতটা বাধ্য করতে পারবে- তার ওপরই নির্ভর করছে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার সফলতা।'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশ জনকণ্ঠকে বলেন, নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুফল নির্ভর করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা ও বাসত্মবায়নের ওপর। দরিদ্রদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে নতুন ওই ব্যাংকগুলো গ্রামাঞ্চলে কোথায় শাখা স্থাপন করবে। এখানে গ্রামের সংজ্ঞা পরিষ্কার করা দরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা না মানলে ব্যাংকগুলোর জন্য শাসত্মির বিধান কী! এগুলো পরিষ্কার করে নতুন ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মানতে বাধ্য করতে পারলেই দরিদ্ররা এর সুফল পাবে।
বিশেস্নষকদের মতে, দেশের অর্থনীতিতে এখন আমূল পরিবর্তন এসেছে। বিনিময় ব্যবস্থা থেকে ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ। এক সময়ের ৫০ ডলারের মাথাপিছু আয় এখন দাঁড়িয়েছে ৮৮০ ডলারে। মোট জাতীয় আয়ে বহির্বাণিজ্যের অংশ ১০-১২ থেকে এখন ৪৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কয়েক মিলিয়ন (স্বাধীনতা-উত্তর) ডলারের রফতানি থেকে এখন রফতানি আয় ২৩ বিলিয়ন ডলার, আমদানি ৩৩ বিলিয়ন ডলার। জনসংখ্যার সঙ্গে পালস্না দিয়ে বাড়ছে দেশের অর্থনীতি আকার। তাই এক যুগ পরে দেশে দু'চারটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠাকে কল্যাণমুখীই মনে করছেন তাঁরা।
তবে, তাদের পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভিশন কার্যক্রম নিয়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটরিং সক্ষমতা ও সর্বোপরি কার্যকর প্রতিযোগিতার ওপরই নির্ভর করে জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রভাব।