মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারী ২০১১, ৭ মাঘ ১৪১৭
বুকবিল্ডিং পদ্ধতি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত
আইপিও আবেদন জমা নেয়া কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে বাধা থাকবে না
অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আগেই অতি মূল্যায়ন রোধ এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজার থেকে অতিরিক্ত অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ বন্ধে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে বুকবিল্ডিং পদ্ধতির কার্যকারিতা আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বুধবার সকালে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সরকারী বাসবভনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশনকে (এসইসি) এ সংক্রান্ত পরামর্শ দেয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে এসইসি ইতোমধ্যেই বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশিস্নষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারের অতি মূল্যায়নের বিষয়টি আলোচনায় আসে। বৈঠকে বলা হয়, বুকবিল্ডিং পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেক কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসার আগেই শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ করছে। এর ফলে বাজার থেকে অতিরিক্ত অর্থ স্থানানত্মরিত হয়ে যাচ্ছে। এই পদ্ধতি মূল্য নির্ধারণের পর প্রাথমিক গণপ্রসত্মাবের (আইপিও) মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হওয়ায় শেয়ারবাজারে বর্তমান অর্থসঙ্কট বেড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে বুকবিল্ডিং পদ্ধতি স্থগিত রাখার প্রসত্মাব করা হয়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এই প্রসত্মাবে সম্মতি প্রকাশ করে বাজারে স্বাভাবিক অবস্থা না ফেরা পর্যনত্ম বুকবিল্ডিং পদ্ধতি স্থগিত রাখার পরামর্শ দেন।
সংশিস্নষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই বৈঠকের আলোচনার ভিত্তিতে এসইসি ইতোমধ্যেই বুকবিল্ডিং পদ্ধতি স্থগিত রাখার নীতিগত সিদ্ধানত্ম নিয়েছে। দু'একদিনের মধ্যেই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে। বাজারে স্থিতিশীল পরিস্থিতি ফিরলে নতুন করে পর্যালোচনার পর বুকবিল্ডিং পদ্ধতি নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধানত্ম গ্রহণ করা হবে।
সূত্র জানায়, বুকবিল্ডিং পদ্ধতি স্থগিত হলে যেসব কোম্পানি ইতোমধ্যেই নির্দেশক মূল্য নির্ধারণ করে এসইসিতে আবেদন জমা দিয়েছে_ সেসব কোম্পানি চাইলে নির্ধারিত মূল্য (ফিঙ্ড প্রাইস) পদ্ধতিতে আইপিওর জন্য আবেদন করতে হবে। অন্যথায় এসব কোম্পানিকে বুকবিল্ডিং পদ্ধতি নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধানত্মের জন্য অপেৰা করতে হবে। তবে ইতোমধ্যেই যে দু'টি কোম্পানি বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে মূল্য নির্ধারণের পর আইপিও আবেদন জমা নিয়েছে, সেগুলো লটারির মাধ্যমে শেয়ার বরাদ্দের পর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হবে।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন পরীৰা-নিরীৰার পর পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির জন্য শেয়ারের প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণের লৰ্যে বুকবিল্ডিং পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক আগে থেকেই সফলভাবে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। দেশের পুঁজিবাজারে এই পদ্ধতি চালু করার জন্য গত বছরের ৯ মার্চ বিধিমালা জারি করে এসইসি। প্রচলিত পদ্ধতির নির্ধারিত মূল্যের (ফিঙ্ড প্রাইস) পাশাপাশি বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারের দর নির্ধারণের লৰ্যে ২০০৬ সালের সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশন (পাবলিক ইসু্য) আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হয়। বুকবিল্ডিং পদ্ধতি চালু হলেও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি না থাকায় এটি প্রয়োগ করতে সময় লেগেছে এক বছর। ২০১০ সালের মার্চে এই পদ্ধতির প্রয়োগ শুরম্ন হয়।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বুকবিল্ডিং পদ্ধতির অংশ হিসেবে দর প্রসত্মাবের (বিডিং) মাধ্যমে বরাদ্দ পাওয়া শেয়ার বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞার (লক ইন) মেয়াদ খুবই কম হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বেশি দরে শেয়ার বিক্রি করে বের হয়ে যায়। পরবর্তীতে ওই শেয়ারের দর কমে যায়। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রসত্ম হন।
বিশেস্নষকদের মতে, বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে এ পর্যনত্ম অনুমোদন পাওয়া সব কোম্পানিই লেনদেন শুরম্নর আগে থেকেই অতি মূল্যায়িত হয়েছে। অতি মূল্যায়িত হিসেবে এসইসি বর্তমানে কোন শেয়ারের বাজার মূল্য ও আয়ের অনুপাত ৪০-এর বেশি হলে মার্জিন ঋণ দেয়া নিষিদ্ধ করে রেখেছে। অথচ বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে বাজারে আসা সব কোম্পানিই পিই অনুপাত ৪০-এর উপরে থেকে লেনদেন শুরম্ন করে। এই পদ্ধতি প্রথম মূল্য নির্ধারণ হয় ওশন কন্টেইনারের। ২০০৯ সালে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ২ টাকা ৪০ পয়সা। বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে কোম্পানির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারিত হয় ১৪৫ টাকা। ফলে লেনদেন শুরম্নর আগেই প্রতিটি শেয়ারের দর এর প্রকৃত আয়ের তুলনায় ৬০ গুণ বেশি নির্ধারিত হয়। আরএকে সিরামিকের ইপিএস ছিল ১ টাকা ৯ পয়সা। বুকবিল্ডিং পদ্ধতি প্রয়োগ করে কোম্পানিটির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৪৮ টাকা। শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরম্নর আগেই কোম্পানিটির পিই অনুপাত দাঁড়ায় ৪৪। খুলনা পাওয়ারের ইপিএস ছিল ২ টাকা ৭৯ পয়সা। এই কোম্পানির শেয়ারের মূল্য নির্ধারিত হয় ১৯৪ টাকা। ফলে লেনদেনের শুরম্নতেই খুলনা পাওয়ারের শেয়ারের পিই দাঁড়ায় ৬৯। বর্তমানে বাজারে আসার প্রক্রিয়ায় থাকা মবিল যমুনা লুব্রিক্যান্টের সর্বশেষ বার্ষিক হিসাবে ইপিএস ২ টাকা ৪৫ পয়সা। এই কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫২ টাকা ৪০ পয়সা। ফলে মবিল যমুনার পিই দাঁড়াচ্ছে ৬২। সর্বশেষ অনুমোদন পাওয়া ইউনিক হোটেলস এ্যান্ড রিসোর্টসের ইপিএস ৪ টাকা ৮০ পয়সা। এই কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের নির্দেশক মূল্য ধরা হয়েছে ১৮৫ টাকা। ফলে চূড়ানত্ম মূল্য নির্ধারণের আগেই ইউনিকের পিই দাঁড়াচ্ছে ৩৮.৫০। সংশিস্নষ্ট বিধি-বিধান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নির্ধারিত মূল্য (ফিঙ্ড প্রাইস) পদ্ধতির ৰেত্রে কোন কোম্পানির শেয়ারের দর মৌলভিত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন হলে এসইসি তা কাটছাঁট করতে পারে। কিন্তু বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে সুনির্দিষ্টভাবে সেই সুযোগ নেই। আইনের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সংশিস্নষ্ট কোম্পানিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।