মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকেই চলে গেলেন বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী
স্টাফ রিপোর্টার ॥ তুলি থেকে খসে পড়ল রং। প্রিয় ক্যানভাসে আর হবে না ছোঁয়াছুঁয়ী। তেল রঙের খেলা, জলরঙের খেলা শেষ হলো। আর আঁকা হবে না বাংলার মুখ। ভীষণ প্রিয় প্রকৃতিকে চোখ মেলে দেখা হবে না। আঁকা হবে না। যিনি আঁকবেন ধ্রুপদী শিল্পকর্ম, সেই তিনি বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী আর নেই। সকলকে কাঁদিয়ে রবিবার রাতে ৮০ বছর বয়সে চিরবিদায় নেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি.... রাজিউন)। প্রবীণ এই শিল্পীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চারুকলার ইতিহাসের বিশাল এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত দেশবরেণ্য এই চিত্রশিল্পীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
রবিবার রাত পৌনে নয়টার দিকে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উৎসবের মঞ্চে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এরপর তাঁকে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। এর পর বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ওই উৎসবের মঞ্চ থেকে এই শিল্পীর মৃত্যুর কথা জানানো হয় এবং অনুষ্ঠানে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রিয় শিল্পীকে শেষবারের মতো দেখতে স্বজন ও গুণগ্রাহীরা ছুটে যান হাসপাতালে।
সিএমএইচ থেকে কাইয়ুম চৌধুরীর মরদেহ রাজধানীর পান্থপথে স্কয়ার হাসপাতালে আনা হয়। স্কয়ারের হিমঘরে রাখা হয়েছে মরদেহটি। সেখানে থাকা সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর সাংবাদিকদের জানান, সোমবার সকাল ১০টায় কাইয়ুম চৌধুরীর মরদেহ নেয়া হবে প্রথমে চারুকলা ইনস্টিটিউটে। সেখান থেকে সকাল ১১টায় তাঁর মরদেহ নেয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে রাখা হবে দুপুর একটা পর্যন্ত। পরে জানাজার জন্য তাঁর মরদেহ নেয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে। এর পর আজিমপুর কবরস্থানে কাইয়ুম চৌধুরীকে দাফনের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষে সংস্কৃতিমন্ত্রী জানান।
বেঙ্গলের সঙ্গীত উৎসবের অনুষ্ঠানে থাকা জনকণ্ঠের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মোরসালিন মিজান জানান, তৃতীয় দিনের অনুষ্ঠান শুরুর আগে রাত সাড়ে আটটার দিকে মঞ্চে উঠে বক্তৃতা রেখেছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। কাইয়ুম চৌধুরী বক্তৃতা দিয়ে নেমে যাওয়ার পর অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বক্তৃতা দিতে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু আবার ফিরে এসে কাইয়ুম চৌধুরী বলেন- ‘আমার একটি কথা বলার রয়েছে।’ কিন্তু সে কথা বলার আগেই আটটা ৪০ মিনিটে হঠাৎ পড়ে যান কাইয়ুম চৌধুরী। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নেয়া হয়। এতে অনুষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। মোরসালিন জানান, অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় তখন বলেন, পড়ে গিয়ে কাইয়ুম চৌধুরী মাথায় আঘাত পেয়েছেন। এরপর হাসপাতালে নেয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই কাইয়ুম চৌধুরীর মৃত্যুর কথা জানান অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। কী কথাটি তিনি বলতে চেয়েছিলেন, তা আর জানা যায়নি।
রাষ্ট্রপতির শোক
রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ বরেণ্য শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাইয়ুম চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি দেশের চারুকলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাইয়ুম চৌধুরীর অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, এর স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি স্বাধীনতা পদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব ইহসানুল করিম জনকণ্ঠকে এ কথা জানান। শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁর মৃত্যুতে জাতি একজন বরেণ্য সন্তানকে হারাল। তিনি কাইয়ুম চৌধুরীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
প্রধানমন্ত্রীর শোক
স্বাধীনতা পদকে ভূষিত বরেণ্য চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত রাতে এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাইয়ুম চৌধুরীর মৃত্যুতে বাঙালী সংস্কৃতিসহ দেশের চারুকলা অঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (মিডিয়া) মাহবুবুল হক শাকিল জনকণ্ঠকে এ কথা জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে অনন্তকাল বাঙালী জাতির মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিটি গণতান্ত্রিক এবং স্বাধিকার আন্দোলনে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করবে। শেখ হাসিনা কাইয়ুম চৌধুরীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
সংক্ষিপ্ত জীবনী
১৯৩৪ সালের ৯ মার্চ ফেনী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন কাইয়ুম চৌধুরী। পরিবারের এক সদস্য আমীনুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছিলেন নোয়াখালীর ইতিহাস। পিতা আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী ছিলেন সমবায় বিভাগের পরিদর্শক। পরবর্তীতে তিনি সমবায় ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
কাইয়ুম চৌধুরী ১৯৫৪ সালে ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে ফাইন আর্টসে ডিগ্রী নেন। এর পর নিজের কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকায় মনোযোগী হয়েছিলেন তিনি। বইয়ের প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জার পাশাপাশি তেল ও জল রঙে আবহমান বাংলা ও বাংলার লোকজ উপাদানগুলো চিত্রে ফুটিয়ে তোলার জন্য কাইয়ুম চৌধুরীর কৃতিত্বকে স্মরণ করেন তাঁর অনুজরা। জহির রায়হানের ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ আঁকার মধ্য দিয়ে এই শিল্পে তাঁর পদচারণা শুরু। বিশ্লেষকরা বলেন, বইয়ের প্রচ্ছদের শিল্পমানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’র প্রচ্ছদশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীই। সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম দিককার গ্রন্থগুলোর প্রচ্ছদও তাঁর তুলিতেই আঁকা হয়।
১৯৫৫ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত কাইয়ুম চৌধুরী নানা ধরনের ব্যবহারিক কাজ করেছেন, বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, আর বইয়ের প্রচ্ছদ ও সচিত্রকরণের কাজ করেছেন। সিগনেটের বই কাইয়ুম চৌধুরীর জন্য ছিল এক অনুপম নিদর্শন। সাময়িক পত্রিকা বিষয়ে আগ্রহী কাইয়ুম চৌধুরী, ছায়াছবি নামে একটি চলচ্চিত্র সাময়িকী যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেছিলেন কিছুকাল। সুযোগমতো টুকটাক প্রচ্ছদ আঁকছিলেন এবং এই কাজের সূত্রেই পরিচয় সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে। ১৯৫৫ সালে তাঁর দুই বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন, কিন্তু প্রকাশক অপারগ হওয়ায় সে বই আর আলোর মুখ দেখেনি। প্রচ্ছদে একটি পালাবদল তিনি ঘটালেন ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত জহুরুল হকের সাত-সাঁতার গ্রন্থে। গ্রন্থের বক্তব্যের বা সারসত্যের প্রতিফলন ঘটালেন প্রচ্ছদে, একই সঙ্গে গ্রাফিক ডিজাইনে কুশলতা ও নতুন ভাবনার ছাপ মেলে ধরলেন। এমনই দক্ষতার যুগল মিলনে আঁকলেন ফজলে লোহানী রচিত কথাসরিত্সাগর-এর প্রচ্ছদ, যা প্রকাশিত হয়নি। গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদের সচিত্র সন্ধানী পত্রিকার আত্মপ্রকাশ তাঁর অঙ্কন, টাইপোগ্রাফিবোধ ও রসসিঞ্চিত তির্যক রচনা প্রকাশের মাধ্যমে হয়ে উঠেছিল অনবদ্য।
১৯৫৭ সালে আর্ট কলেজে শিক্ষকতায় যোগ দেন কাইয়ুম চৌধুরী। আর্ট কলেজে নিজের দুই বছরের কনিষ্ঠ তাহেরা খানমকে ১৯৬০ সালে বিয়ে করেন তিনি। ওই বছরই কাইয়ুম চৌধুরী আর্ট কলেজ ছেড়ে যোগ দেন কামরুল হাসানের নেতৃত্বে নবগঠিত ডিজাইন সেন্টারে। ১৯৬১ সালে ডিজাইন সেন্টার ছেড়ে অবজাভার হাউসে চীফ আর্টিস্ট হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯৮৬ সালে একুশে পদক পান দেশবরেণ্য এই চিত্রশিল্পী। এছাড়া এ বছর স্বাধীনতা পদক ২০১৪ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি।