মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৩, ৬ কার্তিক ১৪২০
কক্সবাজারের সাগরকন্যা ইনানী ভূমিগ্রাসীদের নগ্ন থাবার শিকার
এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার ॥ একদিকে বিশাল সাগর অন্যদিকে সুউচ্চ পাহাড়, টিলা, পর্বতসম গিরিপথ। বিশাল বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে ছিটকে পড়া জলরাশি ও প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্টি পাথরের লুকোচুরি খেলায় নান্দনিক সৈকতে পরিণত হয়েছে কক্সবাজারের সাগরকন্যা ইনানী। এখানে নব্বইয়ের দশকেও বনে বাঘ, ভাল্লুক, হাতি, বানর, হনুমান, বনমোরগ, বিভিন্ন জাতের পাখি ও সাপসহ বিভিন্ন প্রকার জৈববৈচিত্র্য বন্য পশু প্রাণী অবাধে বিচরণ করেছে। কক্সবাজার জেলার এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন ইনানীতে জাতীয় উদ্যান প্রকল্পের কাজ সমাপ্তির পর সেখানে গড়ে তোলা যেতে পারে বন্য প্রাণীর অভয়াশ্রম। বৃহত্তম অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত জেলার উখিয়ার ইনানী ছিল এক সময়ের হাতি, হরিন, চশমা বানরসহ অসংখ্য বন্য পশু প্রাণীর আবাসস্থল। সংঘবদ্ধ কাঠচোর সন্ত্রাসী ভূমিগ্রাসীদের নগ্ন থাবায় প্রায় সাড়ে ১০ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল বর্তমানে প্রায় সাবাড় হতে চলছে। তার পরও সমুদ্র সৈকতের কাছাকাছি নয়নাভিরাম ইনানীর ওসব পাহাড়ের মায়া (আবাসস্থল) ত্যাগ করেনি অসংখ্য বন্য পশু প্রাণী। সচেতন মহলের মতে, প্রকৃতির অপরূপ ইনানীর উক্ত বনাঞ্চলকে বন্য প্রাণীর অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে তোলা হলে গাছ-গাছালিতে ভরপুর ইনানী বনাঞ্চলে আবারও জীববৈচিত্র্য ও পশু প্রাণীর মিলনমেলায় পরিণত হবে। এদিকে পূর্বের স্থানে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বেসরকারী একটি এনজিও সংস্থার তত্ত্বাবধানে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোনের আওতায় প্রায় ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে ইকো ট্যুরিজম প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হতে চলছে।
নির্ধারিত উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছলে দেশের বৃহত্তম সম্ভাবনাময়ী পর্যটন নগরীতে পরিণত হতে পারে সাগরকন্যা ইনানী বিচ। উখিয়ার উপকূলীয় জনপদ ২৮ কিলোমিটার সৈকত সংলগ্ন সাড়ে ১০ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল নিয়ে ইনানীর অবস্থান। একদিকে সুউচ্চ পাহাড়, টিলা, পর্বতসম গিরিপথ। অন্যদিকে বিশাল বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে ছিটকে পড়া জলরাশি ও প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্টি পাথরের লুকোচুরি খেলায় নান্দনিক সৈকতে পরিণত হয়েছে এ সাগরকন্যা ইনানী। এখানে যুগ যুগ ধরে বসবাসরত লোকজন জানান, নব্বইয়ের দশকেও ইনানীর বনে বাঘ, ভাল্লুক, হাতি, বানর, হনুমান, বনমোরগ, বিভিন্ন জাতের পাখি ও সাপসহ বিভিন্ন প্রকার জৈববৈচিত্র্য বন্য পশু প্রাণী অবাধে বিচরণ করেছে। ২০০১ সাল থেকে এলাকার কিছু সংখ্যক ভূমিগ্রাসী ইনানী বনাঞ্চলের বনজসম্পদ লুটপাট শুরু করে। পাশাপাশি পরিত্যক্ত বনভূমির পাহাড় কেটে জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে বসবাস করায় বন্য পশু প্রাণীর আবাসস্থল অরক্ষিত হয়ে পড়ে।
২০০৪ সালে পর্যটন মন্ত্রণালয় ইনানীকে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে ইনানীর জমিজমা হস্তান্তরের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে ইনানীসহ আশপাশের ৬টি মৌজার রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করে দেয়। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ কারিগরি সহায়তা বনসম্পদ উন্নয়নসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইনানীসহ ২৮টি এলাকাকে প্রটেক্টেড ফরেস্ট হিসেবে ঘোষণা করে ওইসব বনাঞ্চলে অনধিকার প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। এরই ধারাবাহিকতায় বেসরকারী এনজিও সংস্থা শেড ২০০৯ সালের জুলাই মাসে প্রায় দুই কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় বরাদ্দ নিয়ে ইনানীর সাড়ে ১০ হাজার হেক্টর বনভূমির উন্নয়নপূর্বক প্রস্তাবিত জাতীয় উদ্যানে রূপান্তর করে ইনানীকে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন হিসেবে গড়ে তোলার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ কমিটির সভায় বক্তারা ইনানী বনাঞ্চলকে রক্ষা করে ও জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণপূর্বক প্রস্তাবিত জাতীয় উদ্যানের পাশাপাশি পর্যটকদের আকর্ষণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বনের অভ্যন্তরে বন্য পশু প্রাণীর অবাধে বিচরণ সরাসরি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বলে সূত্রটি জানায়। এ ব্যাপারে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকি থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে হলে এ উপজেলাকে বন সমৃদ্ধ উপজেলায় রূপান্তর করতে হবে। এ ব্যাপারে তারা সব রকমের সহযোগিতা প্রদান করবেন বলে আশ্বাস দেন। ইনানী জাতীয় উদ্যান প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানান, বৃহত্তর সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন ইনানীর বনাঞ্চলকে উন্নয়ন করে বন্য পশু প্রাণীর সংরক্ষণ করা হলে এখানে দেশী-বিদেশী পর্যটকের ঢল নামবে। সরকারের প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি স্থানীয় বেকার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়ে ইনানী একটি বাণিজ্যিক নগরীতে পরিণত হবে।