মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ২৯ মার্চ ২০১১, ১৫ চৈত্র ১৪১৭
অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে অবৈধ ভিওআইপি, নেমে এসেছে বৈধ কল
ফিরোজ মান্না ॥ অবৈধ ভিওআইপি আবার অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। পিএসটিএন বন্ধ করেও ভিওআইপি রোধ করা যাচ্ছে না। এখন বিভিন্ন টেলিফোন অপারেটর থেকে হরদম আনত্মর্জাতিক কল আদান-প্রদান হচ্ছে। বিশেষ করে ভিওআইপিতে এখন টেলিটক শীর্ষে অবস্থান করছে। এক বছর আগেই প্রতিদিন আনত্মর্জাতিক বৈধ কল আদান-প্রদান হতো প্রায় ৬ কোটি মিনিট। বর্তমানে তা দুই কোটি মিনিটে নেমে এসেছে। বাকি চার কোটি মিনিটই অবৈধ পথে আদান-প্রদান হচ্ছে। এতে বিপুল অঙ্কের টাকা সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। লাভবান হচ্ছে এর সঙ্গে জড়িত কিছু রাঘববোয়াল। এই রাঘববোয়ালদের সহযোগিতায় রয়েছেন সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি।
অবৈধ ভিওআইপির জন্য দায়ী হচ্ছে বিটিসিএল। বিটিসিএল পূর্ণাঙ্গ ইন্টারকানেকশন এঙ্চেঞ্জ (আইসিএঙ্) না বসানোর কারণেই আনত্মর্জাতিক কলগুলো 'ডাইভার্ট' করে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরকে দেয়া হচ্ছে। এতে বিটিসিএলের কতিপয় কর্মকর্তা কর্মচারীও কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন। পূর্ণাঙ্গ আকারে আইসিএঙ্ বসানোর জন্য বিটিআরসি ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যনত্ম ১৯ চিঠি দিয়েছে বিটিসিএলকে। চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে। এ ব্যাপারে বিটিসিএল এবং মন্ত্রণালয় রহস্যজনকভাবে নীরব রয়েছে। তারাও পূর্ণাঙ্গ আইসিএঙ্ বসানোর ব্যাপারে কোন গরজ দেখাচ্ছে না। বিটিসিএলের এক কর্মকর্তা বলেন, বিটিআরসি হাজার চেষ্টা করলেও বিটিসিএলে আইসিএঙ্ বসবে না। কারণ এখান থেকে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা সরকারের উপর মহল এবং কিছু কর্মকর্তাদের পকেটে যাচ্ছে। কোন কোন কর্মচারীর পকেটেও যাচ্ছে কিছু। তাই আইসিএঙ্ বসার প্রশ্নই আসে না।
আইসিএঙ্ স্থাপন কেন হচ্ছে না এ ব্যাপারে বিটিসিএলএর এমডি ড. আবু সাঈদ খানের সঙ্গে কথা হলে তিনি জনকণ্ঠকে জানান, ফান্ডের অভাবে এতদিন আইসিএঙ্ বসানো সম্ভব হয়নি। তবে নিজস্ব ফান্ড থেকে দুই তিন মাসের মধ্যে সীমিত আকারে একটি আইসিএঙ্ বসানো হবে। এই আইসিএঙ্ দিয়ে এক দেড় বছর চলবে। পরে ফান্ড পাওয়া গেলে পূর্ণাঙ্গ আকারে আইসিএঙ্ স্থাপন করা হবে। অবৈধ ভিওআইপি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিটিসিএল এর মাধ্যমে ভিওআইপি (ভয়েজ ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) হচ্ছে এমন অভিযোগ ঠিক না। টেলিটকের কথা বলা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি টেলিটকের। তবে টেলিটক তো বিটিসিএল হয়েই যায়। হয়ত তাদের কাছে কিছু সিম থাকতে পারে যেগুলো দিয়ে ভিওআইপি হচ্ছে। হয়ত টেলিটকের উচ্চপর্যায়ের কোন কর্মকর্তা বিষয়টি জানেন না। একজন গ্রাহক জানান, গত ১৭ মার্চ আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আমার এক আত্মীয় কল করেন। কলটি ০১৫৫৭৫৬৬৯৫১ নম্বরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ৫২ মিনিটে আসে। একই জায়গা ২৬ মার্চ বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা ৫৩ মিনিটে কল আসে ০১৫৫৭৫৭৫০২৬ নম্বরের মাধ্যমে। এভাবে অন্যান্য অপারেটরের নম্বর থেকেও বিদেশ থেকে হরদম কল আদান প্রাদান হচ্ছে।
এদিকে টেলিটকের এমডির সঙ্গে কথা বলার জন্য বার বার যোগাযোগ করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। বিটিআরসির হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে শতকরা ৪০ ভাগ আনত্মর্জাতিক কল আদান-প্রদান হচ্ছে টেলিটকের মাধ্যমে। বাকি ৬০ ভাগ কল আদান-প্রদান হচ্ছে অন্য ৫টি মোবাইল অপারেটরের মাধ্যমে।
বৈধ পথে আনত্মর্জাতিক টেলিফোন কল রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। শত চেষ্টা করেও অবৈধ ভিওআইপি বন্ধ করতে পারেনি কর্তৃপৰ। অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায়ীরা নানা কৌশলে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অবৈধ ভিওআইপি করার অভিযোগ সরকার নিয়ন্ত্রিত কোম্পানি বিটিসিএলের বিরম্নদ্ধে সবচেয়ে বেশি। এখানকার কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী অবৈধ ভিওআইপি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পিএসটিএন কোম্পানিগুলো অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ৬টি কোম্পানি বন্ধ করে দিয়েছে বিটিআরসি। এরপরও ভিওআইপি ব্যবসা বন্ধ হয়নি। তবে কর্তৃপৰ বলছে অবৈধ ভিওআইপির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বিটিসিএল আইসিএঙ্ না বসানোর কারণে এই লাগাম আবার ঝুলে গেছে।
সূত্র জানিয়েছে, দেশের দুটি ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (বিটিসিএল এবং ম্যাংগো) অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন (ডিপিআই) ব্যবহার করে বিভিন্ন আইএসপি অপারেটরের ডাটা ট্রাফিক সর্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ডাটা ট্রাফিকের সঙ্গে ভয়েস আদান-প্রদানের কাজে সন্দেহজনক ইন্টারনেট প্রটোকল ঠিকানা (আইপি ঠিকানা) তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব। এছাড়াও ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) এর মাধ্যমে বিটিআরসির সার্ভারে ট্রাফিক পর্যবেক্ষণের জন্য অনলাইন এঙ্েেসর ব্যবস্থা রয়েছে। যার মাধ্যমে সকল আইএসপির অনলাইন ডাটা এবং অফলাইন ডাটা সংগ্রহ করা যায়। এই পদ্ধতিতে সব আইএসপি প্রতিষ্ঠানের ব্যবহৃত আইপি প্যাকেটসমূহ বিসত্মারিত বিশেস্নষণ করা সম্ভব। বিশেস্নষণের পর সন্দেহজনক আইপিসমূহ সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করা যায়। কিন্তু এসব কিছুই এখন আর ব্যবহার হচ্ছে না। মোবাইল অপারেটররা তো ভিওআইপি করছে বিটিসিএলএর সহযোগিতায়।
ভিওআইপি করার দায়ে পিএসটিএন (পাবলিক সুইচ টেলিফোন নেটওয়ার্ক) বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ভিস্যাটের মাধ্যমে অবৈধ ভিওআইপি হচ্ছে এমন অভিযোগে ভিস্যাটেরও লাইসেন্স বাতিল করার উদ্যোগ নিয়েছিল। পরে অবশ্য ভিস্যাটের লাইসেন্স বাতিল করা হয়নি। টেলিকম বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বিটিআরসি মাঝে মধ্যে দু'একটা অভিযান চালালেই ভিওআইপি বন্ধ হয়ে যাবে এটা ভাবার কোন কারণ নেই। ভিওআইপি একটি প্রভাবশালী মহলের ব্যবসা। এই ব্যবসা বন্ধ করা বিটিআরসির জন্য কঠিন। ভিওআইপি ব্যবসার সঙ্গে অনেক সরকারদলীয় লোকজন জড়িত রয়েছে। রাজস্ব বাড়াতে হলে ভিওআইপির লাইসেন্স বাড়াতে হবে। তা না হলে এই ব্যবসা প্রভাবশালীরা চালিয়েই যাবে। ভিওআইপি একটি প্রযুক্তি এবং সেটিকে মোকাবেলা করতে হবে প্রযুক্তি দিয়ে। লাইসেন্স বৃদ্ধি করে এর সমাধান হতে পারে। তবে অবৈধ প্রযুক্তির মোকাবেলায় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। যারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন তাঁদের দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকতে হবে। ইন্টারন্যাশনাল লং ডিসট্যান্স সার্ভিসেস (আইএলডিটিএস) নীতিমালা সংশোধন করে ভিওআইপি উন্মুক্ত করা হয়েছে।
জানা গেছে, অবৈধ কল যাচাইয়ের জন্য ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন (ডিপিআই) নামে একটি যন্ত্র আছে। যেসব প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের ব্যান্ডউইথ দেয় সেখানে এটি স্থাপন করা হলেই অবৈধ কল বন্ধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু সেটি কার্যকর করতে কর্তৃপৰ তেমন আগ্রহী নয়। অবৈধ কল সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়ার জন্য ডিপিআই-ই হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর প্রযুক্তি। কিন্তু দুটি ব্যান্ডউইথ দেয়া প্রতিষ্ঠানের একটি বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিঃ (বিটিসিএল) এ বিষয়ে তেমন উদ্যোগী নয়। তবে অপর কোম্পানি ম্যাঙ্গো টেলিকমে যন্ত্রটি বসিয়েছে। বিটিসিএলের মাধ্যমে বেশি ইনকামিং কল এলেও সেখানে কোন ডিপিআই বসানো হয়নি।