মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
চৌরাসিয়ার বাঁশিতেও শোকের আবহেও
সংস্কৃতি সংবাদ
মনোয়ার হোসেন ॥ সুরের আসর বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উৎসবের চতুর্থ রজনী ছিল রবিবার। তবে আনন্দময় সুরের আবাহনের পাশাপাশি এ নিশীতে আকস্মিকভাবে নেমে আসে শোকের আবহ। সঙ্গীতের এ মহাযজ্ঞের উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা শেষ করে হঠাৎ কী যেন বলতে আবারও এসেছিলেন মঞ্চে। সে কথা বলার আগেই, সুরের আসরে মাথা ঘুরে পড়ে যান এদেশের চারুকলা ভুবনের পথিকৃৎ ও বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। এর পর শিল্পীকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেয়ার পর জানা গেল, চিরতরে প্রস্থান করেছেন তিনি। তাঁর জীবনাবসান হলেও তাল-সুর ও লয়ের উচ্চাঙ্গের সঙ্গীতাসরটি চলেছে ঠিকই আপন গতিতে। কারণ, তিনি ছিলেন সঙ্গীতানুরাগী। তাই তাঁর প্রয়াণে থামেনি সঙ্গীতযজ্ঞ। বরং সুরের ভেতর দিয়ে জানানো হয়েছে এ শিল্পীকে শ্রদ্ধা। তাঁকে উৎসর্গ করে হয়েছে নানা পরিবেশনা। উৎসব প্রাঙ্গণে উপস্থিত শ্রোতা-শিল্পীসহ সবাই দাঁড়িয়ে পালন করেন ১ মিনিট নিরবতা।
চলছিল পরিবেশনা। রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। মঞ্চে আসেন শোকবিহ্বল এমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী। বেদনার্তকণ্ঠে আনিসুজ্জামান বলেন, গভীর বেদনাচিত্তে এখানে দাঁড়িয়েছি। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী আর আমাদের মাঝে নেই। নিজের সঙ্গে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘ ৬০ বছরের সম্পর্ক। প্রচ্ছদ অঙ্কন দিয়ে শুরু করলেও পরবর্তীতে তাঁর জলরঙের কাজ এ দেশের চিত্রকলার শ্রেষ্ঠ সম্পদ। মানুষ আর প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর ছবি স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি কাইয়ুম সাহিত্য ও সঙ্গীতের গভীর অনুরাগী ছিলেন। তিনি সঙ্গীতকে ভালবাসতেন, চাইতেন তাঁর কারণে যেন সঙ্গীতের বিঘ্ন না হয়। তাঁর সেই ইচ্ছাকে কল্পনা করে আমরা এ উৎসব চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
রামেন্দু মজুমদার বলেন, তাঁর এ চলে যাওয়া আলোকিত চলে যাওয়া। স্মৃতি ও কর্মের মধ্যে তিনি বেঁচে থাকবেন।
কাইয়ুম চৌধুরীর শেষ কথা ॥ উৎসবে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কাইয়ুম চৌধুরী আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন দেশের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চা উচ্চ শিখরে উঠবে। এ সময় নিজের মৃত্যুশঙ্কা উচ্চারণে তিনি বলেন, আমি বেঁচে থাকতে হয়ত সেই অবস্থা দেখতে পারব না। তবে ভবিষ্যতে দেশের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের চর্চা উচ্চ শিখরে যাবে বলে আশা করি। আগেও এদেশে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত এখানে ছিল, তবে তখন পৃষ্ঠপোষকতা ছিল না। যে কারণেই ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, বাহাদুর হোসেন খাঁ, ফুলঝুরি খাঁ’রা ভারতে চলে গিয়েছিলেন। এ সময় তিনি উৎসবে শ্রোতাদের উপস্থিতি দেখে নিজের মুগ্ধতার কথা প্রকাশ করেন।
এ অঞ্চলের শিল্পকলার ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, দেশভাগের আগে এ ভূখ-ে চারুকলার চর্চায় কোন প্রতিষ্ঠান ছিল না। তখন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে চারুকলার মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেননি শিল্প আন্দোলন সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি বলতেন, শুধু ছবি আঁকলে শিল্পী হওয়া যায় না, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন শিল্পী সংস্কৃতির সঙ্গে না জড়ান।
উৎসবের চতুর্থ রজনীর পরিবেশনা ॥ এ রাতে বাংলাদেশের তরুণ শিল্পী অমিত চৌধুরীর ভরতনাট্যম দিয়ে শুরু হয় পরিবেশনা পর্ব। আর সব শেষে গভীর রাত পেরিয়ে ভোরের সূচনালগ্নে ছিল প-িত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার বাঁশির সুর মূর্ছনা। বাঁশের তৈরি সামান্য বাঁশিতে এই প্রবাদপ্রতীম বাঁশরিয়া তোলেন মধুর থেকে মধুরতম শব্দধ্বনি। সুরেলা শব্দের অনুরণনে ঝড় তোলেন শ্রোতার অন্তরাত্মায়। রাতজাগা নির্ঘুম সঙ্গীতানুরাগীর অন্তরে ছড়িয়ে দেন অপার প্রশান্তির ছোঁয়া। আর এমন মোহনীয় পরিবেশনায় মন্ত্রমুগ্ধ সঙ্গীতপিপাসুরা কয়েক দফা করতালির সঙ্গে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান এই কিংবদন্তি বংশীবাদককে। শুরু আর সমাপ্তির মাঝে ছিল তাল ও লয়ের মেলবন্ধন ঘটানো দেশের শিল্পী স্বরূপ হোসেনের তবলাবাদন। সরোদে সুর ঝড়ান প্রবাদপ্রতিম সরোদবাদক আমজাদ আলী খানের শিষ্য আমান আলী খান ও আয়ান আলী খান ভ্রাতৃদ্বয়। কণ্ঠসঙ্গীত পরিবেশন করেন গোয়ালিয়র ঘরানার তরুণ প্রতিভাবান শিল্পী সামিহান কাশালকর। সরোদ আর সেতারের যুগলবন্দী পরিবেশনা দিয়ে শ্রোতা মাতান পণ্ডিত তেজেন্দ্র নারায়ণ মজুমদার ও গণেশ রাজ গোপালন। যন্ত্রসঙ্গীতের পর কণ্ঠসঙ্গীত পরিবেশন করবেন কৌশিকী চক্রবর্তী।
ভরতনাট্যমে অমিত চৌধুরী নাটেশা কৌথুওয়াম পরিবেশন করেন রাগ নাট্টাই এবং আধিতালে। তারপর তিনি নটনম আডিনার পরিবেশন করেন বসন্ত রাগে। তাঁর সর্বশেষ তিল্লানা পরিবেশন করেন রাগ পূরবীতে রূপক তালে। তাঁর সঙ্গে বেহালায় সঙ্গত করেন সত্য বিশাল অভিরেড্ডি, মৃদঙ্গম সঙ্গত করেন সুরিয়া নারায়নান গোপাল কৃষ্ণাণ, নাট্যভঙ্গমে ছিলেন রাজদীপ ব্যানার্জি এবং কণ্ঠসঙ্গীতে ছিলেন সুকুমার গোবিন্দন কুট্টি।
এর পর চতুর্থ দিনের উৎসব অধিবেশন উদ্বোধন করেন এমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে কাইয়ুম চৌধুরী ও স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের।
সরোদে মায়া ছড়িয়ে আমান আলী খান ও আয়ান আলী খান পরিবেশন করেন রাগ ঝুনঝট ও রাগেশ্বরী। এ দুই শিল্পীর সঙ্গে তবলায় সঙ্গত করেন সত্যজিৎ তালওয়ালকার। কাইয়ুম চৌধুরীকে উৎসর্গ করে সামিহান কাশালকর পরিবেশন করেন রাগ মালকোষ। তাঁর সঙ্গে তবলায় সঙ্গত করেন সঞ্জয় অধিকারী ও হারমোনিয়ামে ছিলেন গৌরব চট্টোপাধ্যায়।
আজকের উৎসবসূচী ॥ আজ সোমবার পাঁচ দিনের উৎসবের সমাপনী দিন। পঞ্চরজনীর সঙ্গীতযজ্ঞ শুরু হবে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়। রাত গড়িয়ে চলবে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত। এ রাতের পরিবেশনা পর্ব শুরু হবে দেশের খ্যাতিমান ও প্রতিশ্রুশীল ৩০ শিল্পীর সম্মেলক কণ্ঠে বাংলা গানের মাধ্যমে। এক সুরে গাইবেন ফরিদা পারভিন, সুবীর নন্দী, শাহীন সামাদ, মিতা হক, খায়রুল আনাম শাকিল, শামা রহমান, ইয়াকুব আলী খান, কিরণ চন্দ্র রায়, অদিতি মহসিন, অনিন্দিতা চৌধুরী, আজিজুর রহমান, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, বুলবুল ইসলাম, চন্দনা মজুমদার, ইলোরা আহমেদ শুক্লা, ফাহিম হোসেন চৌধুরী, ইফ্ফাত আরা দেওয়ান, ইয়াসমিন মুসতারি, জান্নাত-ই-ফেরদৌসি, ঝুমা খন্দকার, লাইসা আহমেদ লিসা, মাসুদা নার্গিস আনাম, মহিউজ্জামান চৌধুরী, নাসিমা শাহিন, প্রিয়াঙ্কা গোপ, শহীদ কবির পলাশ, শারমিন সাথী ইসলাম, সেমন্তি মঞ্জরী, সুমা রানী রায় ও তানিয়া মান্নান। এর পর কত্থক নৃত্যের অনবদ্য উপস্থাপনায় মঞ্চ মাতাবেন বিশাল কৃষ্ণ। কণ্ঠসঙ্গীতে খেয়াল পরিবেশনের পাশাপাশি ঠুমরি ও ভজন পরিবেশন করবেন পদ্মভূষণ ও পদ্ম বিভূষণপ্রাপ্ত প্রথিতযশা শিল্পী কিশোরী আমনকার। বাঁশিতে সুর তুলবেন বাংলাদেশের বংশীবাদক এম মনিরুজ্জামান। কণ্ঠসঙ্গীত পরিবেশন করবেন জয়পুর আত্রাউলি ঘরানার শিল্পী অশ্বিনী ভিডে দেশপা-ে। এর পর ধ্রুপদী সঙ্গীত নিয়ে শ্রোতার অন্তর সিক্ত করতে মঞ্চে আসবেন প-িত উদয় ভাওয়ালকার। শেষ রজনীর অন্যতম আকর্ষণ ওস্তাদ আমজাদ আলী খানের পরিবেশনা দিয়ে ঘটবে উৎসবের সমাপ্তি। সরোদে মোহময় সুর ছড়াবেন সেনিয়া বাঙ্গাস ঘরানার এই বিশ্বখ্যাত শিল্পী।