মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
সফটওয়্যার রফতানি করে শত কোটি ডলার আয়ের টার্গেট
ব্যক্তি উদ্যোগে সহযোগিতা দেবে সরকার
ফিরোজ মান্না ॥ সফটওয়্যার রফতানি করে ২০১৮ সালের মধ্যে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করার টার্গেট নিয়েছে বাংলাদেশ। ব্যক্তি উদ্যোগে এই শিল্প দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে এই খাত থেকে বছরে এক শ’ কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে। ইতোমধ্যে সফটওয়্যার শিল্পে সরকারী সহযোগিতা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার এ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) ইতোমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় সফটওয়্যার রফতানির কাজ শুরু করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মনোজ কুমার রায় জনকণ্ঠকে বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শুধু সফটওয়্যার রফতানির কাজেই সহযোগিতা দেবে না। ব্যবসা-বাণিজ্যের সব ক্ষেত্রেই মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা রয়েছে। তবে সফটওয়্যার শিল্পের দিকটি বিশেষ বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। কারণ এই শিল্পের বর্তমান অবস্থা অনেক ভাল। এতদিন ব্যক্তি উদ্যোগে সফটওয়্যার রফতানি করা হচ্ছিল। মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা পেলে উদ্যোক্তারা সহজে রফতানি কাজটি করতে পারবেন। মন্ত্রণালয় থেকে সহযোগিতা এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বেসিসের সভাপতি শামীম আহসান জানিয়েছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রণালয় আশ্বাস দিয়েছে সফটওয়্যার রফতানিতে তারা সহযোগিতা দেবে। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সিলরকে আইসিটি ডেস্কের দায়িত্ব দিলে তিনি একদিকে যেমন বিদেশে বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং করতে পারবেন, পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশের সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি বাজার তৈরি ও সম্প্রসারণ করতে পারবেন। এছাড়া বেসিসের ‘বাংলাদেশ নেক্সট’ ব্র্যান্ডিংয়ের আওতায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন সেক্টর বিদেশে তাদের ব্র্যান্ডিং করতে পারবে। সফটওয়্যার তথ্যপ্রযুক্তি খাতের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এই শিল্পের বিকাশ ঘটেছে খুব দ্রুত। দেশে প্রায় ১১শ’ প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যার তৈরি করে। নিজেদের উদ্যোগেই তারা দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে বাজারজাত করছে। সফটওয়্যার খাতটি আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতা অর্জন করেছে। তাছাড়া এ খাতে নতুন উদ্যোক্তা যেমন যোগ হয়েছে, তেমনি বিদেশীদের আস্থাও বেড়েছে আমাদের ওপর। সে কারণে রফতানির পরিমাণ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে এ খাত থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৫ কোটি ৪৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার। তবে আমরা এর চেয়েও অনেক বেশি আয় এনে দিতে পারব বলে আশা করছি। গত অর্থবছর শেষে আয় দাঁড়িয়েছিল ১০ কোটি ১৬ লাখ ডলার। সেখানে লক্ষ্য ছিল সাড়ে আট কোটি ডলার। ২০১৮ সালের মধ্যে প্রতি বছর এক বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য বিভন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বেসিস। যেভাবে সব কিছু এগোচ্ছে তাতে তার আগেই আমরা এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারব বলে আশা করছি।
বেসিস জানিয়েছে, প্রতিযোগিতার দৌড়ে বাংলাদেশের তৈরি সফটওয়্যার বিদেশের বাজারের বড় ধরনের জায়গা করে নিয়েছে। এখন এই শিল্প থেকে প্রতি বছর এক শ’ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি আয় হচ্ছে। ২০১৮ সাল নাগাদ সফটওয়্যার শিল্প থেকে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় আয়ের টার্গেট নিয়ে এই শিল্পের উদ্যোক্তারা। তারা এই টার্গেট পূরণে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন।
শিল্পের উদ্যোক্তারা বলেন, উদ্যোক্তাদের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব থাকলেও এই শিল্প বিকাশে অনেকেই নিজ উদ্যোগে সফটওয়্যার তৈরি করে যাচ্ছে। এই শিল্প বিকাশের পাশাপাশি বেকারত্বের হারও কমছে। বর্তমানে এই শিল্পের সঙ্গে ২৫ থেকে ৩০ হাজার তথ্যপ্রযুক্তিবিদ কাজ করে যাচ্ছে। আগামী বছরের শেষ নাগাদ সফটওয়্যার শিল্পে এক লাখের বেশি তথ্যপ্রযুক্তিবিদ কাজ করবেন বলে উদ্যোক্তারা আশা করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সম্প্রতি বলেন, সফটওয়্যার শিল্প বিকাশে আপনারা কাজ করছেন। আমাদের দেশে উদ্যোক্তা নিজেরাই এই শিল্প অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন। সরকারী সহযোগিতা পেলে এই শিল্প বিকাশে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সফটওয়্যার কিংবা কোন উদ্ভাবনের জন্য সরকারী সহায়তা দেয়া হয় না। সেখানে ব্যক্তিগত খাত থেকে তাদের সহায়তা দেয়া হয়। আমাদের দেশে তথ্যপ্রযুক্তির জন্য ব্যক্তিগত খাত থেকে বিনিয়োগ গড়ে ওঠেনি। ব্যবসায়ীদের উচিত তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে আরও বেশি বিনিয়োগ করা।
এদিকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, গত বছর ফ্রিল্যান্সারদের মাধ্যমে ২ কোটি ডলার দেশে এসেছে। এবার সেটি ৪ কোটি ডলার পেরিয়ে যাবে। এই হিসাব বিবেচনা করা হলে সব মিলে সফটওয়্যার খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করা সম্ভব। চলতি অর্থবছরের শুরুতেই সফটওয়্যার রফতানি খাতে আয় বেড়েছে। প্রথম দুই মাসের আয়ের পরিমাণ গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের আয়কে ছাড়িয়ে গেছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের প্রতিবেদন অনুসারে, জুলাই-আগস্ট সময়ে মোট রফতানি হয়েছে ২ কোটি ৭ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার আয় হয়েছে এই শিল্প থেকে। গত অর্থবছরে প্রথম তিন মাস শেষে আয় হয়েছিল ১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলার।
তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার বলেন, আমাদের দেশের নীতিগত ও কৌশলগত কারণে সফটওয়্যার শিল্পের যে পরিমাণ উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। অভ্যন্তরীণ বাজারে সফটওয়্যার চাহিদা বাড়লেও সরকারের কোন পৃষ্ঠপোষকতা থাকছে না। কারণ যখনই সরকার সফটওয়্যার কিনছে, তখনই দেখা যাচ্ছে বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে সফটওয়্যার কিনছে। দেশীয় কোন কোম্পানি সেখানে যেতে পারছে না। এই শিল্পটি হচ্ছে মেধাভিত্তিক। মেধা সংরক্ষণ না করতে পারলে শিল্পের বিকাশ ঘটার সম্ভাবনা কমে যায়। আমি মনে করি সাধারণ মানুষকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। এটা করতে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে না। স্কুল, কলেজ ও পলিটেকনিকগুলো থেকেই মেধা তৈরি করা সম্ভব।
সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সফটওয়্যার সার্ভিসসমূহের আনুমানিক বাজার এক হাজার থেকে ১২শ’ কোটি টাকা। এই শিল্পে নিয়োজিত রয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার তথ্যপ্রযুক্তিবিদ। কিন্তু বাংলাদেশে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে সফটওয়্যার শিল্পকে সরকারের পর্যায় হতে স্বীকৃতি প্রদান করা হলেও শিল্পের বিকাশে সঠিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বেসিসের সূত্র মতে, ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ হতে সফটওয়্যার রফতানির পরিমাণ ছিল ২৭ মিলিয়ন ডলার। গত বছর অর্থাৎ ২০০৬-২০০৭ অর্থবছরে সফটওয়্যার রফতানির পরিমাণ ছিল ২৬ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশের সফটওয়্যার রফতানির পরিমাণ বৃদ্ধি না পেয়ে কিছুটা কমেছে। তবে বর্তমানে সফটওয়্যার শিল্পে রফতানি আয় বহুগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সফটওয়্যার শিল্পে প্রতিযোগী হয়ে উঠছে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপিন্স এবং নেপালের তৈরি সফটওয়্যার বিদেশে রফতানি হচ্ছে। সরকারী সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণে ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম এবং নেপাল সফটওয়্যার শিল্পে ভাল করছে। এবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই শিল্পে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিযেছে। এখন সফটওয়্যার শিল্প এগিয়ে নিতে কোন সমস্যা হবে না।