মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
রূপচর্চা আলাপন আর ঐতিহ্যের স্মারক...
বউঘাটের মধুময়তা
সমুদ্র হক ॥ বউঘাটের সেই মিষ্টি কথা ও মধুময়তার দিনগুলো হারিয়েই গিয়েছে। মধ্যবয়সী ও প্রবীণরা স্মৃতিতে ধরে রেখেছেন। বউঘাটের কথা উঠলে নস্টালজিক হয়ে পড়েন। জীবনের একটি অংশের বড় অধ্যায় হয়ে আছে ওই বউঘাট। বিশেষ করে সেদিনের নারীদের স্মৃতিতে তা অমøান। একটা সময় গ্রামে ও শহরে শানবাঁধা পুকুরঘাট ছিল দৃষ্টিনন্দন। বিশেষ করে গ্রামে বড় গৃহস্থ বাড়ির শান বাঁধানো পুকুরঘাটের পরিচিতি ছিল বউঘাট হিসেবে। তারও অনেক আগে প্রাচীন সভ্যতার বড় নিদর্শন ছিল বউঘাট। রোমান গ্রীস ফ্রান্স ব্রিটিশ কালে এবং এর মধ্যবর্তী মুঘল শাসনামলে বউঘাটের অস্তিত্ব ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে বউঘাট প্রথা চালু করেন বল্লাল সেন। তখন ১ হাজার ১শ’ ৫৮ খ্রীস্টাব্দ। সেই থেকে শুরু। তবে কালের আবর্তে এই বউঘাট শুধু ইতিহাস হয়ে আছে। পুকুরে নারীর কোলাহল, সৌন্দর্য ও রূপচর্চা এবং স্নান বিলাসের কতই না আয়োজন ছিল। কদর তো ছিলই। দিনে অন্তত একবার বউঘাটে না গেলে গাঁয়ের বধূর মন ভরত না, প্রাণ জুড়াত না। নববধূ হলে তো কথাই নেই। যত রূপচর্চার আলাপন সবই ওই বউঘাটে। সেদিনের বউঘাটকে ঘিরে মানব জীবনের চিরন্তন ধারা রোমান্টিসিজমের শাখা প্রশাখা কম ছিল না। বৈষ্ণব সাহিত্যে প্রেমের রস ৬৪টি। যার প্রথম রস পূর্বরাগ, দ্বিতীয় রস অনুরাগ। তবে মতান্তরে পূর্বরাগ শুরু হয়ে অনেক রস অতিক্রম করে সর্বশেষ রস অনুরাগে পরিণত হয়ে প্রণয় হয় সার্থক। বৈষ্ণবে যাই হোক তিব্বতের বড় তীর্থস্থান মানস সরোবরের পরের অংশকে প্রণয়ের রথ হিসেবে বর্ণনা করে মানস শব্দটিকে মন হিসেবে আখ্যায়িত করে বলা হয় মন রথ। এই মন রথের সরোবারও বউঘাট। একজন প্রবীণ বললেন বউঘাট ছিল চুম্বুকের মতো। কত প্রেমিক অপলক নয়নে বউঘাটের দিকে তাকিয়ে হৃদয়ের মানুষের প্রতীক্ষায় থাকত। প্রণয়ের প্রহর গোনা শুরু হতো বউঘাটে, কারও অবসানও হতো বউঘাটেই। প্রেম বিরহের কীর্তিগাঁথা ছিল বউঘাট। বউঘাটের দূর অতীত এ রকম- খ্রিস্টের জন্মের তিন হাজার বছর আগে সিন্ধু নদের অববাহিকায় হরোপ্পা মহেনজোদরোতে গড়ে ওঠে স্নানাগার। যেখানে খনন করে মেলে বিশাল স্নানাগার। ৩৯ ফুট দৈর্ঘ ২৯ ফুট প্রস্থ ৮ ফুট গভীরতার একটি পুকুর সাক্ষ্য দেয় বউঘাটের। বগুড়ার মহাস্থানগড়ের কাছে গোকুল মেড় নামের যে প্রাচীন স্থাপনা বেহুলার বাসরঘর নামে অধিক পরিচিতি বহন করছে তার মধ্যেও স্নানাগার মিলেছে। খ্রিস্টপূর্ব রোমে স্নান প্রথা চালু হয় গ্রীক সভ্যতাকে অনুসরণ করে। তৃতীয় শতকের রোম সম্রাট ৩৩ একর ভূমি কেটে স্নানাগার তৈরি করেন। রোম ও গ্রীক সভ্যতার এমন স্নানবিলাস ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। স্নান বা গোসলকে কেন্দ্র করে রোমান নারীরা মিলত হতো বউঘাটে। প্রণয়ের মানুষও থাকত আশপাশে প্রসাধনীর পসরা বসিয়ে। এরপর ইস্তাম্বুল পেরিয়ে দুই হাজার বছর আগে রোমানরা ইংল্যান্ড বিজয় করে সেখানে গড়ে তোলে স্নানাগার। এই স্নানাগারগুলো নির্মিত হয় শানবাঁধা পুকুরে। রোমান্টিসিজমের অধ্যায় শুরু হওয়ায় যে ইংরেজী নামকরণ হয় তার আভিধানিক অর্থ বউঘাট। যেখানে রোমান্সের কত কাহিনী ইতিহাস হয়ে আছে। যেমন ব্রিটিশ সুন্দরী ভিলবিয়া এক রোমান যুবকের হাত ধরে পালিয়ে গিয়েছিল। ব্যর্থ ব্রিটিশ যুবক যেখানে আত্মাহুতি দিয়েছিল সেখানে আজও ব্যর্থ প্রেমিক প্রেমিকারা অশ্রুপাত করে। ফ্রান্সের সম্রাট দ্বিতীয় হেনরীর প্রিয়তমা ডায়না পইটিয়ার বউঘাটের শীতল জলে স্নান করে সম্রাটকে মুগ্ধ করতেন। ইউরোপীয় সুন্দরী নেলগোয়াইন সৌন্দর্য ধরে রাখতে নিয়মিত বউঘাটে যেতেন। ইংল্যান্ডের সপ্তম এডওয়ার্ডের (যার স্ট্যাচু বগুড়া এডওয়ার্ড পার্কে আছে এবং যার নামে এই পার্ক) প্রেমিকা লিলি বিনি বউঘাটের অভাবে বৃষ্টির পানিতে স্বল্প বসনা হয়ে স্নান শুরু করলে অভিজাত রমনীরা তার পদাঙ্ক অনুসরণ করলে সম্রাটের আদেশে বউঘাট নির্মাণ শুরু হয়। মিসরীয় সভ্যতায় টলেমি যুগের প্রথম ক্লিওপেট্রা বউঘাট চালু করেন। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় উপমহাদেশে বল্লাল সেন যে বউঘাট প্রথা চালু করেন বঙ্গীয় ব-দ্বীপে। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে (বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে) জমিদাররা বউঘাট নির্মাণ শুরু করলে পরবর্তী অধ্যায়ে বড় গৃহস্থরা) সেই ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যায়। শানবাঁধা পুকুরঘাট বা বউঘাট স্থাপনের পর নারীদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইতে থাকে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে কোন ঘরে নববধূ প্রবেশের পর তাকে নেয়া হয় বউঘাটে। গ্রামাঞ্চলে বউঘাটকে ঘিরে আজও গীত গাওয়া হয়। যেমন ‘নতুন বউ আলতা পায়ে বউঘাটে যায়/ঘাট সিঁড়ি বেয়ে বউ ঢেউ খেলা পায়...’। বউঘাটে যেতে না দেয়ায় প্রজারা একবার জমিদারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। বউঘাট নিয়ে অনেক জারি গান রচিত হয়েছে। যেমন ‘কলিকালের বেটিরা কত দেখায় কলা/বউঘাটেতে গেলে পরে ফাইট্যা পড়ে গলা...’। বউঘাটকে নিয়ে যে কত স্মৃতি...। ভরা চাঁদের রাতে বউঘাটে বসে কপোত কপোতি মুখোমুখি বসে কতই না মধুময়তার কথা...। সেদিনের জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষের মধ্যে আজও কখনও দেখা মেলে বাউঘাটের। দেশে দিনে দিনে সেদিনের পুকুরের অস্তিত্ব বিলীন ও নিশ্চিহ্ন হওয়ায় বউঘাট ও বউঘাটের কথাও হারিয়ে যাচ্ছে।