মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৩, ২৪ অগ্রহায়ন ১৪২০
অর্থের বিনিময়ে ওরা যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে কাজ করছে
সেমিনারে কিছু মানবাধিকার সংগঠনের সমালোচনা
স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারে কিছু মানবাধিকার সংগঠন অর্থের বিনিময়ে তাদের পক্ষে কথা বলছেন। ওয়েস্টার্ন অথরিটি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে বলব যারা যুদ্ধাপরাধীর বিচারের সময় সহিংস ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদের সঙ্গে সব ধরনের সহয়োগিতা বন্ধ করে দেয়ার জন্য। সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের নির্বাহী পরিচালক পাউলো কাসাকা এ কথা বলেছেন। শনিবার সিরডাব মিলনায়তনে বাংলাদেশ হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি এ্যান্ড কান্টার টেররিজম আয়োজিত ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন দ্য গ্লোবাল ইমপ্যাক্ট অব ওয়্যার ক্রাইম জাস্টিজ প্রেসেস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে তাঁরা এ কথা বলেছেন। একই অনুষ্ঠানে আইন প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেছেন, ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালে অনেক রায় হয়েছে। সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগে পূর্ণাঙ্গ রায় একটি হয়েছে। যেটি কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছে। আশা করছি যথা সময়ে এটা কার্যকর করা হবে।
পাউলো কাসাকা আরও বলেন, যারা বাংলাদেশের পক্ষে আমরা তাদের পাশে আছি। বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। আমরা তার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ও শ্রদ্ধা জানাই। এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে, এ সময় কেউ সহিংস ঘটনা ঘটিয়ে বিচারকে প্রভাবিত করতে পারবে না। তিনি কিছু মানবাধিকার সংগঠন বিশেষ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সমালোচনা করে বলেন, বেশ কিছু মানবাধিকার সংগঠন অর্থের বিনিময়ে কাজ করে যাচ্ছে। তারা সঠিকভাবে বিষয়গুলো তুলে ধরছেন না। তিনি বলেন জামায়াতে ইসলামী ’৭১ সালে যে কাজগুলো করেছিল সে কাজগুলো এখনও করছে। একাত্তরের মতো আক্রমণ ও সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছে। যা আন্তর্জাতিক অপরাধের আওতায় পড়ে। নির্বাচন এবং সহিংসতা এক নয়। নির্বাচন আর সহিংসতা যারা এক করে দেখায় তারা জাতির প্রতি দায়িত্ব পালন করছে না।
পাওলো কাসাকা বলেন, ’৭১ সালে বাংলাদেশে মানবাধিকারের যে লঙ্ঘন ঘটেছিল, স্বাধীনতার ৪২ বছর পর তার বিচার হচ্ছে বলে আমি বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। এই বিচার কার্যের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মান নিয়ে আমার দেশ নরওয়েসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ সন্তুষ্ট। তিনি বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে যে বাংলাদেশ বের হয়ে আসতে পেরেছে, এটা গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ। তা না হলে এ অপরাধীরা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠত।
তিনি বলেন, বাসে-ট্রেনে হামলা, আগুন, মানুষ হত্যাসহ যে সহিংসতা চলছে তার সঙ্গে এই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যের কোন সম্পৃক্ততা আছে কিনা- আমার জানা নেই। তবে গণতন্ত্র রক্ষা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতায় আসতে হবে।
প্রথম অধিবেশনে সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমানের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন, আইন প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের নির্বাহী পরিচালক পাউলো কাসাকা, প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন মুক্তিযোদ্ধা জাদু ঘরের স্ট্রাস্টি মফিদুল ইসলাম। দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ড. সারোয়ার আলী। আলোচনায় অংশ নেন প্রসিকিউটর রানাদাশ গুপ্ত, প্রসিকিউটর একেএম সাইফুল ইসলাম, প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সিমন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক উমরে ওয়ারা মিশু।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় আইন প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, ইতোমধ্যে অনেক রায় হয়েছে। সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগে পূর্ণাঙ্গ রায় একটি হয়েছে। যেটি কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছে। আশা করছি যথা সময়ে এটা কার্যকর করা হবে। বিচার করা হচ্ছে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে। নির্দ্বিধায় বলতে পারি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই বিচার প্রক্রিয়া প্রশংসিত হয়েছে। বিশেষ কিছু মানুষ ছাড়া সবাই বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেনি। কিছু কিছু মানুষ আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাব বিস্তারের জন্য বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। কারও রক্ত চক্ষু এই বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না।
আইন প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে চেয়েছিলেন। প্রথম পর্যায়ে দালাল আইনে এদের বিচার হয়। তখন ১১ হাজার দালাল আটক করা হয়েছিল। এর মধ্যে বিচারে ২২ জনের মৃত্যুদ-, ৬৮ জনের যাবজ্জীবন ও ৭০০ জনকে বিভিন্ন দ-ে দ-িত করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দালালদের বিচার বন্ধ হয়ে যায়। ২০০১ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করার পর আবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়। এটা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল। ফৌজদারি মামলা কখনও তামাদি হয় না। তিনি বলেন, আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি অত্যন্ত সফল ও নিরপেক্ষভাবে এই বিচার কাজ পরিচালিত হচ্ছে। পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও তদন্তকারী সংস্থা ও প্রসিকিউটরগণ দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম আলোচনায় বলেন, দীর্ঘ ৪২ বছর পর হলেও আমরা মানবতাবিরোধীদের বিচার করতে পেরেছি। বাংলাদেশে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কারও বিচার হচ্ছে না যারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল, তাদেরই বিচার করা হচ্ছে। প্রসিকিউটর রানাদাশ গুপ্ত বলেন, আমরা যাদের বিচার করছি তারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘৃণ্যতম অপরাধ করেছিল। তারা গণহত্যা, হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্মান্তরিত, ধর্ষণের মতো জঘন্যতম কাজ করেছিল। আমরা কোন নিরপরাধ ব্যক্তির বিচার করছি না। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কিছু যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে। আরও কিছু বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই যুদ্ধাপরাধী বিচারের বিষয় যারা অপপ্রচার চালাচ্ছে এর প্রতি উত্তর দেয়ার জন্য সরকারের একটা মিডিয়া সেল গঠন করা দরকার ছিল তা হলে তারা এর জবাব দিতে পারত। সে ক্ষেত্রে সরকার একটি ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে।
মূল প্রবন্ধে মফিদুল ইসলাম বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ থেকে শুরু করে পরবর্তীতে মানবতাবিরোধীদের বিচারের বিষয় তুলে ধরেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সাক্ষী হয় ইতিহাসের এক জঘন্য বর্বরতার। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে বলি হয় এদেশের কোটি মানুষ। এ দেশের নিরীহ জনগণের ওপর পাকিস্তানীদের অত্যাচার মাত্রা এতটাই অমানবিক এবং নির্মম ছিল যা ক্ষেত্র বিশেষে ছাড়িয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতাকেও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এত বছর পরেও নাৎসী বাহিনী কর্তৃক সংগঠিত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য তাদের বিচার হচ্ছে এবং বিচারে সাজা দেয়া হচ্ছে অপরাধীদের।
আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধসমূহ হচ্ছে এক বিশেষ ধরনের অপরাধ যেগুলোকে অপরাধ বলা হয়। ১৯৭১-এ পাকিস্তানী বাহিনী এবং তাদের এদেশেীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রসংঘ এদেশের জনগণের ওপর চলে নির্বিচারে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো নির্মম অত্যাচার চালায়। এ যুদ্ধের নির্মম পাশবিকতায় প্রাণ হারায় ৩০ লাখ মানুষ এবং সম্ভ্রম হারায় ২ লাখ নারী। নয় মাসের বিভীষিকাময় যুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ লাভ করে স্বাধীনতা। স্বাধীনতার পরেই ১৯৭৩ সালে প্রণয়ন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩। এই আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ সময়ে কৃত সমস্ত অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদান।