মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৩, ২৪ অগ্রহায়ন ১৪২০
জঙ্গীবাদ দমনে বাংলাদেশ সরকারের পাশে থাকবে সুইডেন
সুইডিশ পার্লামেন্টে সেমিনার
গত ৬ ডিসেম্বর সুইডিশ পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটির উদ্যোগে ‘বাংলাদেশ এ্যাট দ্য ক্রসরো ড. সেক্যুলার ডেমোক্র্যাসি অর রিলিজিয়াস এক্সট্রিমিজম’ শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সেমিনারে পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটির আহ্বায়ক ও ক্ষমতাসীন জোটের এমপি ইসমাইল কামিলের সভাপতিত্বে সূচনা বক্তব্য দেন বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সুইডেন শাখার সভাপতি জনাব আকতার এম জামানের সঞ্চালনায় সেমিনারে বক্তব্য রাখেন সুইডিশ ফ্রি চার্চ কাউন্সিলের সেক্রেটারি জেনারেল কারিন ভিবুন, সুইডিশ পার্লামেন্ট মেম্বার জ্যাকব জনসন, সুইডিশ পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটির মেম্বার উলরিকা কার্লসন এমপি এবং স্থানীয় বাংলাদেশ কমিউনিটির পক্ষে স্টকহোম ক্যারোলিন্সকা ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. ফরহাদ আলী খান। সেমিনারের প্রথম পর্বে প্রদর্শন করা হয় বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক ও ফিল্মমেকার শাহরিয়ার কবির নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য আলটিমেট জিহাদ।’
ড. ফরহাদ আলী খান সংক্ষেপে বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। বিরোধী দল বিএনপির প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় কিভাবে জামায়াতে ইসলামী একাত্তরের মতো বাংলাদেশে গণহত্যা চালাচ্ছে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত ভেঙ্গে দিতে বাংলাদেশের লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একের পর এক ধ্বংস করে দিচ্ছে তা তিনি তুলে ধরেন। ড. ফরহাদ সুইডেন সরকারের কাছে আবেদন করেন ইসলামী জঙ্গীবাদকে নির্মূল করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পাশে দাঁড়াতে। বিচার এড়াতে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা কোন যুদ্ধাপরাধীকে সুইডেনে আশ্রয় না দেয়ার জন্য জোর দাবি জানান তিনি।
সূচনা বক্তব্যে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বিএনপি-জামায়াতের আন্তর্জাতিক আদালতের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ছড়ানো প্রোপাগান্ডার জবাব দিতে গিয়ে বলেন, বিচার-প্রক্রিয়া যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হতো তাহলে বর্তমান সরকারের দুজন যুদ্ধাপরাধীর বিচার ট্রাইব্যুনালে হতো না। তিনি ১৯৭৩ সালের বিশেষ আইনের কথা উল্লেখ করে বলেন, কোন রায়ই এ আইনের বরখেলাফ করে দেয়া হয়নি। তিনি জামায়াতের বিভিন্ন মিথ্যাচারের স্বরূপ এবং সেগুলোর জবাবে বলেন, বিশ্বের কোথাও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কখনই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে করা হয়নি, যেটা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে হচ্ছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি আদালতের রায়ের পর দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীমকোর্টে আপীলসহ রাষ্ট্রপতির কাছে অনুকম্পা চাওয়ার আইনগত বিধানের কথা উল্লেখ করেন, যা বিবাদীপক্ষ ভোগ করছে। মৃত্যুদ- দেয়ার তর্কে ব্যারিস্টার তুরিন প্রশ্ন করেন, ফৌজদারি মামলায় একটি হত্যার অপরাধে যদি কাউকে ফাঁসি দেয়া হয়, তাহলে গণহত্যার জন্য কেন একজন অপরাধীকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হবে? একাত্তরে যে ৩০ লক্ষ বাঙালীকে হত্যা করা হয়েছিল ধর্মের নামে, তাঁদের স্বজনরা এখনও বেঁচে আছেন। গণহত্যাকারীর প্রতি মানবতা দেখিয়ে পক্ষান্তরে ভিকটিম পরিবারগুলোর প্রতি দেখানো হবে চরম অমানবিকতা।
কারিন ভিবুন বিশ্বমানবতার প্রতীক নেলসন ম্যান্ডেলার কথা স্মরণ করে বলেন, তিনিই হতে পারেন অনুকরণীয় বিশ্বমানবতার একজন জ্বলন্ত প্রতীক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জঙ্গী-মৌলবাদের উত্থানের কারণে এ অঞ্চলে বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ছাড়াও খ্রিস্টানদের ওপর যে অত্যাচারের খ—গ নেমে এসেছে, তাতে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এ অঞ্চলে সেক্যুলার ডেমোক্র্যাটিক রাষ্ট্রীয় প্রথা অনুসরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
জ্যাকব জনসন-এমপি বলেন, তাঁর দল এবং সরকার যে কোন অপরাধীকে মৃত্যুদ- দেয়ার বিপক্ষে হলেও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায় এবং এর বাস্তবায়ন কিভাবে হবে, তাঁর সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার শুধুমাত্র সে দেশের আইন এবং জনগণের ওপর ন্যস্ত। বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর দল ভেন্সতের পার্টি বাংলাদেশ সরকারকে সর্বাত্মক সমর্থন ও সহযোগিতা দেবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
ক্ষমতাসীন জোটের এমপি উলরিকা কার্লসন তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশে জঙ্গী-মৌলবাদের উত্থানে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি তাঁর সরকারের পক্ষে বাংলাদেশকে একটা সেক্যুলার মডার্ন ডেমোক্র্যাটিক রাষ্ট্র গঠনে চলমান যে অংশীদারিত্ব রয়েছে, তা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানান। তিনি বাংলাদেশের শিশুদের শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন যে, জঙ্গীবাদ নির্মূলে ভবিষ্যত প্রজন্মকে সঠিক শিক্ষা প্রদানের কথা বলেন এবং এ ব্যাপারে তাঁর সরকারের সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
সভাপতির বক্তব্যে ইসমাইল কামিল-এমপি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা এবং দেশটিতে জামায়াতে ইসলামীর জঙ্গী তৎপরতার বিষয়ে সুইডিশ সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার জন্য উত্থাপন করবেন বলে জানান। বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী সেক্যুলার ডেমোক্র্যাটিক রাষ্ট্রের পথে এগিয়ে নিতে সুইডিশ সরকারের সার্বিক সহযোগিতা দানের কথা তিনি তুলে ধরেন। এ ব্যাপারে তিনি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনার আশ্বাস দেন। একাত্তরের ভিকটিমদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে ইসমাইল বলেন, সুইডেন তথা ইউরোপ নিশ্চয়ই মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করে না। তবে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তটি নেবে দেশটির জনগণ, অন্য কেউ নয়। তিনি শাহরিয়ার কবিরের প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য আলটিমেট জিহাদ’-এর ভূয়সী প্রশংসা করেন। -বিজ্ঞপ্তি।