মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৩, ২৪ অগ্রহায়ন ১৪২০
নানা মাধ্যমে গড়েছেন নিজের কল্পনাকে, দায়িত্ববোধও অত্যুজ্জ্বল
রনবীর ‘বাস্তবতার অনুষঙ্গ’ বেঙ্গলে
মোরসালিন মিজান ॥ সত্তর বছরের জীবন। দীর্ঘ অভিযাত্রা। কত কত ভাল মন্দের দিন! তবে থেমে থাকা নেই একদম। ছবি আঁকা কাজ। তাই করেছেন। নিবিষ্ট থেকেছেন। নানা মাধ্যমে গড়েছেন নিজের কল্পনাকে। দায় এবং দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেও অত্যুজ্জ্বল। সব মিলিয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিভ্রমণ। আর এ পরিভ্রমণের নাম রফিকুন নবী। খ্যাতিমান এ শিল্পীর জন্মদিন ছিল গত ২৮ নবেম্বর। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বলা চলে মামুলি কেটেছে জন্মের প্রথম শুভক্ষণ। তবে বিশেষ পরিকল্পনা ছিল বেঙ্গল গ্যালারির। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী শনিবার থেকে শুরু হয়েছে তাঁর একক চিত্রকর্ম প্রদর্শনী। শিরোনামÑ বাস্তবতার অনুষঙ্গ। সন্ধ্যায় তেরো দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, সাংবাদিক মতিউর রহমান এবং শিল্পকর্ম সংগ্রাহক দুর্জয় রহমান জয়।
প্রদর্শনীতে মোট চিত্রকর্মের সংখ্যা ১২০টি। আয়োজনের প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে, এখানে শিল্পীর শুরুর সময়টাকে পাওয়া যায়। তিনি শুরু করেছিলেন ১৯৬১ সালে। সেই জায়গা থেকে ধারাবাহিকভাবে উঠে আসেন আজকের রফিকুন নবী। শিক্ষার্থীর রুটিন আঁকিবুকি থেকে শুরু করে পরিপক্ব ভ্রমণের প্রতিটি ধাপ যেন ফুটে ওঠে এখানে। পরিলক্ষিত হয় সৃষ্টির বৈচিত্র্যসমূহ। শিল্পীর দেখার চোখ বোধবুদ্ধির বিবর্তন একটু একটু করে স্পষ্ট হয়। নানা উৎস থেকে সংগৃহীত এসব ছবি বলে দেয়, কত রকম নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছেন রনবী। বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেন তিনি। সাবলীলভাবে কাজ করেন। প্রদর্শনী দেখতে দেখতে সে কথা আরও একবার মনে পড়ে যায়। তাঁর তেল রং, জল রং এ্যাক্রেলিকে গড়া শিল্পকর্মগুলোতে আটকে যায় চোখ। ছাপচিত্রের বেলায়ও অনন্যসাধারণ এক শিল্পী হয়ে প্রকাশিত হন তিনি।
রফিকুন নবী মূলত শহুরে। অধিকাংশ সময় রাজধানীতে কাটিয়েছেন তিনি। হয়ত তাই ঢাকা ঢাকার চারপাশ তাঁকে সহজে আকৃষ্ট করেছিল। তাঁর আঁকার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল। ১৯৬৭ সালে জল রঙে গড়া সদরঘাট যেন সে কথারই প্রতিধ্বনি করে। প্রায় একই সময়ে তাঁর ক্যানভাসে জায়গা করে নেয় হতদরিদ্রের বস্তিঘর। আর ‘টোকাই’ তো তাঁর। কেবলই তাঁর। এই অনন্য সৃষ্টি শিল্পীকে আলাদাভাবে পরিচিত করেছে। এই সিরিজের বেশ কিছু ছবি আছে প্রদর্শনীতে। অন্য রকম মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে সেগুলো। এ জায়গাটিতে রনবীর সত্যি কোন তুলনা হয় না। তাঁর রসবোধ, রাজনীতির জ্ঞান, সমাজচেতনা সব ধারণ করে আছে পথশিশুর দল। প্রদর্শনী ঘুরে উপলব্ধি হয়, গ্রামীণ জীবনকেও অনুষঙ্গ করেছেন শিল্পী। তাঁর দেখা নদী, নৌকো, গরুরগাড়ি স্বতন্ত্র সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হয়, আবহমান বাংলার রূপ ধারণ করে। এভাবে গ্রাম-শহর দেখা আর কল্পনার জগতকে একসূত্রে গেঁথে নেন শিল্পী। প্রদর্শনী ঘুরে সে ধারণা পোক্ত হয়।
গ্যালারিতে ষাটের দশকের ছবি যেমন আছে, তেমনি রাখা হয়েছে শিল্পীর এক সপ্তাহ আগে আঁকা ছবিটিও। ফলে রনবীর পরিভ্রমণ সম্পর্কে চমৎকার একটি ধারণা দেয় প্রদর্শনী। একটি সময়ের সঙ্গে আরেকটি সময়ের যোগসূত্র স্থাপন করে দেয়। আর তখনই আবিষ্কৃত হয়, খুব বেশি বদলায়নি বাংলাদেশের সমাজ। রাজনীতি। দুঃখ হয় তখন? জানতে চাইলে রনবী কয়েক সেকেন্ড থামেন। যেন পেছনে ফেরার চেষ্টা। বলেন, সেই ষাটের দশকে শুরু করেছিলাম। তখন খ্যাতির কথা মাথায় ছিল না। মনের টানে ছবি এঁকেছি। দায়বদ্ধতা থেকে ছবি এঁকেছি। এভাবে দীর্ঘ সময়। কিন্তু এখন দেখি অনেক পুরনো ছবি বর্তমানের ছবিটি হয়ে গেছে। শিল্পী তার শিল্পকর্মের অমরত্ব চান। আমিও। কিন্তু সমাজ রাষ্ট্র বদলাবে না, একই ছবি শিল্পীকে সারাজীবন আঁকতে হবেÑ এটি বেদনার বটে। দীর্ঘ কর্মময় জীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ছাত্র ছিলাম। শিক্ষক হয়েছি। আর এখন আমার ছাত্রদের ছাত্ররা ছবি আঁকছে। ভাবলে ভীষণ অবাক হই। ভাল লাগে। এই ভাল লাগা নিজের করতে প্রদর্শনী ঘুরে আসতে পারেন আপনিও। বিশেষ এই আয়োজন আগামী ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে।