মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৩, ২৮ কার্তিক ১৪২০
আওয়ামী লীগের অবস্থান ঢাকায় ১২-১৬ আসনে তুলনামূলক ভাল
নির্বাচনী হাওয়া
রাজন ভট্টাচার্য ॥ হেভিওয়েট প্রার্থীদের ভিড় ঢাকার ১২-১৬ এই পাঁচ আসনে। গেল নির্বাচনে এ সব আসনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়লাভ করেন। আসন্ন নির্বাচনে একাধিক আসনে বড় দুই দলেই প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। মহাজোটের অবস্থান ধরে রাখতে পারলে পাঁচটির মধ্যে বেশিরভাগ আসন আসতে পারে আওয়ামী লীগের ঘরে। একাধিক আসনে ক্লিন ইমেজের প্রার্থী না হলে মহাজোটের বিজয় ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। ১৮ দলীয় জোটে একাধিক আসনে আছে যোগ্য প্রার্থী সঙ্কট। এই জোটে প্রার্থী বাছাই ঠিক হলে জমবে নির্বাচনী লড়াই। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকেই ইতোমধ্যে প্রচারে আছেন। অনেকেই আছেন দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
ঢাকা-১২ ॥ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এবারও এ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বর্তমান সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস। নির্বাচন ইস্যুতে মাঠে আছেন তিনি। নিয়মিত সামাজিক ও দলীয় কর্মকা-েও যোগ দিচ্ছেন। বলতে গেলে ক্লিন ইমেজ তাঁর। বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোটের পক্ষে খন্দকার মাহবুব উদ্দীন আহমাদ এ আসনে প্রার্থী হবেন বলে শোনা যাচ্ছে। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী এ্যাডভোকেট কাজী ফিরোজ রশীদও এ আসনে নির্বাচন করার কথা আছে। তবে মহাজোটে নির্বাচন হলে তিনি মনোনয়ন পাবেন কি না এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে ফিরোজ রশীদ ঢাকা দক্ষিণের মেয়র প্রার্থীও ছিলেন। নাগরিক ঐক্যের রেহানা আক্তার চূড়ান্তভাবে নির্বাচনের জন্য মাঠে নেমেছেন।
সংসদীয় আসন ১৮৫। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ২৪-২৭, ৩৫ ও ৩৬ ওয়ার্ড মিলিয়ে এ আসনের আয়তন। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে প্রধান দুই দলের প্রার্থী ছাড়া অন্য ছয় প্রার্থী ২০০-এর বেশি ভোট পাননি। তাদের মধ্যে এক লাখ ১৮ হাজার ১৩৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির খন্দকার মাহবুব উদ্দীন আহমাদ পান ৬৯ হাজার ২৬২ ভোট।
এ ছাড়াও অংশ নেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের আবুল কালাম আজাদ, স্বতন্ত্র মোঃ আফজাল হোসেন বাচ্চু, ইসলামী আন্দোলনের মোঃ আবদুল আওয়াল, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মোঃ বাহারানে সুলতান বাহার, গণফোরামের নুরুন নাহার হাবিব, ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলনের মোঃ শহিদুল ইসলাম খান। আসন্ন নির্বাচনেও তাঁদের অনেকেই প্রার্থী হবেন এমন কথা শোনা যাচ্ছে। তবে এ আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এ আসন এলাকায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বাসাসহ সভানেত্রীর কার্যালয় রয়েছে। সাংগঠনিক অবস্থাও বেশ ভাল। এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে লড়াই বেশ জমে উঠবে এমন ধারণা স্থানীয় বাসিন্দাদের।
ঢাকা-১৩ ॥ বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। ১৮ দলীয় জোটের মধ্যে তিনিই প্রভাবশালী প্রার্থী। গেল নির্বাচনে কল্যাণ পার্টির প্রধান সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম এ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও এবারের নির্বাচনে কল্যাণ পার্টি ১৮ দলের শরিক হওয়ায় তিনি না দাঁড়ানোর সম্ভাবনাই বেশি। এদিকে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদপুর এলাকা। এখানেও আওয়ামী লীগের পক্ষে এবারের নির্বাচনের প্রার্থী স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনিও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রমেও আছেন নিয়মিত। এর বাইরে বিএনপি থেকে একাধিক প্রার্থী থাকলেও আওয়ামী লীগ থেকে অন্য কারো নাম শোনা যাচ্ছে না।
এ ছাড়া এ আসনে নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী ডা. নজরুল ইসলাম। জাতীয় পার্টির সিরাজ মিয়া মনোনয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দল থেকেও প্রাথমিকভাবে সিরাজ মিয়াকে এলাকায় কাজ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এক লাখ ২৫ হাজার ১২০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি পেয়েছিলেন ৭৮ হাজার ৫০৪ ভোট। এ ছাড়া অন্য পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট ছিল আড়াই হাজার।
অন্যদের মধ্যে অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির খান আহসান হাবিব, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোঃ নাসিম খান, কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের মোহাম্মদ মনজুর হোসেন নিজামী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মোঃ মাহবুব অর রশীদ চৌধুরী। আসন্ন নির্বাচনে তাঁদের অনেকেই অংশ নেবেন বলে শোনা যাচ্ছে। সংসদীয় আসন ১৮৬। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ২৮-৩৪ ওয়ার্ড মিলিয়ে আসনের নির্বাচনী সীমানা।
ঢাকা-১৪ ॥ সংসদীয় আসন ১৮৭। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৭-১২ ও সাভার উপজেলার কাউন্দিয়া ইউনিয়ন মিলিয়ে আসনের আয়তন। এ আসনে আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয় দলে নতুন মুখ চান স্থানীয় ভোটাররা। বিএনপির পক্ষে প্রার্থী হিসেবে এস এ খালেকের আধিপত্য দীর্ঘদিনের। সাবেক সংসদ সদস্যও ছিলেন তিনি। জমি দখল, অবৈধ ব্যবসাসহ নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত প্রবীণ এ রাজনীতিক। নিজ দলে কেন্দ্রীয়ভাবে তেমন কোন অবস্থান না থাকলেও এলাকায় পরিচিতি যথেষ্ট। বিএনপিসহ তাঁর সমর্থকদের অনেকেই চান দলের পক্ষ থেকে নতুন মুখ নির্বাচনে আসুক। হয়ত নতুন দিয়ে পরিবর্তনের ভাবনা ভাবছেন ভোটাররা। আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য আসলামুল হক আসলাম তিনিই আগামী নির্বাচনের প্রার্থী হতে চান। গেল পাঁচ বছরে তিনিও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুব একটা পূরণ করতে পারেননি। খাল, জমি দখলসহ নানা ইস্যুতে তাঁকে নিয়ে রয়েছে অনেক সমালোচনা। তাই আওয়ামী লীগের সমর্থক থেকে শুরু করে অনেকেই চান নতুন মুখ।
জাতীয় পার্টি থেকে ঢাকা-১৪ আসনে সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাকুর রহমান মোস্তাককে প্রাথমিকভাবে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। রাজনীতির মাঠে তেমন কোন দক্ষতা নেই তাঁর। জানাশোনাও কম। কিন্তু এরশাদের নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। সেই সুবাদেই কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পান তিনি। শেষ পর্যন্ত সংসদ নির্বাচনেরও চেষ্টা আছে তাঁর। নাগরিক ঐক্য থেকে আবদুল্লাহ আল আমিন দারা ইতোমধ্যে নির্বাচনের জন্য চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন।
সর্বশেষ নির্বাচনে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের আসলামুল হক আসলাম এক লাখ ৪৮ হাজার ৩৯৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির এস এ খালেক পান ৮৪ হাজার ৬৫৫ ভোট। ইসলামী আন্দোলনের মোঃ হারুন-আর-রশীদ পেয়েছিলেন দুই হাজার ৮৫৯ ভোট। এ ছাড়া জাকের পার্টির মোঃ কায়সার হামিদ, তরিকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভা-ারী, গণফোরামের ফেরসৌদী সুলতানা নির্বাচনে অংশ নেন। তাঁদের কেউ কেউ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবারও। আরও আছে কিছু নতুন মুখ।
ঢাকা-১৫ ॥ সংসদীয় আসন ১৮৮। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৪, ১৩, ১৪ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ড মিলিয়ে আসনের সীমানা। আসন্ন নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদার। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত থাকায় তাঁকে নিয়ে আছে বিস্তর সমালোচনা। এ আসনে আওয়ামী লীগের পক্ষে নতুন তেমন কোন নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়নি। তবুও সাধারণ ভোটারদের অনেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরিবর্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। হামিদুল্লাহ খান মারা যাওয়ায় বিএনপির পক্ষে নতুন প্রার্থী কে হচ্ছেন এ নিয়ে আছে নানা কথা। তবে ১৮ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এ আসনে নতুন মুখ আসতে পারে। নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী ইব্রাহিম মোল্লা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন।
সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কামাল আহমেদ মজুমদার এক লাখ ২০ হাজার ৭৮০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির প্রার্থী হামিদুল্লাহ খান (বীর প্রতীক) পান ৭৭ হাজার ৮১ ভোট। এ ছাড়াও এ আসনে অংশ নিয়েছিলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের মোঃ ফায়েকউজ্জামান, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি তাজুল ইসলাম, তরিকত ফেডারেশনের সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী, ন্যাপের শেখ শওকত হোসেন, স্বতন্ত্র আব্দুল কাদের, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি আহাম্মদ সাজেদুল হক। এবারের নির্বাচনেও তাঁদের অনেকে অংশ নিতে পারেন।
ঢাকা-১৬ ॥ সংসদীয় আসন ১৮৯। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ২, ৩, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড মিলিয়ে আসনের সীমানা। শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলো থেকে এ আসনে এখনও প্রার্থী চূড়ান্ত না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের আনাগোনা আছেই। তাঁরা নির্বাচনী এলাকায় ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। কেউ সরব কেউবা নীরব প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ আসনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বর্তমান সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন। বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে ব্যানার-পোস্টার ছাপিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন তিনি। বিএনপির পক্ষ থেকে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন। কিন্তু দলের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত ঘোষণা না পাওয়ায় আঁটঘাট বেঁধে মাঠে নামতে পারছেন না তিনি। সূত্রমতে, এ আসনে আছে বড় দুই দলের একাধিক প্রার্থী। সব মিলিয়ে এ আসনে আগামী নির্বাচনে আসতে পারে নতুন মুখ। এ ছাড়া নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী ক্যাপ্টেন (অব) আব্দুল জব্বার ইতোমধ্যে প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা শুরু করেছেন। জাতীয় পার্টি থেকে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়নি।
গেল নির্বাচনে এ আসনে প্রার্থী সংখ্যা ছিল আটজন। আওয়ামী লীগের ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা এক লাখ ৩২ হাজার ৮৮৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির মোঃ রফিকুল ইসলাম মিয়া ভোট পান ৮৫ হাজার তিনটি। নির্বাচনে অংশ নেন ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলনের কাজী ফারুক আহম্মদ, সমাজতান্ত্রিক দলের মীর মোশারফ হোসেন চৌধুরী, তরিকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভা-ারী, ইসলামী আন্দোলনের আব্দুল মান্নান আজিজ, বিকল্পধারার মোঃ মাহফুজুর রহমান। তাঁদের মধ্যে অনেকেই এবারের নির্বাচনেও অংশগ্রহণের ব্যাপারে আগ্রহী।