মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ২৯ আগষ্ট ২০১৩, ১৪ ভাদ্র ১৪২০
উৎসাহ উদ্দীপনায় জন্মাষ্টমী পালিত ॥ মিছিলে মানুষের ঢল
কঠোর নিরাপত্তা
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে চেতনায় উদ্দীপিত হয়ে বুধবার সারাদেশে পালিত হয়েছে মহাবতার শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি, শুভ জন্মাষ্টমী। ঢাকাসহ সারাদেশেই কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় হিন্দু সম্প্রদায় বের করে বর্ণাঢ্য ও মনোলোভা ঐতিহাসিক জন্মাষ্টমীর মিছিল। শান্তি, কল্যাণ ও মানবতাবোধের শক্তিতে প্রাণিত হয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, অসত্য ও অন্যায়ের অবসান সম্ভবÑ এই পূর্ণতিথিতে সেই শুভকামনাই ছিল দিবসটির মূল কথা।
শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দিনের শুরুতেই ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় শ্রী শ্রী গীতাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন সংগঠন দিনব্যাপী মঙ্গলাচারণ, নামকীর্তন, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ, কৃষ্ণ পূজা, পদাবলী কীর্তন, দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা করে বিশেষ প্রার্থনাসভা, আলোচনাসভা ও ধর্মীয় সঙ্গীতানুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসটি পালন করে।
শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বুধবার ছিল সরকারী ছুটির দিন। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী হিন্দু সম্প্রদায়ের কল্যাণ কামনা করে পৃথক বাণী দিয়েছেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ নিবন্ধ। বেতার-টেলিভিশন ও বিভিন্ন সরকারী চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।
তবে দিবসটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল বর্ণিল ঐতিহ্যবাহী জন্মাষ্টমী মিছিল। দীর্ঘদিন পর এবারের জন্মাষ্টমী মিছিলে নেমেছিল সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের ঢল। নির্বিঘেœ ও প্রাণখুলে হাজার হাজার পুণ্যার্থী মনোলোভা ও জৌলুসপূর্ণ মিছিলে অংশ নিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জয়গান গেয়েছেন।
রাজধানীতে মনোলোভা জন্মাষ্টমী মিছিল ॥ ঐতিহাসিক জন্মাষ্টমীর মিছিল উপলক্ষে বুধবার দুপুর ২টার পর থেকেই পুণ্যার্থীদের ঢল নামে ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে পলাশীর মোড় পর্যন্ত। জন্মাষ্টমীর মিছিলকে সামনে রেখে নজরকাড়া নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল চোখে পড়ার মতো। দুপুর থেকেই শ’ শ’ পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্য নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেন পুরো এলাকা।
বেলা পৌনে ৪টায় বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা উদ্যাপন পরিষদের যৌথ উদ্যোগে রাজধানীর মোড় থেকে জমকালো এই জন্মাষ্টমীর মিছিল বের হয়। সর্বাগ্রে অশ্বারোহীর হাতে রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা এবং পেছনে হাতি, ঘোড়া, গরুরগাড়ি, রথ, টমটম, বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন, ব্যানার ও অসংখ্য ট্রাকের মিছিল নিয়ে শুরু হয় এই বর্ণাঢ্য ও মনোলোভা ঐতিহাসিক জন্মাষ্টমীর মিছিল। তবে এবারের জন্মাষ্টমী মিছিলের বিশেষ নজরকাড়া দিকটি ছিল সর্বাগ্রে ধুতি-হলুদ গেঞ্জি পরিহিত শতাধিক ঢাকির মনোরম ঢাকের বাদ্য-বাজনা।
দীর্ঘদিন পর পুণ্যার্থীরা যেন প্রাণখুলে ডাকলেন মহাবতার শ্রীকৃষ্ণকে। অনেকটা প্রাণখুলেই লাখো নারী-পুরুষ, আবাল-বৃদ্ধবনিতা অংশ নেন জন্মাষ্টমীর মিছিলে। শুধু দেশেরই নয়, বিভিন্ন দেশ থেকে আগত কৃষ্ণভক্ত বিদেশীরাও নেচে-গেয়ে, সুদীর্ঘ পথ হেঁটেই অংশ নেন জন্মাষ্টমীর মিছিলে। মিছিলটি এতই দীর্ঘ ছিল যে, পলাশীর মোড়ে যখন মিছিলের শেষভাগ, তখন অগ্রভাগ পৌঁছে গেছে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরবর্তী পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে।
বিকেল পৌনে ৪টায় সংক্ষিপ্ত আলোচনাসভার পর মিছিলের উদ্বোধন করেন মুক্তিযুদ্ধকালীন সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব) চিত্তরঞ্জন দত্ত বীরউত্তম। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি বাসুদেব ধরের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। তিনি মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে কর্মসূচীর সূচনা করেন। বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু এমপি, ভারতীয় হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার সন্দীপ চক্রবর্তী, স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এমপি, মহানগর পুজো কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্মল চ্যাটার্জী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওবায়দুল কাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে দেশের সকল হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, মহাবতার শ্রীকৃষ্ণ দুর্জনের বিরুদ্ধে সজ্জনের প্রতিষ্ঠা ও অসুরের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের জন্য লড়াই করেছেন। শিষ্টের দমন আর দুষ্টের পালনই ছিল শ্রীকৃষ্ণের প্রধান ব্রত। নিজেদের সংখ্যালঘু না ভাবার অনুরোধ জানিয়ে তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বলেন, আপনারা কেন নিজেদের সংখ্যালঘু ভাববেন? আপনারা সবাই এদেশের নাগরিক, ভোটার। মুসলমানদের মতো আপনাদেরও দেশে সমান অধিকার রয়েছে। তাই সমান মর্যাদার নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে চলুন।
তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত চুক্তিসহ দ্বিপক্ষীয় অমীমাংসিত ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরোধিতার সমালোচনা করে ওবায়দুল কাদের বলেন, একতরফা কখনও বন্ধুত্ব হয় না। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আন্তরিক থাকলেও বাঙালীঅধ্যুষিত পশ্চিম বাংলার সরকার আমাদের ন্যায্য হিস্যা আদায়ে বিরোধিতা করবে, এটা দেখে আমরা হতবাক হয়েছি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, আপনি মা-মাটি ও মানুষের নেত্রী হিসেবে দাবি করেন। সত্যিই যদি তাই হয় তবে বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনগণের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি অনুরোধ, আমাদের ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে সহায়তা করুন।
ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার সন্দীপ চক্রবর্তী বাংলাদেশে জন্মাষ্টমী মিছিলে মানুষের ঢল দেখে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, শুভ জন্মাষ্টমীতে এদেশের মানুষের উচ্ছ্বাস ও মানুষের ঢল দেখে সত্যিই আমি অভিভূত। সব ধর্মের মানুষ এদেশে স্বাধীন ও উৎসবমুখরতায় পালন করছে। তিনি ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি শুভ জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা ও ভালবাসা জানান।