মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ২৯ আগষ্ট ২০১৩, ১৪ ভাদ্র ১৪২০
প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ১৭ স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা প্রকল্প এগিয়ে যাচ্ছে
হাজারীবাগে শহীদ বেগম শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব সরকারী মহাবিদ্যালয় উদ্বোধন ২ সেপ্টেম্বর
বিভাষ বাড়ৈ ॥ ভূমিদস্যুদের বাধাসহ নানা বিপত্তি পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত রাজধানীর নতুন ১৭ সরকারী হাইস্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার বহু আলোচিত প্রকল্পের কাজ। এর অংশ হিসেবে আগামী ২ সেপ্টেম্বর হাজারীবাগে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে ‘শহীদ বেগম শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব সরকারী মহাবিদ্যালয়।’ স্বাধীনতার পর এই প্রথম ঢাকায় সম্পূর্ণ নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত কোন সরকারী কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। আধুনিক ও অত্যাধুনিক শিক্ষা উপকরণ দিয়ে কলেজের একটি বিজ্ঞানাগার স্থাপন করা হয়েছে। চলতি বছরেই অন্তত চার থেকে পাঁচটি স্কুল ও কলেজের নির্মাণ কার্যক্রম শেষ হচ্ছে। আগামী জানুয়ারি থেকেই সেখানে শুরু হতে পারবে শিক্ষা কার্যক্রম। বাকি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কাজও ২০১৪ সালেই শেষ হচ্ছে সিংহভাগ। তবে নানা বাধা-বিপত্তির কারণে নির্ধারিত সময় অর্থাৎ ২০১৪ সালেই প্রকল্পের পুরো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশাল এ জনগোষ্ঠীর মানসম্মত শিক্ষা প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা পূরণে সরকারের এই উদ্যোগ যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।
জানা গেছে, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আগামী ২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নবনির্মিত শহীদ বেগম শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব সরকারী মহাবিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। এর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পর এই প্রথম ঢাকায় নতুন প্রতিষ্ঠিত কোন সরকারী কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এর আগে সকল সরকারী কলেজই মূলত বেসরকারী থেকে সরকারীকরণ হয়েছে। আধুনিক ও অত্যাধুনিক শিক্ষা উপকরণ দিয়ে কলেজের একটি বিজ্ঞানাগার স্থাপন করা হয়েছে। ইন্টারমিডিয়েট এই কলেজটিতে এবার একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে তিন শাখায় (বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য) মিলে মোট ১৭৩ ছাত্রছাত্রী। তবে প্রতি শাখায় মোট ১৫০ করে তিন শাখায় মোট ৪৫০ জন ছাত্রছাত্রী ভর্তির অনুমোদন দিয়েছে শিক্ষা বোর্ড। এক একর জায়গায় ছয়তলা ফাউন্ডেশনের একটি চারতলা ভবনে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নিচতলায় প্রশাসনিক কার্যক্রম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় একাডেমিক কার্যক্রম এবং চতুর্থ তলায় বিজ্ঞানাগার স্থাপন করা হয়েছে। অধ্যক্ষসহ প্রথম অবস্থায় মাত্র ২৩ শিক্ষক নিয়ে কলেজের যাত্রা শুরু হচ্ছে। শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, হাজারীবাগ ও আশপাশের এলাকায় কোন সরকারী কলেজ নেই। অভাব আছে ভালমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও। তাই নতুন এই কলেজের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় ওই এলাকার ছাত্রছাত্রীদের কম খরচে অনেকেরই মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে পাঠলাভের প্রত্যাশা যেমন মিটবে, তেমনি ঢাকা শহরের নামীদামী কলেজে ভর্তির প্রতিযোগিতাও কিছুটা হ্রাস পাবে। ১৭ স্কুল-কলেজ নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মানিক চন্দ্র দে (যুগ্ম সচিব) বলেন, প্রয়োজনীয় সমস্ত শিক্ষা উপকরণ বুঝিয়ে দিয়েছি কলেজ কর্তৃপক্ষকে। কলেজে পানি, টেলিফোন ও বিদ্যুত সংযোগ দেয়া হয়েছে। সমস্ত কাজও শেষ হয়েছে। পুরোদমে একাডেমিক কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, এই কলেজ চালু হওয়ায় ওই এলাকার যানজট কমবে, অত্যন্ত কম খরচে ছাত্রছাত্রীরা কোয়ালিটি এডুকেশন পাবে, বাণিজ্যনির্ভর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ হ্রাস পাবে। নতুন কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়াসহ অত্যাধুনিক সব শিক্ষা উপকরণ দিয়ে কলেজের ল্যাবরেটরি সাজানো হয়েছে বলেও প্রকল্প পরিচালক জানান। বলেন, পরবর্তীতে এই কলেজে ডাবল শিফ্ট চালুর ব্যবস্থাও থাকছে।
এদিকে গত এক সপ্তাহ সরকারের নির্ধারিত স্থান সরেজমিনে পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীতে বর্তমানে মোট ৪১টি থানায় ২৪টি সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ১১টি সরকারী কলেজ রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এ শহরের প্রায় অর্ধেক থানায় কোন সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা কলেজ নেই। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা মহানগরীতেও জনসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও নতুন কোন সরকারী স্কুল-কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই কাজে হাত দেয়। সম্পূর্ণ সরকারী অর্থায়নে ৪৩৫ কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ ঢাকা মহানগরীতে ১১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ৬টি মহাবিদ্যালয় (সরকারী) স্থাপন প্রকল্পটি গ্রহণ করে। এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৪ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিটিতে একটি করে ছয়তলা ফাউন্ডেশনে চারতলা একাডেমিক ভবন থাকবে। ভবনটিতে অধ্যক্ষ/প্রধান শিক্ষকের কক্ষ, উপাধ্যক্ষ/সহকারী প্রধান শিক্ষকের কক্ষ, অফিস কক্ষ, কমনরুম এবং শিক্ষক মিলনায়তন থাকবে। প্রতিটি ভবনে ১০টি শ্রেণীকক্ষ থাকবে। প্রতিটি কক্ষের শিক্ষার্থী ধারণ ক্ষমতা ৫০ জন। প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (ডাবল শিফ্টসহ) ৫২ জন শিক্ষক ও ৭ জন কর্মচারী এবং প্রতিটি সরকারী মহাবিদ্যালয়ে ৪৭ জন শিক্ষক ও ২২ জন কর্মচারী নিয়োজিত থাকবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রী ধারণ ক্ষমতা ৫শ’ জন। তবে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ডাবল শিফ্টে শিক্ষাদান কার্যক্রম পরিচালিত হবে। নির্মাণকাজ সমাপ্তির পর প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, বই-পুস্তক, অফিস যন্ত্রপাতি, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষাদানের জন্য ডিজিটাল বোর্ড ও বিনোদনের জন্য খেলাধুলার সামগ্রী সরবরাহ করা হবে। এ ছাড়া প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করা হবে। কমবেশি এক একর জমির ওপর এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের স্থান চিহ্নিত করে প্রতিষ্ঠান তৈরি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। তবে দু-একটি স্থানে জমি নিয়ে জটিলতায় পড়ে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। আলেচিত এ প্রকল্পের নাম ‘এস্টাবলিশমেন্ট অব ইলেভেন সেকেন্ডারি স্কুল এ্যান্ড ৬ কলেজেস (গবর্নমেন্ট) ইন ঢাকা মেট্রোপলিটন সিটি।’
মিরপুর পল্লবীতে ‘দুয়ারীপাড়া সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে। ওই বিদ্যালয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু ২৫ শতাংশ কাজ হওয়ার পরও মামলার কারণে একই স্থানে ‘দুয়ারীপাড়া সরকারী মহাবিদ্যালয়’ স্থাপনের কার্যক্রম বন্ধ আছে। দুয়ারীপাড়া সরকারী মহাবিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত জমির মালিকানা দাবি করে স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি মামলা করায় সেখানে মহাবিদ্যালয় নির্মাণের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। মোহাম্মদপুর সরকারী কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট-সংলগ্ন সরকারী জমিতে সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় নির্মাণের কাজে বিলম্ব হয়েছে ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের বিরোধিতার কারণে। তবে সম্প্রতি আলোচনার মাধ্যমে ওই সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানা গেছে। কাফরুলে ‘ভাষানটেক সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ নির্মাণের কাজ চলছে। সম্প্রতি ওই স্কুলের ভবন নির্মাণের জন্য পাইল কাস্টিং হয়েছে। একই স্থানে ভাষানটেক সরকারী মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজও এগিয়ে চলছে। মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাইল কাস্টিং সম্পন্ন হয়েছে। এরই মধ্যে কাজের প্রায় ৪০ শতাংশ শেষ হয়েছে। উত্তরায় দক্ষিণখান সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফাউন্ডেশন ও শর্ট কলাম ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। একই স্থানে দক্ষিণখান সরকারী মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজও এগিয়ে চলছে। মহাবিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের পাইল কাস্টিং চলছে। এ ছাড়া ডেমরায় হাজী এম এ গফুর সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু এগোচ্ছে ধীরগতিতে। কথা বলে জানা গেছে, এসব স্থানে প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ বাধাগ্রস্ত করতে চেষ্টা করছে একটি গোষ্ঠী। মিরপুরে দারুসসালাম সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ভবন নির্মাণের সয়েল টেস্ট (মাটি পরীক্ষা) শেষ হয়েছে। এগিয়ে যাচ্ছে উত্তরায় উত্তরখান সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্থাপনা নির্মাণের কাজ। বড় মগবাজার সরকারী বিদ্যালয়ের নির্মাণের কাজ কিছুটা ঢিমেতালে এগোচ্ছে। মগবাজারে জমি অধিগ্রণের জন্য জেলা প্রশাসন মূল্য নির্ধারণের কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। মোহাম্মদপুরে ঢাকা উদ্যান সরকারী মহাবিদ্যালয় স্থাপনের কাজও এগোচ্ছে ঢিমেতালে। ওই স্থানে ভবন নির্মাণের জন্য সয়েল টেস্টের কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু এখনও জমি বন্দোবস্ত বা দান কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে। আর কামরাঙ্গীরচর সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জমির রেজিস্ট্রশন কার্যক্রম এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। উচ্চ আদালতে রিট মামলা থাকায় সবুজবাগ সরকারী মহাবিদ্যালয় স্থাপনের কাজে জটিলতা হলেও সে সঙ্কট কাটছে। এদিকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ভূমিদস্যুদের নজর আছে যুগান্তকারী এই প্রকল্পের জন্য নির্ধারণ করা জমির দিকে। তাই কাজ করতে গিয়ে প্রকল্পের কর্মকর্তাদের নানামুখী বাধার মধ্যে পড়তে হয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কাজের অবস্থা ভাল হলেও অসাধুচক্রের বিষয়ে সর্বদা সতর্ক থাকার পরমর্শ দিয়েছে এলাকাবাসী। এলাকাবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই বলছেন, সরকারী জমি হলেও এর প্রতিটি স্থানই দখল করে মার্কেট কিংবা অন্য কিছু বসিয়ে বছরের পর বছর ব্যবসা করেছেন প্রভাবশালীরা।