মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ২৯ আগষ্ট ২০১৩, ১৪ ভাদ্র ১৪২০
ঈদের আগেই মাঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের মামলার রায়
যুদ্ধাপরাধী বিচার
স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবী হত্যায় অভিযুক্ত পলাতক আলবদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মাঈনুদ্দীন এবং চীফ এক্সিকিউটর মোঃ আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রসিকিউশনের ১৮ সাক্ষী ইতোমধ্যে তাঁদের জবানবন্দী প্রদান করেছেন। আজ ১৯তম সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করা হবে। সাক্ষীদের জবানবন্দী শেষে আসামি পক্ষের সাক্ষী থাকলে তারাও সাক্ষী প্রদান করবেন। এরপর যুক্তিতর্ক। সর্বশেষ রায়। প্রসিকিউশন সূত্র জানা গেছে, এভাবে চললে ঈদের আগেই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় প্রদান করা হতে পারে। এদিকে দুটি ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত ৬টি মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে। বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলার রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছে। চৌধুরী মাঈনুদ্দীন ও মোঃ আশরাফুজ্জামান খানের মামলাটি চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে। এ ট্রাইব্যুনালে অন্য দু’সদস্য রয়েছেন বিচারপতি মোঃ মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মোঃ শাহিনুর ইসলাম।
১৮ বুদ্ধিজীবীকে অপহরণের পর হত্যা, আটক নির্যাতনসহ ৪ ধরনের মোট ১১টি অভিযোগে চলতি বছরের ২৫ জুন অভিযুক্ত করা হয় ঐ দু’জনকে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৪৩ বছর পর বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। প্রসিকিউশনপক্ষে ৪৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। তবে তদন্ত চলাকালে ৬০ জনের বেশি ব্যক্তির জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত আলবদর কমান্ডার বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের মূল হোতা চৌধুরী মাঈনুদ্দীন এবং আশরাফুজ্জামান খানের অনুপস্থিতিতেই বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে ট্রাইব্যুনাল তাদের পক্ষে সরকারী খরচে আইনজীবী (স্ট্যাট ডিফেন্স) সালমা হাই টুনি এবং এ্যাডভোকেট আব্দুস শুকুর খানকে নিয়োগ দেয়া হয়।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ঊষালগ্নে দেশের বুদ্ধিজীবীদের সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। ঐ সময়ে ঢাকা শহরে যে ১৮ বুদ্ধিজীবীকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়, তাঁর মধ্যে ৬ জন সাংবাদিক, ৯ জন শিক্ষক ও ৩ জন ডাক্তার ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১০ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ১৮ বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়। যে ১৮ বুদ্ধিজীবীকে হত্যার জন্য আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দীন অভিযুক্ত হচ্ছেন তাঁদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষকরা হচ্ছেন, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, ড. আবুল খায়ের, ড. সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. সিরাজুল হক খান, অধ্যাপক ফয়জুল মহি, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। শহীদ চিকিৎসকরা হচ্ছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মোঃ মর্তুজা, বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল আলীম চৌধুরী ও বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডা. ফজলে রাব্বী। শহীদ সাংবাদিকরা হচ্ছেন, দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সিরাজউদ্দিন হোসেন, পিপিআইয়ের চীফ রিপোর্টার সৈয়দ নাজমুল হক, দৈনিক পূর্বদেশের চীফ রিপোর্টার আ ন ম গোলাম মোস্তফা, বিবিসির সংবাদদাতা ও পিপিআইয়ের সাবেক জেনারেল ম্যানেজার নিজামউদ্দিন আহমেদ, শিলালিপি পত্রিকার সম্পাদিকা সেলিনা পারভীন এবং দৈনিক সংবাদের যুগ্ম সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার।
দীর্ঘদিন পর বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের বিচার শুরু হয়েছে। গত ১৫ জুলাই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর পর থেকে আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে এর আগে রাষ্ট্রপক্ষের আরও ১৮ সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০ম সাক্ষী শহীদ ডা. ফজলে রাব্বীর মেয়ে ড. নুসরাত রাব্বী অসমাপ্ত সাক্ষ্য দেন। অন্য ১৭ সাক্ষী হচ্ছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন আহমেদের ভাগ্নি মাসুদা বানু রতœা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর ছোট ছেলে আসিফ মুনীর তন্ময়, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে সুমন জাহিদ, শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সিরাজুল হক খানের ছেলে ড. এনামুল হক খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, শহীদ সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেনের ছোট ছেলে তৌহিদ রেজা নূর, শহীদ সাংবাদিক সৈয়দ নাজমুল হকের ছেলে সৈয়দ মোর্তুজা নাজমুল, শহীদ সাংবাদিক আ ন ম গোলাম মোস্তফার ভাই আ ন ম গোলাম রহমান দুলু, শহীদ ডা. আব্দুল আলিম চৌধুরীর মেয়ে ডা. ফারজানা চৌধুরী নিপা, শহীদ অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ভাতিজা ইফতেখার হায়দার চৌধুরী, শহীদ সাংবাদিক আনম মোস্তফার ছেলে অধ্যাপক অনির্বাণ মোস্তফা, শহীদ সাংবাদিক-সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী অধ্যাপিকা পান্না কায়সার, বীর মুক্তিযোদ্ধা শরীয়ত উল্লাহ বাঙালী, শহীদ ডা. মোহাম্মদ মর্তুজার শ্যালক অধ্যাপক ওমর হায়াত, শহীদ অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন আহমেদের বোন অধ্যাপিকা ফরিদা বানু, বীর মুক্তিযোদ্ধা ফিরোজ খান এবং রাশদুল ইসলাম। তাদের জেরা শেষ করেছেন আসামি পক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত দুই আইনজীবী আব্দুস শুকুর খান ও সালমা হাই টুনি।
১৫ জুলাই প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) মধ্যে আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দীনের বিচার কাজ শুরু হয়। পলাতক এ দুই অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতেই সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর শাহিদুর রহমান। ২৪ জুন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা ও আলবদর বাহিনীর কমান্ডার আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে ৫ ধরনের ১১টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গত ১৬ জুন তাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ৪ জুন বিদেশে পলাতক এ দুই ব্যক্তির অনুপস্থিতিতেই বিচার কাজ শুরু করার আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
গত ২ মে আশরাফুজ্জামান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। সম্ভাব্য ঠিকানায় তাদের পাওয়া যায়নি বলে প্রসিকিউশন জানানোর পর ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারকে দুটি জাতীয় দৈনিকে যথাক্রমে দৈনিক জনকণ্ঠ ও ডেইলি স্টারের এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে বলা হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ১০ দিনের মধ্যে আশরাফুজ্জামান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দীনকে আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেয়া হয়। ওই সময়ের মধ্যে তারা আদালতে হাজির না হওয়ায় তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার কাজ শুরুর নির্দেশ দেয়া হয়। গত ২৫ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর ২৮ এপ্রিল আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেন প্রসিকিউশন।