মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ২৯ আগষ্ট ২০১৩, ১৪ ভাদ্র ১৪২০
ইতিহাসে সভ্যতার ধারা, নির্বাসনে আজ কাঁসার বাসনকোসন
প্রাচীন তৈজসপত্র
সমুদ্র হক
প্রাচীন ইতিহাসের ধারায় কাঁসার বাসনকোসন সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। ঐতিহ্যের এই কাঁসার কদর আজ আর নেই। এ্যান্টিকসের খাতায় নাম লিখে তা দৃশ্যমান হয় কোন জাদুঘরে বা প্রবীণ কোন মানুষের কুটিরে। বর্তমান প্রজন্ম কাঁসার জিনিসপত্র হয়ত দেখেইনি। একটা সময় প্রজন্মেরই পূর্বসূরি (এবং আজ যারা মধ্যবয়সী ও প্রবীণ) প্রত্যেকের ঘরে ছিল কাঁসার থালা বাটি জগ গ্লাস পাতিল গামলা কলসি বালতি পানদানিসহ নানা কিছু। এমন কি ইঁদারা ও কুয়ার পারে কাঁসার বদনা ব্যবহার হতো। বড় গৃহস্থ ও বনেদি ঘরে প্রত্যেকের খাবার জন্য আলাদা করে কাঁসার থালা ছিল। বাড়ির কর্তার থালাটি ছিল একটু বড়। যা দেখে কর্তার রাসভারি ভাবটি উপলব্ধি করা যেত। কাঁসার এসব সামগ্রীর কোনটির ওপর থাকতো বাহারি নকশা। কেউ নাম লিখে নিত। আগের দিনের বিয়ে শাদীর অনুষ্ঠানে কাঁসার জিনিসপত্র উপহার দেয়া ছিল রেওয়াজ। যাকে উপহার দেয়া হতো তার নাম ও যিনি উপহার দিতেন তার নাম খোদাই করা থাকত কাঁসার বাসন কোসনে। শিল্পের মর্যাদায় কাঁসা এতটাই ওপরে ছিল যে আভিজাত্য নির্ণীত হতো ঘরের কাঁসার তৈজসপত্র দেখে। দেশের প্রতিটি শহর ও গ্রামে কাঁসা শিল্পীদেরও ছিল বেশ নাম ডাক। এই শিল্পীরা কে কত নিখুঁত ও ঝকঝকে কাঁসার বাসন বানাতে পারে তার প্রতিযোগিতা হতো। শিল্পীদের এই প্রতিযোগিতা কাঁসা শিল্পকে নিয়ে যায় দূর বহুদূরের দেশে। ইতিহাসের সেই পটভূমিতে দেখা যায় কয়েক হাজার বছর আগে কয়েকটি সভ্যতা জুড়ে রয়েছে এই কাঁসা শিল্প। প্রতœতত্ত্ববিদগণ দেশের অনেক স্থানে খনন করে কাঁসার জিনিস পাচ্ছেন। এত কিছুর পর সবচেয়ে বড় ইতিহাস হলো-বাংলাদেশের টাঙ্গাইল ও ঢাকার ধামরাই ছিল কাঁসা শিল্পের সূতিকাগার। এরই ধারায় দেশের প্রতিটি কোনায় গড়ে ওঠে কাঁসা শিল্প। টাঙ্গাইল ও ধামরাইয়ের কাঁসা সামগ্রী রফতানি হতো বিদেশেও। সুন্দর কারুকাজ, নান্দনিক ও গুণগত মানে এ দেশের কাঁসার জিনিসপত্র এতটাই নাম কুড়িয়েছিল যে ব্রিটিশ শাসকরা কাঁসা শিল্পীদের প্রশংসা করে পুরস্কার ও পদক দিয়েছিল। যাদের মধ্যে আছেন টাঙ্গাইলের মধূসুদন কর্মকার, গণেশ কর্মকার, বসন্ত কর্মকার, যোগেশ কর্মকার ও হারান কর্মকার। যাদের অনেকে আর নেই। খোঁজ করে জানা তাদের বংশধরের অনেকে টাঙ্গাইলের কাগমারী, মগড়া, সাকরাইল গ্রামে কাঁসা শিল্পের অস্তিত্ব ধরে রেখেছেন। কাঁসার দুর্দিনে অনেকে ভারতে চলে গেছেন। কেউ অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। এক তথ্যে জানা যায়, রাজা গৌড় গোবিন্দের শাসনামলে উপমহাদেশে ভারতের কংশ বণিকদের মাধ্যমে এই দেশে কাঁসা শিল্পের প্রচলন হয়। সেই হিসাবে কংশ বণিকরাই কাঁসা শিল্পের উদ্ভাবক। একটা সময় সকল ধর্মের মানুষের কাছে কাঁসা শিল্প ছিল জীবন যাপনের পরিচ্ছন্ন অংশ। সকল আচার অনুষ্ঠানের মর্যাদা বাড়িয়ে দেয় কাঁসার ব্যবহার। মনিকাররা (¯¦র্ণকার বা ¯¦র্ণ শিল্পী) যেমন গহনা বানানোর কারিগর হিসাবে গর্ব করত কাঁসার শিল্পীরাও বণেদীদের আভিজাত্য রক্ষায় গর্ব করত। কাঁসার তৈরি ভাস্কর্য প্রচুর সুনাম কুড়ায়। এই ক্ষেত্রে এগিয়ে যায় ধামরাই। প্রাচীন জিনিসপত্র ও ভাস্কর্য দেখে ধামরাইয়ের শিল্পীরা প্রথমে কাঁসা দিয়ে নানা ধরনের ভাস্কর্য বানায়। এরপর পিতল ও তামার ব্যবহার শুরু করে। এখন পর্যন্ত কাঁসা তামা পিতল দিয়ে ছোট বড় ভাস্কর্য ধামরাইতে বানানো হচ্ছে। রথ যাত্রার ওপরও বড় ভাস্কর্য বানিয়েছে ধামরাইয়ের কাঁসা শিল্পীরা। কাঁসা পিতল তামার তৈজসপত্রসহ নানা ধরনের শো পিস বানানো শুরু হয়। টাঙ্গাইল, ধামরাই, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদি, পাবনা এলাকা ছিল কাঁসার জিনিসপত্রের অন্যতম এলাকা। ৭০ দশকের মধ্যভাগে কাঁসার জিনিসপত্রের ওপর প্রথম বড় আঘাত করে সিরামিক। সিরামিকের প্লেট গ্লাস কাপ পিরিচ জগ নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তের ঘরে প্রবেশ করে। এরপর ডিনার সেটটি সেটসহ বিশেষ ধরনের সিরামিক সামগ্রী ও কাঁচের তৈরি বাসনেকোসন ভরে যায় প্রতিটি এলাকা। স্টিলের সামগ্রী যোগ হয়। এর মধ্যেই আশির দশকে সিরামিকের সঙ্গে পাল্লা দিতে নামে মেলামাইনের বাসন কোসন। রকমারী ও নজরকাড়া ডিজাইনে সিরামিক মেলামাইন ঘরে ঘরে প্রবেশ করে কাঁসাকে হটিয়ে দেয়। প্রজন্মের কাছে কাঁসার বাসন কোসন হয়ে পড়ে অচেনা। কলেভদ্রে কোন বাড়িতে কাঁসার জিনিস বের হলে প্রজন্মের কাঁছে তা হয়ে যায় এ্যান্টিকস। বাড়ির লোকজন বর্ণনা দেয়-এই থালায় বা এই বাটিতে পূর্বপুরুষ আহার করতেন। আজও মধ্যবয়সী অনেকের ঘরের চিলে কোটায় অযতনে হয়ত পড়ে আছে সেদিনের কাঁসার কোন তৈজসপত্র। কাঁসার নির্বাসনে দেশের প্রায় এক লাখ কাঁসা শিল্পীর জীবন টিকে আছে কোন রকমে। একজন কাঁসা শিল্পী বললেন, থালা বাটি কলসি আর কেউ বানায় না। প্রদীপ মোমদানি চিলিমচি সৌন্দর্যবর্ধক কোন জিনিস কেউ বানিয়ে নেয়। কাসার জিনিস বানিয়ে তেমন লাভ নেই। দুইশ’ থেকে আড়াইশ’ টাকা কেজি দরে কাঁচামাল কিনে জিনিস বানিয়ে ২শ’ ৭০ থেকে তিনশ’ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে কতই বা লাভ হয়। কাঁসা এক ধরনের মেটাল। বিগলন ঢালাই প্রযুক্তির মাধ্যমে জিনিস বানাতে হয়। দরকার হয় বিশেষ ধরনের ছাঁচের। এগুলো এখন সহজে মেলে না। ভাস্কর্য তৈরি পদ্ধতিও আলাদা। মোম দিয়ে অবয়বের পর নকশা ও সুক্ষ্ম কারু কাজ করে দিতে হয় তিন স্তরের মাটির প্রলেপ। তারপর পুড়িয়ে মোম গলে মাটির ছাচে লেগে যায়। গলানো কাঁসা সেই ছাচে ঢুকিয়ে তৈরি হয় নকশা ভাস্কর্য। কাঁসার এমন নকশা ও তৈজসপত্র আজ সহজে মেলে না। খুঁজে বের করতে হয়। কেউ কিনতে গেলে তাকে চেয়ে দেখে। ঐতিহ্য ধরে রাখতে সৌখিন লোকজনই কাঁসা কেনে। তবু এভাবেই যত দিন টিকে থাকে....।