মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৩, ৯ শ্রাবণ ১৪২০
এ সরকারের আমলে ফিরছেন না তারেক
উপযুক্ত পরিবেশ ফিরে এলেই আসবেন
শরীফুল ইসলাম ॥ এখনই দেশে আসছেন না বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। উপযুক্ত পরিবেশ ফিরে এলেই তারেক রহমানকে লন্ডন থেকে দেশে ফিরিয়ে আনবে বিএনপি। তবে বর্তমান সরকারের আমলে তারেক রহমান দেশে ফিরছেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
জানা যায়, তারেক রহমান এখনও পুরোপুরি সুস্থ না হলেও তিনি হাঁটাচলাসহ স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন সভা-সমাবেশেও বক্তব্য রাখছেন। এ ছাড়া লন্ডনে থেকেই নিয়মিত দলের কর্মকা-সহ দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিবেশের খোঁজখবর রাখছেন। সেই সঙ্গে নিজের নামে থাকা প্রায় দেড় ডজন মামলাও আইনজীবীদের মাধ্যমে মোকাবেলা করছেন।
তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে গত কয়েক বছর ধরে উদ্যোগ নিয়ে আবার থেমে গেছে বিএনপি। মূলত মামলাজনিত কারণে তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা আপাতত থেমে রয়েছে বলে জানা গেছে। সূত্রমতে, যখনই বিএনপির পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয় তখনই সরকারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো নাড়াচাড়া দেয়া হয়। তাই গ্রেফতার এড়াতে আপাতত তারেক রহমানকে দেশে না আনার কৌশল নিয়েছে বিএনপি।
জানা যায়, বিএনপি হাইকমান্ড সম্প্রতি এ ব্যাপারে তারেক রহমানের মতামত নিয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে লন্ডন পাঠিয়ে তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসাসহ দলের সার্বিক কর্মকা- নিয়ে তারেক রহমানের মতামত নেয়া হয়েছে। তারেক রহমান প্রথমে কিছুটা আগ্রহ দেখালেও তাঁর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও মেয়ে জায়মা রহমানের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত আপাতত দেশে না ফেরার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে উপযুক্ত পরিবেশ ফিরে এলে যত শীঘ্র সম্ভব তিনি দেশে ফিরে আসার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি লন্ডন থেকে ফিরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছেন, শীঘ্রই তারেক রহমান দেশে ফিরে আসবেন। পাশাপাশি তিনি এও বলেছেন, তারেক রহমান অসুস্থ। এখনও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হননি। পুরোপুরি সুস্থ হলেই তিনি দেশে ফিরে আসবেন। মির্জা ফখরুলের এ বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় তারেক রহমান আপাতত দেশে ফিরে আসছেন না।
এদিকে তারেক রহমান কবে দেশে ফিরবেন, তাঁর অপেক্ষায় উদগ্রীব হয়ে আছেন হাওয়া ভবন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তারা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে তারেক রহমানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন বলে জানা গেছে। তবে হাওয়া ভবনের কয়েক বিতর্কিত কর্মকর্তাকে তারেক রহমান তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ না রাখতে বলেছেন। একসময় তারেক রহমানের নাম ভাঙ্গিয়ে টাকার পাহাড় গড়া মতলববাজ লোকেরা তবুও বিভিন্ন কৌশলে তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। উদ্দেশ্য একটাই আবারও ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা যায় কি না।
সূত্র জানায়, তারেক রহমান দেশে ফিরে এলে এবার আর হাওয়া ভবনে আগে তার সঙ্গে কাজ করা কোন কর্মকর্তা, কর্মচারী ও বন্ধুকে আর পাশে রাখবেন না। তাই দেশে ফেরার আগেই কিছু ক্লিন ইমেজের লোককে প্রাথমিকভাবে মনোনীত করে রেখেছেন। এর মধ্যে একাধিক সাংবাদিকও রয়েছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে মাঝে মধ্যে তারেক রহমান তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগও রাখছেন।
এদিকে তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বিএনপির ভেতরে দুটি ধারা সৃষ্টি হয়েছে। একটি ধারা চাচ্ছেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে দলীয় কর্মকা-ে ফ্রন্ট লাইনে দাঁড় করাতে। আর অপর ধারাটি চাচ্ছেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পরিবেশ অনুকূলে এলে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে। তবে খালেদা জিয়া নিজেও এখনই তারেক রহমানকে দেশে না এনে উপযুক্ত পরিবেশ ফিরে এলে আনার পক্ষে।
অতীতে তারেক রহমানের কারণে সুবিধাভোগী দলের তরুণ নেতাদের একটি অংশ চাচ্ছেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে। তাদের মতে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তারেক রহমানকে আগেভাগে দেশে ফিরিয়ে এনে দলের কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করা গেলে নির্বাচনের প্রস্তুতি ভাল হবে। এ ছাড়া তারেক রহমান সারাদেশে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে অতীতে কাজ করেছেন। তাই আগামী নির্বাচনে কোন আসনে কাকে মনোনয়ন দিলে দলের জন্য মঙ্গল হবে তা তারেক রহমানের চেয়ে বেশি কেউ বলতে পারবেন না। তাদের মতে, ২০০১ সালে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনার প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করে তারেক রহমান ব্যাপক সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। সেবার দুই-তৃতীয়াংশ আসন জিতে সরকার গঠন করে বিএনপি। তাই এবারের নির্বাচনের আগেও তারেক রহমানকে অগোছালো বিএনপির জন্য বড় বেশি প্রয়োজন। এ ছাড়া তারেক রহমান দেশে ফিরে এলে ওইসব তরুণ নেতার মনোনয়নও নিশ্চিত হবে।
অপরদিকে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে একটি অংশ চাচ্ছেন তাড়াহুড়া না করে ধীরে সুস্থে তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে। তাদের মতে এখনই দেশে ফিরিয়ে আনলে একদিকে তারেক রহমান সরকারের রোষানলে পড়বেন। অপরদিকে বিএনপি আমলের বিভিন্ন কর্মকা- নিয়ে যেসব মহল কঠোর সমালোচনা করেছেন তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠবেন। এর ফলে আগামী নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে। বিএনপির এই সিনিয়র নেতারা মনে করছেন, মোটামুটি সুষ্ঠু নির্বাচন হলে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার মতো আসন পাবে। আর ক্ষমতায় যেতে পারলে সব মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে আবার দলীয় কর্মকা-ে সরাসরি সম্পৃক্ত করা সমীচীন হবে।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ৭ মার্চ গভীর রাতে ক্যান্টনমেন্টের মঈনুল রোডের বাসা থেকে যৌথবাহিনী তারেক রহমানকে গ্রেফতার করে। বিএনপির অভিযোগ, গ্রেফতার করে তারেক রহমানের ওপর নির্যাতন চালানো হয় এবং তাঁর মেরুদ-ের হাড় ভেঙ্গে দেয়া হয়। দেড় বছর কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কারাগার থেকে মুক্তি পান তারেক রহমান। মুক্তির পর কিছুদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। এক বছর কারাভোগের পর ১১ সেপ্টেম্বর তাঁর মা বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কারামুক্ত হয়ে হাসপাতালে দেখতে যান তারেক রহমানকে। সেদিনই হাসপাতাল থেকে সরাসরি বিমানবন্দরে যান তারেক রহমান। সেখান থেকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন চলে যান তিনি। এর পর থেকে তিনি সপরিবারে লন্ডনেই অবস্থান করছেন। তিনি লন্ডনে থাকলেও বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীর সঙ্গে নিয়মিতই যোগাযোগ হয়। কেউ কেউ লন্ডনে গিয়ে সরাসরি তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাত করে করে দলের ব্যাপারে পরামর্শ নিয়ে আসেন।
এ বছর লন্ডনে কয়েকটি দলীয় সভা ও তার আগে সৌদি আরবে ওমরাহ হজ করতে গিয়ে দলীয় এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন তারেক রহমান। এর পর থেকে তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। গত ২৬ মে মানি লন্ডারিং মামলায় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, তারেক রহমানকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। অপরদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ সরকার প্রমাণ করতে না পারলেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, তারেক রহমান এখনই দেশে ফিরে আসছেন না। কারণ এখনও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি। তিনি যখন পুরোপুরি সুস্থ হবেন তখনই দেশে ফিরে আসবেন এবং দলীয় কর্মকা-ে অংশ নেবেন। তারেক রহমান দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন। তাই দেশে ফিরে আসলে তাঁকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে।