মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৩, ৯ শ্রাবণ ১৪২০
বেআইনীভাবে নামজারি, হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা
রাজধানীতে বেপরোয়া ভূমি সহকারী কমিশনাররা, মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তাকেও পাত্তা দেন না
তপন বিশ্বাস ॥ বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন রাজধানী ঢাকা শহরে ভূমি সহকারী কমিশনাররা (এসি ল্যান্ড)। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বেআইনীভাবে নামজারি করে এরা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এমনকি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকেও তাঁরা পাত্তা দেন না। নামে মিল থাকায় এক এসি ল্যান্ড নিজেকে ভূমিমন্ত্রীর পুত্রের মিতা (বন্ধু) বলে পরিচয় দেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার এসি ল্যান্ড ভূমিদস্যুদের সঙ্গে আঁতাত করে ভুয়া দলিল দেখেও নামজারি করছেন। এ সকল ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে নিজে বাঁচতে গোপনে নামজারি বাতিলও করা হচ্ছে। মূলত নামজারি দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়ার কৌশল হিসেবেও এই পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে। জানা গেছে, রাজধানীর উত্তরখান মৌজায় ২২৩০৪ নং খতিয়ানের ৩৮৫৩৩, ৩৮৫৪১, ৩৮৫৪৭, ৪১৭৫৮ নং দাগের মোট ৩৫ শতাংশ অকৃষি জমি নামজারি করা হয়েছে। সম্প্রতি করা এই নামজারির বিষয়টি অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে ভুয়া দলিলের ওপর ভিত্তি করে এই নামজারি করা হয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে ক্যান্টনমেন্ট এলাকার এসি ল্যান্ড সারোয়ার আহমেদ সালেহীনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কেউ কেউ ভুয়া দলিল নিয়ে নামজারি করতে আসে। জানতে পারলে আমরা আটকে দেই। তিনি বলেন, আমরা সরকারের স্বার্থ এবং ব্যক্তিস্বার্থ দুটিই বিবেচনা করে নামজারি সম্পন্ন করি।
ভুয়া দলিল কিনা তা পরীক্ষার জন্য কি উদ্যোগ নেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডিজিটাল সিস্টেম না থাকায় জাল দলিল চিহ্নিত করা কঠিন। যে কারণে কোন কোন ক্ষেত্রে ভুল হতে পারে। কিন্তু জানতে পারলে পরে এই নামজারি বাতিল করি। ভূমিমন্ত্রীর পুত্রের নাম সালেহীন। তাঁর সঙ্গে আপনার কোন বন্ধুত্ব আছে কিনা জানতে চাইলে এর সঠিক কোন জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, এর বিচার আপনাদের ওপর ছেড়ে দিলাম।
একই চিত্র রাজধানীর বিভিন্ন এসি ল্যান্ড অফিসগুলোতে। কাঁটাবন, কোতোয়ালি, তেজগাঁসহ বিভিন্ন সার্কেলে ঘুষের রেট নির্ধারিত করা রয়েছে। নির্ধারিত রেট দিতে না পারলে তার কাজ হয় না। এই অফিসগুলোতে ঘুষের টাকা গুনে নেয়া হয়। কাগজপত্র সঠিক থাকলেও নানা সমস্যা সৃষ্টি করে আটকে দেয়া হয়। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে ঘুষ দিয়ে কাজ সারতে হয়।
বিভিন্ন অফিসে নামজারির ক্ষেত্রে সাধারণ নামজারির জন্য এসিল্যান্ডকে দিতে হয় ১ হাজার ৫শ’ টাকা। পার্ট ভিপি হলে ৭ হাজার টাকা, পার্ট খাস হলে ১২ হাজার টাকা এবং এলএ সম্পত্তি হলে ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এছাড়াও লেখক ৫০ টাকা, অফিস খরচ ৫ টাকা, এসি ল্যান্ডকে ৫শ’ টাকা এবং সরকারী ফি ২৪৫ টাকা মিলে মোট আরও ৮শ’ টাকা পরিশোধ করতে হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, ডিসি অফিসের এক কর্মকর্তাকে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের উপঢৌকন দিতে হয়। প্রতিটি সার্কেল থেকে এই উপঢৌকন পাঠাতে হয়। তাতে আমাদেরও কিছু এদিক-ওদিক করতে হয়। এ ব্যাপারে এডিসি রেভিনিউ মনোজ কুমার রায়ের কাছে জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে জনকণ্ঠকে বলেন, আপনারা কি শুধু নেগেটিভটাই জানেন? আমাদের পজেটিভ কিছু কি জানেন না? তবে তিনি নিজে বা জেলা প্রশাসক অফিস কোন উপঢৌকন নেয় কিনা সে ব্যাপারে কিছুই বলেননি।
এসি ল্যান্ডের কাছে অসহায় দেশের সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষতো দূরের কথা, অনেক পদস্থ কর্মকর্তাও সেখানে গিয়ে রীতিমতো হয়রানির শিকার হয়ে ফিরে আসেন। অনেক আমলাও হয়রানির শিকার হন এই জুনিয়র কর্মকর্তার কাছে। এমনকি ভূমি মন্ত্রণালয়র সকল কর্মকর্তাকেও তাঁরা পাত্তা দেন না। শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের তাঁরা পাত্তা দেন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব কিছুদিন আগে জনকণ্ঠকে বলেন, আমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব। ওরা আমাকেও পাত্তা দেন না। আমার একটি কাজের জন্য পরে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা থেকে বলিয়ে কাজ করতে হয়েছে।