মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৩, ১১ বৈশাখ ১৪২০
নিঃসঙ্গ ক্যামেলিয়ার শাড়ি পরা হয়নি পহেলা বৈশাখে
ব্লগার বন্ধুকে মুক্ত করার লড়াই
মোরসালিন মিজান
দুই বন্ধুর গল্প। একজনের নাম সুব্রত শুভ। অন্যজন ক্যামেলিয়া। চমৎকার চলছিল তাঁদের। কিন্তু হঠাৎই ছন্দপতন। কিচ্ছুটি অনুমান করার আগে পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায় সুব্রত শুভকে। অপরাধ তিনি ব্লগার। মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করে লিখেছেন। কী লিখেছেন? কোথায় লিঙ্ক? হাজারটা প্রশ্ন। কোন উত্তর নেই। তবে সুব্রত ঠিকই জেলে। ক্যামেলিয়া বন্ধুহীন। নিঃসঙ্গ। এ অবস্থা মেনে নেয়া কষ্টকর। সীমাহীন বেদনার। তাই সংগ্রাম শুরু করেন ক্যামেলিয়া। ঢাকায় শুভর কেউ নেই। সুব্রতকে মুক্ত করার একলা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। জেলখানায়, আদালতে একলাটি ছুটছেন। ব্লগে, ফেসবুকে লিখছেন। তাঁর ছোটাছুটি দেখে, ফেসবুক স্ট্যাটাস পড়ে অনেকে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না।
প্রিয় বন্ধুর পরিচয় তুলে ধরে ক্যামেলিয়া লিখেছেন ‘সুব্রত শুভ এক অসহায় দেশপ্রেমিকের নাম, রাত-দিন যে দেশের জন্য লিখেছে। জামায়াত-শিবিরের প্রচার করা দর্শনের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার ছাত্র সে, প্রচ- বই পড়ার নেশা। মানুষের জন্য রাত-দিন দৌড়ে বেড়িয়েছে। কত দিন ফোন দিয়েছি রক্ত লাগবে। এই শুকনো পিচ্চি ছেলেটা রক্ত দেবার জন্য ছুটে এসেছে। গায়ে জ্বর নিয়ে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছে। অথচ আজ তার হাতে হাতকড়া। তাকে মিডিয়ার সামনে ল্যাপটপ চোরের মতো উপস্থাপন করা হয়েছে। সাত দিনের রিমান্ড দেয়া হয়েছে।’
শুভর গ্রেফতারের পর থেকে ক্যামেলিয়া প্রায় প্রতিদিন ছুটে যাচ্ছেন আদালতে, জেলখানায়। সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে ফেসবুকে তিনি লিখেছেন ‘কোর্টের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছি। সুব্রতকে দেখলাম এক নজর। কি বিধ্বস্ত লাগছে ওকে! ওর সেই চিরচেনা হাসি মুছে গেছে। বুঝতে পারছি ভাঙছি প্রতি মুহূর্তে। নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না, বিপ্লব ভাইয়ের (আটক হওয়া আরেক ব্লগার) স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম। টের পেলাম তিনিও কাঁদছেন। আমাদের সান্ত¡না দিতে এসে পারভেজ ভাইয়ের (আটক হওয়া ব্লগার) স্ত্রীও হাউ মাউ করে কেঁদে ফেললেন। তিনটা অসহায় মেয়ে কাঁদছেন। তাঁরা লড়ে যাচ্ছেন তাঁদের প্রিয় মানুষের জন্য, তাঁদের সহযোদ্ধাদের জন্য।’ জেলখানায় শুভর এক একটি দিন কত কষ্টে কাটছে, কী দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তিনি, সে বর্ণনাও পাওয়া যায় ক্যামেলিয়ার লেখায়। তিনি লেখেন ‘লম্বা লাইনে বিশ মিনিট অপেক্ষার পরে, হাতের স্টীলের থালায় এক খাবলা খিচুড়ি ছুড়ে দিল বাবুর্চি। বাসি-গন্ধ খিচুড়ি। মুখে দিতেই বমি পেল শুভর। পাশের খুনী আসামিটা খেয়াল করে খিকখিক করে হেসে উঠল, নোংরা একটা গালি দিয়ে বলল, বলগার হইছিস... নাস্তিক কুনহানকার।’ এমন পরিস্থিতিতে বন্ধুটির মনের অবস্থার কথা জানিয়ে তিনি লেখেন ‘শুভর চোখ ভিজে উঠছে। কান্না আসছে। প্রাণপণে আটকাবার চেষ্টা করছে ও। পারছে না। কিন্তু ওকে যে আজ পারতেই হবে। হারলে চলবে না। ও বুঝে গেছে দেশকে ভালবেসে ব্লগার হতে হলে ওকে আজ কাঁদলে চলবে না।’ হ্যাঁ, এভাবে শুভকে সাহস যুগিয়ে যাচ্ছেন ক্যামেলিয়া। প্রায় প্রতিদিনই খাবার নিয়ে যাচ্ছেন শুভর জন্য। একদিনের খাবার খাওয়ানোর ঘটনা তিনি বর্ণনা করেছেন এভাবে ‘বিরক্ত চোখে তাকালাম। বললাম, দ্যাখ, খাওয়া নিয়ে নখরা করবি না। চুপচাপ খেয়ে নে। আমার ঝাড়ি খেয়ে প্রতিবাদী গলাটা চুপসে গেল। বেশ বুঝতে পারছিলাম, জোর করে খাচ্ছে। একটুও মায়া হলো না আমার। এত শখ করে নান্নার বিরিয়ানি খাওয়াতে আনলাম, আর সে কিনা পুরোটা খেতে পারছে না! আবারও ধমক দিলাম, এবার সুবোধ বালকের মতো খেয়ে নিল।’
শুভর মায়ের দিকটাও সামলাতে হচ্ছে ক্যামেলিয়াকে। এ প্রসঙ্গে লিখেছেন ‘মোবাইলের ওপাশে একটা নারীকণ্ঠ অঝরে কাঁদছে। আমি অসহায় হয়ে শুনছি সে আর্তনাদ। কণ্ঠটি বার বার জানতে চাইছে, তার বোকা ছেলেটা ঠিক আছে তো? আমি নিরুত্তর। কী ভাবে বলি এই মাকে, তোমার ছেলেকে যখন শেষবার দেখেছি সে ঠিক মতো হাঁটতে পারে না। তার মলিন মুখে প্রচ- অভিমান। কি করে আমি শুভর মাকে বলি এই সব কথা। আমার অস্তিত্ব বার বার বলছিল পালাও, পালাও তুমি পারবে না এই মাকে জানাতে, মা তোমার ছেলে সেই সব বোকা বিপ্লবীদের দলে যারা যুগে যুগে বিনা দোষে শাস্তি ভোগ করেছে। আমি তাকে শুধু বলেছি, আপনি ভাববেন না ও ঠিকই ফিরে আসবে। আমরা ওকে ফিরিয়ে আনব।’
কারও কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এত শক্তি কোথায় পান এই তরুণী? সে উত্তরও খুঁজে পাওয়া যায় তার লেখায়। এ প্রসঙ্গে তাঁকে লেখা একটি চিঠির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এক অচেনা প্রবীণ তাঁকে মা সম্বোধন করে লিখেছেন ‘আমি একজন স্কুলশিক্ষক। আমার পুত্র মারফত আপনাকে এই চিঠি লিখছি। সংবাদপত্রে তিনজন ব্লগারের আটকাদেশ দেখে, ব্লগ বিষয়টি সম্বন্ধে জানবার জন্য কৌতূহলী হই। আমার ছেলের সহযোগিতায়, বর্তমানে কিছুটা জ্ঞান আহরণ করেছি। সুব্রতকে টেলিভিশনের পর্দায় দেখে চোখের অশ্রু সংবরণ করবার সাধ্য আমার ছিল না। জানতে পারলাম সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র। আমি তার লেখা পড়েছি। সেখানে ইসলাম ধর্ম এবং আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ (স) সম্পর্কে কোন প্রকার কটূক্তি আমার দৃষ্টিগোচর হয় নাই। আমি গত পাঁচ দিন আপনার লেখা খুবই আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। আপনি নিশ্চই আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের একজন। মাগো আমি খুবই সামান্য জন। তবুও আপনার জন্য আমার প্রাণভরা দোয়া রয়েছে। ...আমার প্রভিডেন্ট ফান্ডে যে সামান্য কিছু অর্থ রয়েছে তা আমি আপনাকে দিতে চাই। এটা এক পিতার পক্ষ থেকে তার সাহসী কন্যার জন্য সামান্য উপহার। উত্তরে ক্যামেলিয়া বলেন ‘আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে এই অর্থ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছি। কিন্তু তার এই প্রচ- ভালবাসা আমাকে যে সাহস যুগিয়েছে তার তুলনা হয় না। এই পিতা আমার পাশে আছেন, আমার আর কিসের ভয়।’
বদলে যাওয়া ক্যামেলিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছেন তার নিজের মা-ও। সেই মা সম্পর্কে বলতে গিয়ে মেয়ে লিখেছেন ‘পড়ালেখা শেষ হয়নি, চাকরিবাকরি করি না। তার উপর ইদানীং কোর্টের অলিগলি চক্কর কাটতে কাটতে জুতার তলা খসে যাচ্ছে। এমন ভবঘুরে মেয়েকে কোন পরিবার সাপোর্ট দেবে না এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম। মা ভাত মেখে খাওয়াতে খাওয়াতে সারা দিনের আপডেট শোনেন। কখনও রাগে মুখ শক্ত করে ফেলেন, কখনও আশান্বিত হয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। সেমিস্টারটা মিস দিলাম। ভেবেছিলাম, ঝাড়ি খাব। মা খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন, শোন মা তোকে বকা দেয়া উচিত কিন্তু এই উচিত কাজটা করে তোকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে চাই না। তবে...।’ ক্যামেলিয়ার কষ্ট বাড়াতে চান না শুভ নিজেও। সে বিষয়টি স্পষ্ট করে ক্যামেলিয়া লিখেছেন ‘শুভটাও চরম পাজি, শেষবার কোর্ট যে যখন দেখা হলো, দুই মিনিট সময় পেয়েছিলাম কথা বলার। জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিছু লাগবে? জানে, আমার খরচ হবে। তাই তাড়াতাড়ি বলল, না। কিছুই লাগবে না। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল কিন্তু আমাকে একটা মলিন হাসি উপহার দিতে ভোলেনি। বিপ্লব মানেই রাস্তায় আন্দোলন মিছিল-মিটিং করা না।’
অনুমান করা যায়, দুই বন্ধু সবসময় একসঙ্গে থাকার চেষ্টা করেছেন। উৎসবে পার্বণে আর সবার মতো হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়িয়েছেন তারাও। তবে এই বৈশাখে পাশে ছিলেন না শুভ। তাই কষ্টে কেটেছে দিনটি। সেই অনুভূতির কথা জানিয়ে ক্যামেলিয়া লিখেছেন ‘আমার এক ছোট বোন আমাকে আজ দু’ ডজন লাল সাদা চুড়ি উপহার দিয়ে হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। বলল, আপু জানি তুমি ভাল নেই, তবুও চাই তুমি বৈশাখে আমাদের রঙে নিজেকে রাঙাবে। আমি ওকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলেছি, নারে পাগলী এখন না। স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠল, এই তো সেদিন ফাল্গুনে শাড়ি পড়েছিলাম, শুভটা চরম ফাজিল, খুব ক্ষ্যাপিয়ে ছিল আমাকে। ওর কান মলে দিতে চেয়েছি, দৌড়ে পালিয়েছে। এবারের বৈশাখে আমি শাড়ি পরব না, সকালে পান্তা খাব না, সবাইকে ম্যাসেজ পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জানাব না। সকালে উঠেই কাউকে ফোন করে বলব না, শুভ নববর্ষ। আমি সারাদিন ছুটে বেড়াব ওর নিরপরাধের দলিল খুঁজতে। ওর জন্য ন্যায় ছিনিয়ে আনতে। আমার পথ চলা হবে শুধুই শুভর জন্য। ও যে দিন ফিরবে সেদিন সবাইকে মেসেজ সেন্ড করব ‘শুভ নববর্ষ। আমার সহযোদ্ধা যতদিন না ফেরে, ততদিন আমার জীবন না হয় সাদা-কালোই থাক।’
হতাশাও মাঝে মধ্যে কাবু করে ফেলে ক্যামেলিয়াকে। সেই হতাশার কথা ফুটে ওঠে একটি স্ট্যাটাসে। তিনি লেখেন- ‘আজকাল খুব মনে হচ্ছে, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখব ফেসবুক বন্ধ। ইন্টারনেট কানেকশন নাই। মোবাইলে একটা সরকারী বার্তা- ইন্টারনেট একটা ইসলাম পরিপন্থী সেবা, তাই বাংলাদেশের মতো একটি ইসলামিক দেশে এই রকম অনৈতিক সেবা বন্ধ করে ইসলামকে হেফাজত করা হলো। আমি মন খারাপ করে রাস্তায় বের হব। দেখব রাস্তায় কোন ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে কানে হেডফোন লাগিয়ে ঘুরছে না। কোন মেয়ে কপালে লাল টিপ দেয়নি। কোন আন্টি তরকারি কিনছে না। চারদিক কেমন চুপচাপ। রাস্তায় ঢোলা পাঞ্জাবি আর টুপি পরা কিছু মানুষ, হিংস্র দৃষ্টিতে লক্ষ্য রাখছে কোথাও জোরে গান বাজছে কিনা, কোন ছেলেমেয়ে এক সঙ্গে হাঁটছে কিনা। সামনে পহেলা বৈশাখ, অথচ কোন কাপড়ের দোকানে লাল সাদা শাড়ি, ফতুয়া পাঞ্জাবি নেই, সব দোকানে কাল বোরখা আর সাদা পাঞ্জাবি ঝুলছে । শহীদ মিনার ভাস্কর্যগুলো ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। কেউ আর ‘ছবির হাট’ যায় না। থার্টি ফার্স্টে কেউ মেসেজ পাঠায় না। কার জন্মদিন পালন হয় না। কোন ছেলে তার প্রিয়াকে দেখে বলে না, তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ। আমি একা পথে বেরিয়েছি, পরনে সাদা ফতুয়া। জানি একটু পরে আমাকে ১০১ টা দোররা মারা হবে। আমার সাদা ফতুয়া রক্তে লাল হবে।’ পরের কথাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বেগম রোকেয়ার যোগ্য উত্তরসূরি লেখেন- ‘তবুও আমি বের হয়েছি। আজ আমি বের হব শুধু আমার বাঙালী অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। আমার প্রিয় সংস্কৃতির জন্য ।’
এভাবে আশা বাঁচিয়ে রেখেছেন ক্যামেলিয়া। লিখেছেন- ‘আমি স্বপ্ন দেখি, তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পরেছে পুরা অনলাইন পরিবারের ২৭ লাখ সদস্য। সবারই এক কথা, ব্লগারদের মুক্তি দাও, প্রশাসন ক্ষমা চাও। সবাই চিৎকার করে বলছে, আমরা প্রত্যেকে ব্লগার, আমরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিই, লাইক দিই, কার স্ট্যাটাস শেয়ার করি। তাই আমাদের ২৭ লাখকে গ্রেফতার কর, আমরা প্রস্তুত।