মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০১৩, ৩ বৈশাখ ১৪২০
আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটা, চড়ক ঘুরানো বিচিত্র আয়োজন
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী চড়ক পুজো
সঞ্জয় সরকার ॥ জ্বলন্ত অগ্নিকু-ের ওপর দিব্যি হেঁটে যাচ্ছেন জলজ্যান্ত মানুষ! লম্ফঝম্প করছেন ধারালো কাঁটাছুরি বা দায়ের ওপর। জিহ্বায় লোহার শলাকা ভেদ করে ঘুরছেন এদিক-সেদিক। কেউ কেউ আবার পিঠে গেঁথে দেয়া বড়শির সাহায্যে ২৫-৩০ ফুট উঁচু চড়কাকৃতির গাছে ঘুরছেন অনবরত। কেউ আবার রামদা-ত্রিশূল হাতে উদ্দাম নেচে চলেছেন শিব-কালীর বেশে। জিহ্বায় লোহার শলাকা ভেদ করে ঘুরছেন এদিক-সেদিক। দর্শনার্থীরা ঘিরে ধরছেন তাঁদের। দর্শনার্থীদের উদ্দেশ্যে ছিটিয়ে দিচ্ছেন খেলনা-বাতাসা-পানি। হাজার হাজার পুণ্যার্থী মুহুর্মুহু উলুধ্বনি আর ঢাক-কাঁসর-শাঁখ-সিঙ্গার শব্দে মুখরিত করে তুলছেন গোটা এলাকা।
‘চক্ষু চড়কগাছ’ হয়ে ওঠার মতো এমন ভয়ঙ্কর ও বিচিত্র আয়োজনের মধ্য দিয়েই প্রতিবছর গ্রামবাংলায় অনুষ্ঠিত হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রাচীন ধর্মীয় উৎসব ‘চড়ক পুজো’। সনাতন পঞ্জিকা অনুসারে চৈত্রসংক্রান্তিতে অর্থাৎ বছরের শেষদিনে এ পুজো অনুষ্ঠিত হয়। চড়ক পুজোর আনুষ্ঠানিকতার ধরন অন্যান্য পুজো-পার্বণের চেয়ে কিছুটা ব্যতিক্রম। এটি অনেকটা আদিম লোকাচারের সঙ্গে সাদৃশ্য। বহু প্রকারের দৈহিক যন্ত্রণা এ পূজার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বলে বিবেচনা করা হয়। চৈত্রের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হলেও পুজোর প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয় আরও দুই-তিন সপ্তাহ আগে থেকে। পুজোকে কেন্দ্র করে আয়োজকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। আর পুজোর দিনে চড়ক পুজোর মাঠ পরিণত হয় সকল ধর্মাবলম্বীর মহামিলনমেলায়।
চড়ক পূজা মূলত গ্রামীণ কৃষি দেবতা শিবের আবাহন। দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি, নিঃসন্তান দম্পতির সন্তান লাভ, মনের বাসনা পূরণসহ মহাদেবতা শিবের সন্তুষ্টি লাভই এ পুজোর উদ্দেশ্য। শিবের গাজন, গম্ভীরা পুজো, নীল পুজো বা হাজরা পুজোও চড়ক পুজোরই নামান্তর। সাধারণত তথাকথিত ‘নীচু বর্ণের’ হিন্দুরা চড়ক পুজোর আয়োজন করেন। উচ্চশ্রেণীর ব্রাহ্মণরা কখনও এ পুজোয় অংশ নেন না। তবে আধুনিককালে কিছু কিছু এলাকায় কথিত ‘উচ্চবর্ণের’ হিন্দুদেরও চড়ক পুজোর আয়োজনে শামিল হতে দেখা যায়। আয়োজনের দিকটি নির্দিষ্ট বর্ণ-সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এর আনন্দ-উৎসবে সকল বর্ণমতের হিন্দুরাই অংশগ্রহণ করেন। প্রতিবছর চড়ক পুজোয় হিন্দু-মুসলমানসহ সব ধর্ম-সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষদের ঢল নামে। চড়ক পুজোকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে চৈত্রসংক্রান্তির বারোয়ারি মেলা।
চড়ক পুজোর ইতিহাস ॥ কবে-কখন চড়ক পুজোর প্রচলন হয়Ñ এর সঠিক ইতিহাস জানা আজ দুঃসাধ্য। ‘লিঙ্গপুরাণ’, ‘বৃহদ্ধর্মপূরাণ’ এবং ‘ব্রহ্মবৈবর্তপূরাণ’-এর মতো আদি ধর্মগ্রন্থগুলোতে শিবারাধনার উল্লেখ থাকলেও চড়ক পুজোর উল্লেখ নেই। এমনকি গোবিন্দনন্দের ‘বর্ষক্রিয়াকৌমুদী’ এবং রঘুনন্দের ‘তিথিতত্ত্ব’-তেও চড়ক পুজোর কথা বলা হয়নি। অনেকের মতে, এটি বৌদ্ধধর্ম ঠাকুরের পুজোর বিবর্তিত রূপ। তবে অধিকাংশের ধারণাÑতান্ত্রিক সাধনা এবং লৌকিক বিশ্বাসকে ভিত্তি করেই এ পুজোর প্রচলন। কালের পরিক্রমায় আনুষ্ঠানিকতার ধরন এবং ব্যাপ্তি কিছুটা কমে এলেও বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও ঘটা করে চড়ক পুজোর আয়োজন করা হয়। ঝিনাইদহের মহেশপুরের ফতেপুরে চড়ক উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে কয়েক শ’ বছর ধরে। ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামে এক রাজা তার নীচুবর্ণের প্রজাকূলের জন্য এ ধর্মীয় উৎসব শুরু করেছিলেন। একইভাবে নেত্রকোনার ঋষিপাড়া, সাতপাই, সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর শিবমন্দির, শ্রীধরপুর কালীমন্দির, বাহাদুরপুর মন্দির, বরিশালের জুসখোলা, পাবনার পূর্ণানন্দ যোগাশ্রম, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, ঠাকুরগাঁও সদরের বুড়াশিব মন্দির, নাটোরের শংকরভাগ মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, বগুড়া, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা প্রভৃতি অঞ্চলে শত বছর ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে চড়ক পুজো। ব্রিটিশ সরকার ১৮৬৫ সালে চড়ক পুজোয় বড়শি ও জ্বলন্ত বাণ বিদ্ধ করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু আয়োজকরা তাদের ঐতিহ্য ও পুজোর গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসাবে আদিম বর্বরতার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ এসব দৈহিক যন্ত্রণার নানা কলা-কৌশল আজও টিকিয়ে রেখেছে।
চড়ক পুজোর নানা পর্ব ॥ বাংলাদেশে বর্তমানে যে চড়ক উৎসব অনুষ্ঠিত হয় তার বেশ কয়েকটি পর্ব রয়েছে। এক এক করে পর্বগুলো পালন করার মধ্য দিয়েই পুজোর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। মূল পুজো চৈত্রের শেষদিনে অনুষ্ঠিত হলেও প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয় সপ্তাহ দুই আগে থেকে। এসবের নেতৃত্ব দেন একজন গুরু সন্ন্যাসী। তাঁর সঙ্গে থাকেন আরেকজন ‘বালা’। চড়ক পূজার সূচনা হয় অধিবাসের মধ্য দিয়ে। এ পর্বে গ্রামের নবীন-প্রবীণরা মূল সন্ন্যাসীর কাছ থেকে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেন। সন্ন্যাসীরা পূজার দিন পর্যন্ত আতপচালের ভাত ও নিরামিষ খাবার খান। তাদের খাবার যোগাড় করতে হয় বাড়ি বাড়ি ‘মাঙন’ (মাগন) করে। চড়ক পুজোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে ‘পাট ¯œান’ বা ‘পাট নাচানি’। চড়কের দেব প্রতিকৃতির নাম ‘পাট’। কাঠের তৈরি ‘পাট’ দেখতে অনেকটা নৌকার আগার মতো। পাটের মধ্যে থাকে শিবলিঙ্গ। এটি সারা বছর মন্দিরে বা ঘরের কোন পবিত্র স্থানে রাখা থাকে। পুজোর সাতদিন আগে তা নামানো হয়। এরপর রাতে গুরু-সন্ন্যাসী ¯œানের উদ্দেশ্যে সেটি নদীতে নিয়ে যান। এ সময় আয়োজকরা সঙ সেজে অর্থাৎ ভূত-প্রেত- দৈত্য-দানবের মুখোশ পরে সন্ন্যাসীকে বাধা দেয়।
সন্ন্যাসী তাঁর তান্ত্রিক ক্ষমতায় সব বাধা উপেক্ষা করে পাট ¯œান করিয়ে তাতে তেল-সিঁদুর-চন্দন মেখে দেন। এ সময় মুহুর্মুহু ঢাক, কাঁসর-ঘণ্টা-সিঙ্গা বাজানো হয়। পাট ¯œানের পরবর্তী পর্বটির নাম ‘পাট নাচানি’। সন্ন্যাসীরা পাট মাথায় নিয়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি যান। তখন পালা গান পরিবেশন করেন। সন্ন্যাসীরা কালী, শিব প্রভৃতি রূপ ধারণ করে ঢাকের তালে তালে পরিবেশন করেন সঙ নৃত্য। কেউ কেউ ধারালো রামদার ওপর খালি পায়ে লাফঝাঁপ করে অথবা অন্যান্য উপায়ে ক্রীড়ানৈপুণ্য দেখান। বাড়ির কুলবধূরা পাটে তেল-সিঁদুর-চন্দনের ফোঁটা দিয়ে প্রণাম করেন। সবশেষে কিছু উপকরণ যেমনÑ নগদ টাকা, চাল, তেল, আলু, নারকেল, শসা প্রভৃতি দিয়ে তাদের বিদায় করেন। কোথাও কোথাও এসব উপঢৌকনকে বলা হয় ‘সিধা’। সন্ন্যাসীরা আসার সময় সিধার সামান্য অংশবিশেষ ফেরত দিয়ে আসেন। গৃহস্থবধূ পরিবারের মঙ্গল কামনায় তা ধানের গোলায় রেখে দেন। শহরাঞ্চলে চড়ক পুজার আগে সন্ন্যাসী দল বা আয়োজকদের শিব-পার্বতী বা কালী সেজে বিভিন্ন দোকান এবং বাসাবাড়িতে গিয়ে বাদ্য-বাজনাসহযোগে নেচে-গেয়ে পুজোর তহবিল এবং উপকরণ সংগ্রহ করতে দেখা যায়। কিছু এলাকায় অষ্টক গান পরিবেশনেরও রেওয়াজ আছে। চড়ক পুজার আর দুটি পর্ব হচ্ছেÑ চড়ক ঘুরানো এবং নীল পুজো। চড়ক ঘুরানো হয় সংক্রান্তিতে অর্থাৎ মূল পুজোর দিনে। আর নীল পুজা অনুষ্ঠিত হয় সংক্রান্তির রাতে।
চড়ক ঘুরানো ॥ ‘চড়ক ঘুরানো’ হচ্ছে চড়ক পুজার মূল আনুষ্ঠানিকতা এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব। ২৫-৩০ ফুট উঁচু বৈদ্যুতিক খুঁটির মতো সোজা একটি বৃক্ষখ-কেই বলা হয় ‘চড়কগাছ’। কদমগাছের মূল কা- দিয়ে তৈরি করা হয় এটি। সারা বছর গাছটি জলে ডুবানো থাকে। চৈত্রসংক্রান্তির দিনে তা ঢাকঢোল পিটিয়ে উঠানো হয়। এরপর বারোয়ারি তলায় বা মাঠে অনুষ্ঠিত হয় চড়ক পুজা। মূল সন্ন্যাসী পুজার পৌরহিত্য করেন। এ সময় অনেকে কবুতর, পাঁঠা বলি দেন। বিকেলের দিকে চড়কগাছটি সোজা করে মাটিতে পুঁতে দেয়া হয়। গাছের আগায় বেঁধে দেয়া হয় কাঠ ও দড়ি। সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করা সন্ন্যাসীরা তখন ¯œান করে নতুন ধুতি পরে মূল সন্ন্যাসীর কাছে এসে মন্ত্রপুত হন। তন্ত্র-মন্ত্র শেষ হলে তাদের মেরুদ-ের নিচে লোহার তৈরি বড় সাইজের একটি করে বড়শি গেঁথে দেয়া হয়। এরপর বড়শিটি বেঁধে দেয়া হয় গাছে ঝুলিয়ে রাখা দড়ির সঙ্গে। মহাদেবতা শিবের নাম নিয়ে বড়শি ও দড়িসহযোগে ঝুলে থাকা যন্ত্রণাবিদ্ধ মানুষগুলো চড়কার মতো গাছের চারপাশে ঘূর্ণন শুরু করেন। ঘূর্ণনের সময় নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনদের উদ্দেশ্যে ছিটিয়ে দেন বাতাসা, ফল প্রভৃতি। নারীদের উলুধ্বনি আর ঢাক-কাঁসর-ঘণ্টা-সিঙ্গার শব্দে তখন সেখানে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমন আদিম উল্লাস দেখে আগন্তুকদের চক্ষু তখন সত্যি ‘চড়কগাছ’ হয়ে ওঠে। দীর্ঘক্ষণ চড়ক ঘূর্ণন শেষে তাদের গাছ থেকে নামিয়ে আনা হয়। বড়শি খুলে দেয়ার পর গুরু-সন্ন্যাসী একদলা মাটি নিয়ে তন্ত্র-মন্ত্র পড়ে তাদের পিঠের রক্তাক্ত ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেন। এতে রক্তপাত বন্ধ হয়।