মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ১৩ মার্চ ২০১৩, ২৯ ফাল্গুন ১৪১৯
আইসিটি ॥ সাক্ষী সুরক্ষা আইন না থাকায় অনেকেই আতঙ্কিত
কেউ কেউ দারুণ ক্ষুব্ধ সরকারের প্রতি ॥ প্রভাব পড়তে পারে পরের মামলাগুলোয়
জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ ট্রাইব্যুনালের মামলায় সাক্ষী সুরক্ষা আইন না থাকায় যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যদানে অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের অনেক সাক্ষী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক ভর করেছে। আতঙ্কে কাটছে তাদের দিন। কেউ কেউ দারুণ ক্ষুব্ধ সরকারের ওপর।
সাবেক জামায়াত আমীর গোলাম আযমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী বিশিষ্ট সুরকার ইমতিয়াজ বুলবুলের ছোট ভাই মিরাজ খুন হওয়ার পর বিভিন্ন মামলার সাক্ষীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। নির্মূল কমিটি নেতা সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির প্রশ্ন তুলেছেন মিরাজ কী সরকারের উদাসীনতার বলি? তিনি বলেছেন,
আমরা দেখেছি, শুরু থেকেই সরকার এ ব্যাপারে উদাসীন। এর ফলে, আমি নিশ্চিত যে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য আমরা হারিয়েছি। আর যুদ্ধের সময় গণহত্যার মতো অপরাধ সংঘটনকারীদের বিচার আন্তর্জাতিক মানের হতে হলে, প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ঘটনাগুলো জানা খুবই দরকার। প্রতিটি মামলায় এভাবে সাক্ষ্য এলে কোনো অপরাধীর পক্ষে পার পেয়ে যাওয়া সহজ হবে না।
এতদিন ধরে আমরা যে কথাগুলো বলে এসেছি, সাক্ষী সুরক্ষা আইনের রক্ষাকবচের মাধ্যমে সাক্ষীদের কাছ থেকে যথাযথ সহযোগিতা আদায় করা, তা না হওয়ায় আমরা এখন এর মর্মান্তিক পরিণতিগুলো দেখতে পাচ্ছি। জামায়াতে ইসলামীর মতো ফ্যাসিস্ট দল যেকোন কিছুই করতে পারে। এরা যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালের জন্য এতদিন ধরে বাইরের বিশ্বে লাখ লাখ ডলার খরচ করে লবিস্ট নিয়োগ করেছে, তাদের দিয়ে বিচারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছে। এমনকি আমাদের এক বিচারকের সঙ্গে আন্তর্জাতিক এক বিশ্লেষকের স্কাইপে-কথোপকথন হ্যাক করার মতো ষড়যন্ত্রও হয়েছে। এ সবই ওরা করেছে বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য।
দেশি-বিদেশি নানা চক্রান্তের বাধা ঠেলে আমরা যখন কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর বিচারকাজ শেষ করতে পেরেছি, তখন এরা বাকি অপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া বানচাল করতে উঠেপড়ে লেগেছে। আমরা দেখেছি, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় দেওয়ার পর জামায়াত-শিবির সারাদেশে ফ্যাসিস্ট কায়দায় সহিংসতা চালাচ্ছে। তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে আমাদের যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এভাবে সারাদেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে তারা যাতে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া যায় এবং জনগণ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটায়। একাত্তরেও ওরা আমাদের জাতির বিরুদ্ধে এভাবেই সংগঠিত অপরাধ করেছে। তখন করেছে ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে রক্ষা করতে; আর এখন করছে যুদ্ধাপরাধের বিচার বাধাগ্রস্ত করার জন্য।
ইতোমধ্যেই সাঈদীর মামলায় ফাঁসির রায় হলেও কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলায় ফাঁসির রায় হয়নি। আমরা জানি, ট্রাইব্যুনালে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে এখন কাদের মোল্লার মামলাটির বিরুদ্ধে সরকার আপিল করেছে। ওদিকে আরও সাত শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। আগামীতে আরও ক’জন অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে।
এ সময় দেখা যাচ্ছে, বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ওপর নানাভাবে আঘাত আসছে। এর আগে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলার এক সাক্ষীকে হত্যা করা হয়েছে। সুরকার বুলবুলের ভাইকে হত্যার ঘটনাটি পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছে। কদিন আগে এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের ছেলে সুমন মাহবুবকে আঘাত করা হয়েছে। আমাদের কাছে খবর আছে যে, সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষ্য দেওয়া সংখ্যালঘুদের অনেককেই নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ফ্যাসিস্টরা তাদের বলছে যে, ‘তোদের সাক্ষ্যের কারণে সাঈদীর ফাঁসির রায় হয়েছে। তোদের ছেড়ে দেওয়া হবে না।’ এরকম বিপন্নতার মুখে পড়তে পারেন যেকোন সাক্ষী বা তার পরিবার।
বাংলানিউজ জানায়, ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট ও বেশিরভাগ মানুষের ধারণা, গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ায় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ওপর প্রতিশোধ নিতেই হত্যা করা হয়েছে তার ছোট ভাইকে। একই কারণে আরেক আসামি সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম জুনু প্রাণ দিয়েছেন বলেও দাবি তাদের।
যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ডা. মো. হাসানুজ্জামান বাংলানিউজকে বলেন, “একটার পর একটা ঘটনা শুনছি, আর আতঙ্কিত হচ্ছি। এত কিছুর পরেও আমাদের সুরক্ষা বলে কিছু নেই। প্রচণ্ড টেনশনে দিন কাটে। বলতে গেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় বাস করছি। সরকারের উচিত, আমাদের প্রতি নজর দেয়া। সরকার দ্রুত সাক্ষীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা না নিলে আরও লাশ দেখতে হতে পারে।”
যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে মামা বাহিনীর প্রধান শহীদুল হক মামা বলেন, ‘‘জীবন নিয়ে মারাত্মক ঝুঁকিতে আছি। আমি তো শুধু সাক্ষ্য দিয়েই দায়িত্ব শেষ মনে করিনি। শাহবাগের জাগ্রত তরুণদের অভিভাবক হিসেবে কাজ করছি। অনেক হুমকি পেয়েছি। সরকার সবকিছু জেনেও যদি কোন ব্যবস্থা না নেয় তাহলে কি বলব?’’
ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, “সরকার এখনও জেগে ঘুমাচ্ছে। আমার পক্ষে বা পুরো জাতির পক্ষে কি সরকারের এ ঘুম ভাঙ্গানো সম্ভব? সবকিছু জেনেও আমরা যারা সাক্ষ্য দিয়েছি, তাদের নিরাপত্তা না দেওয়ার পেছনে কি রহস্য আছে বুঝতে পারছি না।”
মামা আক্ষেপ করে বলেন, “বিবেকের তাড়নায় সম্পূর্ণ নিজের খরচে দেশে ফিরে সাক্ষ্য দিয়েছি। সেসব খরচ তো চাইনি, চেয়েছিলাম নিরাপত্তা। তাও দিতে পারেনি সরকার।”
এদেশে স্থায়ী থাকার কোনো জায়গা না থাকায় শুভাকাক্সক্সক্ষীদের কারও কারও বাসায় দিন কাটান জানিয়ে তিনি বলেন, “সর্বশক্তিমান বিধাতাই আমাকে সুরক্ষা দেবেন। সরকারের কাছে আর কিছু চাওয়ার নেই। সময় এলে উপযুক্ত জবাব আমি দেব।”
কামারুজ্জামানের মামলার আরেক সাক্ষী মুজিবুর রহমান পান্নু বাংলানিউজকে বলেন, “সাক্ষ্য দিয়েছি সত্য প্রমাণের জন্য। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আসলেই ভয় পাইয়ে দিয়েছে। এছাড়া কামারুজ্জামানের বাড়ির পাশে আমার বাড়ি হওয়ায় শুরু থেকেই অনেকবার হুমকি পেয়েছি আমি ও আমার পরিবার। তবু পিছপা হইনি আমি। সরকারের প্রতি অনুরোধ, আমাদের এ সাহসের প্রতিদান হিসেবে যেন আমি এবং আমার পরিবার জীবনের নিরাপত্তাটুক পাই। তা না হলে কখনো কেউ আর সত্য স্বীকার করবেন না।”
নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্নে আরও ক্ষুব্ধ অবিরামভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন করে যাওয়া একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির। সাকার বিরুদ্ধে সাক্ষী জুনু, গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সাক্ষী বুলবুলের ভাই মিরাজ, নারায়ণগঞ্জের গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তার ছেলে ত্বকীসহ অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে যুদ্ধাপরাধ মামলার কাজে জড়িত সকলের সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, মিরাজ নিহত হওয়ার আগের বেশ ক’টি হত্যাকাণ্ডকেও যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবি করে আন্দোলন ও মামলাগুলোর বিচার চলমান থাকার কারণে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। এদের মধ্যে রয়েছে, নারায়ণগঞ্জের ত্বকী হত্যা, রাজধানীর পল্লবীর পলাশনগরে স্থপতি ও ব্লগার রাজীব হায়দার শোভন হত্যা, গণজাগরণ মঞ্চের নিরাপত্তায় স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরা মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা রাজারবাগের ডিএমপি-২ এমআইসি আইটি শাখার কনস্টেবল বাদল মিয়া হত্যা।
এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ জানান, “যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। সরকার এ ব্যাপারে বিশেষভাবে যত্নশীল।”