মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ১৩ মার্চ ২০১৩, ২৯ ফাল্গুন ১৪১৯
হরতাল রাজনীতিতে ত্যক্তবিরক্ত মানুষ ক্ষোভে ফুঁসছে
চোরাগোপ্তা হামলার শেষ কোথায়- কে দেবে নিরাপত্তা
সমুদ্র হক ॥ হরতালে এতটাই ত্যক্ত-বিরক্ত সাধারণ মানুষ, যা নিয়ে তারা ক্ষোভে ফুঁসে আছে। আগ্নেয়গিরির লাভা যেভাবে বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে থাকে তেমনই হয়ে আছে মানুষ। সেই অবস্থা হলে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচীর কি হাল হবে তা নেতারা কি অনুভব করতে পারছেন! হরতালের আগের দিন সন্ধ্যায় চোরাগোপ্তা ককটেলবাজি বোমাবাজি করে গাড়ি ভেঙ্গে ও আগুন দিয়ে প্যানিক ছড়িয়ে এবং হরতালের দিনে একইভাবে পিকেটিং করে পুলিশের ওপর ককটেল নিক্ষেপ ইটপাটকেল ছুঁড়ে কতটা রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় তাঁরা দিচ্ছেন! এখন তো সাধারণ লোক একটুতেই ধরে নেয় মানুষের চরম দুর্দশা ও দুর্ভোগ বাড়াতে হরতালের ডাক দেয়া হয়। বর্তমানে এমনও বলা হয়- রাজনৈতিক দলের নেতারা নানাভাবে টাকার পাহাড় বানিয়ে নিয়েছেন এবং এখনও নিচ্ছেন। বিলাসবহুল বাড়িতে তাপানুকূল ঘরে থাকেন। কোটি টাকার প্রাডো, পাজেরো, মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ গাড়িতে চেপে ঘুরছেন। স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য আলাদা গাড়ি আছে। সন্তানদের দেশে ও দেশের বাইরে বহু টাকার বেতনের শিক্ষায়তনে লেখাপড়া করাচ্ছেন। সাধারণের পিঠে পা রেখে তারা আন্দোলনের নামে ডাক দিচ্ছেন একের পর এক হরতালের। কেউ ভাবছেন না কোমলমতি কিশোরদের জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা মাধ্যমিক এবং পরের ধাপে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার কথা। বাজারঘাট বন্ধ থাকায় কোন বাড়িতে কাঁচা বাজার, চাল- ডাল গেল কিনা, উপোস আছে কিনা এই খবর কি রাখেন বিজ্ঞ (!) রাজনীতিকরা। ব্যবসায়ীদের খবর কি রাখেন! গ্রামের কৃষকের পণ্য বিপণনে কি অবস্থা তা কি জানেন। যানবাহন বন্ধ থাকায় কোন জরুরী রোগী রেফার্ড করা ভাল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারল কিনা এই খবর কি রাখেন। সকলের তো আর এ্যামবুলেন্স ভাড়া করার ক্ষমতা নেই। তারপরও এ্যামবুলেন্সের ওপরও যখন ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে আগুন দেয়া হয় তখন জীবন বাঁচানোর উপায় থাকেই বা কোথায়! রাজনীতিকদের না হয় এয়ার এ্যামবুলেন্সে করে বিদেশের হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার অঢেল টাকা আছে (এই টাকা কোত্থেকে এলো সেই হিসাব কি নেয়া হয়।)। এই রাজনীতিকরা দাবিদাওয়া আদায়ে কথায় কথায় বলেন, ‘জনগণ মেনে নেবে না।’ কোন্্ সে জনগণ! সব রাজনৈতিক দলেরই একই হুঙ্কার। এই জনগণের জীবন ধারার কোন কথা তাঁরা ভাবেন! কোন একদিন সত্যিই সত্যিই জনগণ যদি ওই রাজনীতিকদেরই মেনে না নিয়ে বিশ্বের বরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ‘হিরক রাজার দেশে’ ছবির জনগণের মতো হয়ে দাঁড়ায় কি হবে তাহলে! রাজনীতিকরা কি সত্যিই ইতিহাস থেকে পাঠ নেন! না ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ‘ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না’ তাই লালন করেন! বর্তমানে দেশজুড়ে যে স্থবিরতার সৃষ্টি হয়েছে তা সরকারই বা কতটুকু জানে! প্রতিপাড়া-মহল্লায় প্রতিরোধ কমিটি গঠন করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে (সকল এলাকায় কি সেই পরিস্থিতি বিরাজ করছে!)। তারপরও না হয় কোনভাবে গঠন করা গেল। বাস্তবায়নে যে বাধা আসবে তা কিভাবে মোকাবেলা করা হবে সেই দিকনির্দেশনা কি আছে! পুলিশই বা কতটা সহযোগিতা করতে পারে যখন তারাই আক্রান্ত হয়। বগুড়ার উদাহরণ দেয়া যাক। কিছুদিন আগেও বগুড়ায় শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালিত হয়েছে। আবার হরতাল প্রতিহত করেছে প্রজন্মের জাগরণ মঞ্চ। ৩ মার্চের পর বগুড়ায় আর সেই অবস্থা নেই। সাধারণ মানুষ হরতালের বিরুদ্ধে ফুঁসে আছে ঠিকই তারপরও কিছু বলতে পারছে না। এর অন্যতম কারণ, এই সাধারণ মানুষ মাঠে নামলে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। যদিও পুলিশ প্রশাসন বলে সাধারণের নিরাপত্তা দিতেই তারা মাঠে আছে। তবে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই তারা ব্যস্ত থাকে। অবস্থা এমন দিকে গড়াচ্ছে যে, মাঠে কর্তব্যরত সাংবাদিকেরও হয়ত বুলেট প্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরে নামতে হবে লেখা থাকবে ‘প্রেস’ (ঢাকার মিডিয়াকর্মীদের এখনই হেলমেটে প্রেস লেখা দেখা যাচ্ছে)। সকাল হলেই সাধারণ মানুষ একে অপরকে প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা কি হচ্ছে এই দেশটাতে! এরপর কী!’ হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ নারীনির্যাতনসহ অন্য সব অপরাধের যেখানে বিচার হয় সেখানে যুদ্ধাপরাধ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হবে, বিচারের রায় হবে এবং রায় বাস্তবায়িত হবে এটাই স্বাভাবিক। সেই বিচার প্রক্রিয়াকে নিয়ে রাজনীতির কি অশুভ খেলায় মেতে উঠেছে রাজনীতিকরা। যার ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিককে, যারা এই রাজনীতির ধারপাশেও নেই। কথায় কথায় একের পর এক হরতাল ডেকে সম্পদের ক্ষতি করে কি অস্থিরতার মধ্যে ফেলে দেয়া হচ্ছে দেশকে। ঢাকার পল্টন এলাকায় সোমবার বিকালে লাইভ টেলিকাস্ট (সরাসরি সম্প্রচার) যাঁরা দেখেছেন তাঁদের বুঝতে কোন অসুবিধাই হয়নি কিভাবে পরিকল্পিত উপায়ে হরতাল দেয়ার জন্য ককটেলবাজি করা হলো। পুলিশের উপ কমিশনার মেহেদী হাসান মাঝে মধ্যেই ব্রিফ করে জানান কি হচ্ছে। এইদিন তাঁর ব্রিফেরও দরকার ছিল না। সাধারণ লোক প্রকাশ্যেই দেখতে পেয়েছে হরতাল ও অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য রাজনীতিকরা কিই না করতে পারে! হরতাল যেন রাজনীতিকদের কাছে মুড়িমুড়কি হয়ে গেছে। কথায় কথায় হরতাল। দেশের বড় দু’টি দলের মধ্যে লোকজন বিএনপিকে কাউন্ট করত। গত কিছুদিনের ঘটনায় বিশেষ করে জামায়াতের হরতালের সঙ্গে তারাও হরতাল জুড়ে দেয়ায় সাধারণের কি বুঝতে বাকি আছে সত্যিকার অর্থে কোন জনগণের জন্য তারা রাজনীতি করছে! আর যাই হোক সাধারণ মানুষকে ত্যক্ত-বিরক্তের মধ্যে ফেলে রাজনীতির সুফল আদায় করা যায় না। সাধারণ মানুষকে এখন আর এতটা বোকা ভাবা মোটেও ঠিক নয়। এটা সকল রাজনীতিকের জন্যই প্রযোজ্য। সাধারণ লোক এখনও অনেকটা সহ্য করে আছে। যে দিন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যাবে সেদিনের সুদূরপ্রসারী ভাবনা কি রাজনীতিকরা করেন! ইতিহাসের পাঠ নিয়ে বিশ্লেষণ করুন কি করবেন! তা না হলে অনেক কিছুর জন্য দায়ী থাকবেন।