মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ১৩ মার্চ ২০১৩, ২৯ ফাল্গুন ১৪১৯
বি’বাড়িয়ার সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মোবারককে জেলে পাঠানোর নির্দেশ
যুদ্ধাপরাধী বিচার
দুই আইনজীবীকে জরিমানা
স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগ নেতা হাজী মোঃ মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ (চার্জ) গঠন বিষয়ে শুনানির জন্য ৪ এপ্রিল দিন ধার্য করা হয়েছে। তার জামিন আবেদন খারিজ করে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। হরতালের দিন ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে গোলাম আযম ও আবদুল আলীমের দুই আইনজীবী ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত না হওয়ায় তাদের জরিমানা করা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২১তম সাক্ষী আবুর বশর জবানবন্দী প্রদান করেছেন। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১ ও ২ এ আদেশগুলো প্রদান করেছে।
অভিযোগ আমলে
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগ নেতা হাজী মোঃ মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে তাকে জেলহাজতে প্রেরণে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ প্রদান করেছে। ট্রাইব্যুনালে অপর দুসদস্য ছিলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। অভিযোগ (চার্জ) গঠন বিষয়ে শুনানির জন্য ৪ এপ্রিল তারিখ ধার্য করা হয়েছে।
আসামি পক্ষের আইনজীবী জামিনের আবেদন করেন। এ সময় ট্রাইব্যুনাল উভয় পক্ষের শুনানি শেষে হাজী মোবারকের জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেয়। ট্রাইব্যুনালে এ মামলা উত্থাপনের পর মোট ৫ দফায় তাকে জামিন দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। জামিনের আবেদন জানিয়ে এর পক্ষে ও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয়ার বিপক্ষে শুনানি করে তার আইনজীবী মহিবুর রহমান। জামিনের বিরোধিতা ও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয়ার পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউশন পক্ষের প্রসিকিউটর সাহিদুর রহমান।
তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক সানাউল হক সাংবাদিকদের বলেন, মোবারকের বিরুদ্ধে তদন্তকালে হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ, আটক ও নির্যাতনসহ ৫ ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে আখাউড়া থানাধীন টানমান্দাইল ও জাঙ্গাইল গ্রামে ৩৩ জনকে গণহত্যা, আনন্দময়ী কালীবাড়ি রাজাকার ক্যাম্পে আশু রঞ্জন দেবকে নির্যাতন, ছাতিয়ানা গ্রামের শহীদ আবদুল খালেককে হত্যা, শ্যামপুর গ্রামের ২জনকে অপহরণ করে ১ জনকে হত্যা এবং খরমপুর গ্রামের ১ জনকে আটক রেখে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
গো. আযম ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের পক্ষের আইনজীবীর যুক্তিতর্কের দিন থাকলেও হরতালের কারণ দেখিয়ে তারা ট্রাইব্যুনালে অনুপস্থিত ছিলেন। এ কারণে হরতালের দিন ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে গোলাম আযমের আইনজীবী ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত না থাকায় ১ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ট্রাইব্যুনাল। চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মঙ্গলবার এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ প্রদান করেছে।
মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমের শুরুতেই গোলাম আযমের পক্ষে জুনিয়র আইনজীবী সময় আবেদন করে বলেন, ব্যক্তিগত কারণে সিনিয়র আইনজীবী মিজানুল ইসলাম আসতে পারবেন না। তাই মামলার কার্যক্রমের মুলতবির আবেদন জানাচ্ছি। জুনিয়র আইনজীবী মিজানুর রহমানের ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণ দেখিয়ে যুক্তি উপস্থাপনের জন্য আজ পর্যন্ত সময়ের আবেদন করেন। ট্রাইব্যুনাল সময়ের আবেদন মঞ্জুর করার সময় তাকে ১ হাজার টাকা জরিমানা করে। জরিমানার টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারী কোষাগারে জমা দিয়ে তা ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারকে জানাতে বলেছে।
আলীম ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিএনপি নেতা আবদুল আলীমের আইনজীবী প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষীকে জেরার নির্ধারিত দিনে ট্রাইব্যুনালে না আসায় ফের জরিমানা করা হয়েছে। আলীমের আইনজীবী আবু ইউসুফ মোঃ খলিলুর রহমানকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ট্রাইব্যুনাল। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মঙ্গলবার এই আদেশ প্রদান করেছে। ট্রাইব্যুনালে অপর দুসদস্য ছিলেন বিচারপতি মোঃ মজিবুর রহমান মিয়া ও জেলাজজ মোঃ শাহিনুর ইসলাম।
জরিমানার টাকা বৃহস্পতিবারের মধ্যে পরিশোধের আদেশ দেয়া হয়েছে। অন্য আইনজীবী ব্যারিস্টার মুন্সী আহসান কবিরকে আগের ধার্য করা জরিমানার টাকা আজকের মধ্যে পরিশোধের আদেশ দেয়া হয়। তবে আরেক আইনজীবী এএইচএম আহসানুল হক হেনার অসুস্থতার কারণে তাকে মার্জনা করা হয়েছে।
জরিমানার টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারী কোষাগারে জমা দিয়ে তা ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারকে জানাতে বলেছে। এর আগেও গত ২৭ ফেব্রুয়ারি একই কারণে আলীমের আইনজীবীদের জরিমানা করে ট্রাইব্যুনাল। সে সময় এবং মঙ্গলবারও ট্রাইব্যুনালে হাজির না হওয়ার জন্য হরতালের কারণ দেখান আইনজীবীরা।
সাকা চৌধুরী ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রসিকিউশনের ২১তম সাক্ষী তাঁর জবানবন্দীতে বলেছেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর গুডস হিলের বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যাকা- ঘটানোর কথা শুনেছি। চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মঙ্গলবার এই তিনি জবানবন্দী প্রদান করেছেন। আসামি পক্ষের আইনজীবী কর্তৃক সাক্ষীর জেরা ১৮ মার্চ পর্যন্ত মুলতবি করেছে ট্রাইব্যুনাল।
২১তম সাক্ষী আবুল বশর (৬৫) তিনি তাঁর সাক্ষ্যে বলেন, ’৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করার সময় আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আমি ওই সময় চট্টগ্রাম ইস্পাত কারখানায় চাকরি করতাম। সাক্ষী বলেন, ওই দিন রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর লোকজন আমাদের ওপর আক্রমণ করে অনেক লোককে হত্যা করে। ’৭১-এর ১২ এপ্রিল পাকিস্তান বাহিনী কালুরঘাটসহ চট্টগ্রাম দখল করে নেয়। এরপর আমরা নিজেরা মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ তৈরি করি এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।
তিনি বলেন, ’৭১-এর ২৮ আগস্ট গোমদণ্ডি মেস কোয়ার্টারের রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করি। এ ঘটনায় আমাদের কমান্ডার ফজলু ওস্তাদ এবং রেজাউল করিম বেবি শহীদ হন এবং ওয়াজেদ নামে একজন আহত হন। এর একদিন পর সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানী আর্মি নিয়ে এসে আহত ওয়াজেদের মুখে থুথু দেন এবং তাঁকে গুডস হিলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আর তার খোঁজ পাওয়া যায় না। নিহত দুই ব্যক্তির লাশ কোথায় ফেলা হয়েছে তা আমার জানা নেই।
সাক্ষী বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজাকার কমান্ডার জাকেরের নিকট থেকে জানতে পারি আহত ওয়াজেদকে গুডস হিলে নিয়ে হত্যা করা হয়। ’৭১-এর জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে এখলাস নামে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে খোকার দোকানের সামনে থেকে রাজাকাররা ধরে গুডস হিলে নিয়ে যায়। এখলাসের পিতা গুডস হিল থেকে তাকে নিয়ে এসে পারিবারিক কবরে দাফন করে।’ এরপর সাক্ষী ডকে থাকা আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে শনাক্ত করেন। সাক্ষীর জেরা আগামী ১৮ মার্চ পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।