মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৩, ১৪ ফাল্গুন ১৪১৯
পুড়েছে হাজার হাজার বই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়, আর্থিক সহায়তা দাবি
অমর একুশে গ্রন্থমেলা
মোরসালিন মিজান ॥ গত শুক্রবারের কথা। ত্রিশ লাখ প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া জাতীয় পতাকা এদিন আক্রান্ত হয়েছে। একই দিন আক্রান্ত হয় ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিজড়িত শহীদ মিনার। আর তার পর পুড়িয়ে দেয়া হলো অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বাঙালীর প্রাণের মেলা রবিবার দাউ দাউ করে জ্বলেছে। ভস্মীভূত হয়েছে ২৪টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টল। হাজার হাজার বই পুড়ে ছাই হয়েছে। এমন হৃদয় বিদারক দৃশ্য আগে কখনও দেখেনি বাংলাদেশ। তাই অনেকে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। গভীর রাতে জ্বলে ওঠা আগুনের ভয়াবহতা বোঝা যায় দিনের আলোয়। ধীরেন্দ্রনাথ চত্বরটি যেন হাহাকার করছিল। স্টলের কোন চিহ্ন ছিল না এখানে। চকচকে মলাটের বইগুলো ছাই হয়ে উড়ছিল। আংশিক পোড়া বইগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছিল এখানে ওখানে। এই আগুনে পুড়েছে কবি টোকন ঠাকুরের তিনটি নতুন কাব্যগ্রন্থ। তাই আরও অনেকের মতো তিনিও ছিলেন বিষণ্ণ। প্রতিক্রিয়া জানিয়ে জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, বই পোড়েনি শুধু। যেন শরীর ঝলসে গেছে আমার। যারা পতাকা ছিঁড়েছে, শহীদ মিনার আক্রমণ করেছে এ কাজ তাদের।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের মুখের দিকে তাকানোর উপায় ছিল না এদিন। মন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে তাঁদের। প্রায় সকলের সঙ্গে কথা বলে পরিষ্কার হওয়া গেছে, এ আগুন পরিকল্পিত। এ আগুন আক্রোশের। অবশ্য কারা এ নাশকতা ঘটিয়েছে সে সম্পর্কে কেউ মুখ খুলতে চাননি। তবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন তাঁরা। এ জন্য সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদন করেছেন। এ প্রসঙ্গে প্রকাশক মাহবুব বলেন, আসলে যার পুড়েছে কেবল সেই বুঝবে। তবে আমরা পরাজয় মানতে চাই না। আমাদের ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। এ জন্য সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তা দাবি করেন তিনি। জয়তী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী পায়েল জনকণ্ঠকে বলেন, রাত নয়টার পর মেলা আর আমাদের থাকে না। সবকিছু দেখার দায়িত্ব থাকে বাংলা একাডেমীর। সুতরাং এটি তাদের দায়। এ বিষয়ে সরকারের দেয়া প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নেরও দাবি জানান তিনি।
একই দাবিতে বিকেলে মেলার বিক্রি পাঁচ মিনিট বন্ধ রেখে নীরবতা পালন করেন প্রকাশকরা। পরে মৌন মিছিল করে আগুনে পোড়া স্টলের সামনে যান প্রকাশকরা। সেখানে আয়োজিত সমাবেশ থেকে নিজেদের বিস্তারিত দাবি তুলে ধরেন প্রকাশকরা। তাঁদের দাবি প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, আমরা প্রকাশকদের জন্য সাধ্যমতো সব কিছু করব। ইতোমধ্যে তিনটি কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। কমিটিগুলোর প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানান তিনি। মেলায় এমন ঘটনা কী করে ঘটল, কারা ঘটাল? জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে এ ব্যাপারে বলা যাবে।
৮৭ নতুন বই ॥ অমর একুশে গ্রন্থমেলার ২৫তম দিনে সোমবার মেলায় নতুন বই এসেছে ৮৭টি। এগুলোর মধ্যে গল্প ১৪টি, উপন্যাস ১৩টি, প্রবন্ধ ৬টি, কবিতা ১৮টি, গবেষণা ৩টি, ছড়া ৫টি, শিশুতোষ ১টি, জীবনী ১টি, মুক্তিযুদ্ধ ২টি, নাটক ১টি, ইতিহাস ১, রম্য/ধাঁধা ১টি, অনুবাদ ২টি এবং অন্যান্য বিষয়ে ৮টি প্রকাশিত হয়েছে। মেলায় এসেছে জাতীয় জাদুঘরের চারটি নতুন প্রকাশনা। সম্প্রতি নতুন করে সাজানো জাদুঘরের চারটি গ্যালারির পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছে পুস্তিকাগুলোতে। ড. ফিরোজ মাহমুদ ব্যাখ্যা করেছেন ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম (১৭৫৭-১৯৪৭)’ ও ‘ভাষা আন্দোলন।’ আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন তুলে ধরেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘স্বাধীন বাংলাদেশ (১৯৭১-১৯৭৫)।’ জাতীয় জাদুঘরের স্টলে পুস্তিকাগুলো পাওয়া যাচ্ছে।
প্রবাসী লেখক পুরস্কার প্রদান ॥ বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে প্রদান করা হয় বাংলা একাডেমী প্রবাসী লেখক পুরস্কার ২০১২। কথাশিল্পী সালেহা চৌধুরী এবং ডা. মাসুদ আহমেদকে সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলা একাডেমী প্রবাসী লেখক পুরস্কার ২০১২ প্রদান করা হয়। পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদ্বয়ের হাতে পুরস্কারের চেক, ক্রেস্ট এবং সনদ তুলে দেন একাডেমীর সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, প্রবাসী লেখকগণ বাংলা সাহিত্যে নতুন নতুন মাত্রা যোগ করে চলেছেন। বাংলা একাডেমী প্রবর্তিত প্রবাসী লেখক পুরস্কার তাঁদের এই সৃজনকর্মকে প্রণোদনা যোগাবে। এ সময় মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, বাংলা একাডেমীর কার্যক্রমকে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নানা কর্মসূচী গৃহীত হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে প্রবর্তন করা হয়েছে প্রবাসী লেখক পুরস্কার যার মধ্য দিয়ে প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চা আরও বিস্তৃত হবে। পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক সালেহা চৌধুরী এবং ডা. মাসুদ আহমেদ বলেন, বাংলা একাডেমী প্রবাসী লেখক পুরস্কার প্রদান করে আমাদের সাহিত্যকর্মে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। এই পুরস্কার শুধু ব্যক্তি আমাদের নয় বরং প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার ধারাকে আরও বেগবান করবে।
পরে ছিল ‘চারুশিল্পের অগ্রপথিক ও কীর্তিমান শিল্পপুরুষ রশিদ চৌধুরী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি ও শিল্পসমালোচক রবিউল হুসাইন। আলোচনা করেন চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী, স্থপতি সামসুল ওয়ারেস এবং চিত্রসমালোচক মঈনুদ্দীন খালেদ। সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। প্রাবন্ধিক বলেন, বাংলাদেশের শিল্পকলা আন্দোলনে রশিদ চৌধুরী এক বিশিষ্ট নাম। ট্যাপেস্ট্রি শিল্পের মাধমে আমাদের শিল্প ভুবনে তিনি যোগ করেছেন ভিন্নতর মাত্রা। তিনি বলেন, দেশ-বিদেশে শিল্পভ্রমণ তাঁর শিল্পবোধকে বিস্তৃতি দিয়েছে কিন্তু শিল্পকর্মে সততই তিনি বাঙ্ময় করেছেন আপন স্বদেশের মুখ। আলোচকরা বলেন, রশিদ চৌধুরী ছিলেন বঙ্গজ আধুনিকতার সাধক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রামকেন্দ্রিক যে শিল্পকলা আন্দোলন তৈরি করেছিলেন তা মূলত আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বলয়কে ঋদ্ধ করেছে। তাঁরা বলেন, বাঙালীর ধর্মনিরপেক্ষÑলোকচেতনা রশিদ চৌধুরীর শিল্পকর্মে প্রাণ পেয়েছে। সভাপতির ভাষণে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, রশিদ চৌধুরী তাঁর শিল্পকর্ম উপস্থাপন করেছেন মূলত গভীর শিল্পচেতনা, গহনতাসঞ্চারী মনন এবং প্রগাঢ় দেশপ্রেমের প্রতীকে।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে ‘শাপলাকলির আসর।’ একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন মালবিকা দাশ, শিমু দে, আবদুল আলিম, মাহবুবা রহমান, ইফফাত আরা নার্গিস, মঙ্গল চন্দ্র ম-ল, দীপা চৌধুরী ও মোঃ মুরাদ হোসেন বাদল।