মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৩, ২২ মাঘ ১৪১৯
নারী নির্যাতনকারীদের দ্রুত বিচার আইনে বিচারের দাবি
স্টাফ রিপোর্টার ॥ পারিবারিক সহিংসতা ও নারী নির্যাতন করা মানবতাবিরোধী অপরাধ। এ অপরাধীদের দ্রুত বিচার আইনে বিচারের দাবি জানিয়েছে নারী সংগঠন ‘আমরাই পারি।’ অপরদিকে রাজধানীর হাজারীবাগের স্কুলছাত্রী তাসনীম রহমান করবী হত্যাকা-ের মামলাটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা হিসেবে তালিকাভুক্তির দাবি জানিয়েছে পেশাজীবী নারী সমাজ।
রবিবার রাজধানীর স্পেক্ট্রা কনভেনশন সেন্টারে নারী নির্যাতন বন্ধে অভিনব উদ্যোগ বিষয়ক ‘আমরাই পারি’ নামক সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনাসভায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, সহিংসতা এমন একটি অপরাধ যা মনুষত্ব বিকশিত করার পথগুলোকে বাধাগ্রস্ত করে। আর পারিবারিক নারী সহিংসতা মানবতাবিরোধী কাজ। যা সরাসরি অপরাধ। গৃহ নির্যাতনের প্রভাব শুধু নারীর প্রতি নয় সমস্ত পরিবারের উপরই পড়ে। একে অপরের মধ্যে সহযোগিতামূলক ভাল ব্যবহারের মাধ্যমেই নারী নির্যাতন রোধ করা সম্ভব। আমাদের সঠিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে তা রোধ করতে হবে।
সুলতানা কামাল আরও বলেন, নারী আন্দোলন কোন সাধারণ আন্দোলন নয়। এটি হচ্ছে নারীর নিরাপত্তা রক্ষার অধিকার। তাই সবার এতে এগিয়ে আসা উচিত। সারাবিশ্বের মতো আমাদের দেশেও নারীরা ধর্ষিত হচ্ছেন। ধর্ষণ রোধে পুরুষদেরও চিন্তা করতে হবে। আমাদের ভাবতে হবে কিভাবে ধর্ষণ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়। আজ পর্যন্ত কোন মন্ত্রণালয় থেকে পারিবারিক সহিংসতারোধে কার্যকর কোন আইন প্রণয়ন করা হয়নি। এ ছাড়া সাক্ষীদের নিরাপত্তার কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সরকারের উচিত ধর্ষণের হাত থেকে নারীদের রক্ষায় আইন প্রণয়ন ও সর্বোচ্চ প্রয়োগ করা। আর যদি তা না করা হয় এর দায়ভার রাষ্ট্রের উপর পড়বে। পুলিশের মাধ্যমে দেয়া তদন্ত রিপোর্ট যেন দুর্বল না হয় এবং মামলার ট্রায়ালে গিয়ে যেন টেকে তাও দেখতে হবে। সরকারকে প্রশাসনের কোথায় গাফলতি আছে তা খুঁজে বের করতে হবে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালীরা যার যতটুকু শক্তি আছে তা দিয়েই আইনের উর্ধে চলে যায়। প্রভাব নয় সবকিছুকে সিস্টেমে নিয়ে আসতে হবে। নারী নির্যাতনের বিষয়টি শুধু সম্ভ্রমহানি নয় একে নারীর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন বলে বিবেচিত করতে হবে।
বর্তমানে নারী নির্যাতন রোধে নারীদের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষরাও এগিয়ে আসছে এবং আরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। সবার সচেতনতার মাধ্যমেই কেবল আমরা নারী নির্য়াতন রোধ করা শুরু করতে পারি।
তিনি আরও বলেন, অনেকেই বলেন নারী নির্যাতন হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। কথাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। এটা আগে থেকেই ছিল কিন্তু এতদিন পর নারীরা তাদের নীরবতা ভেঙ্গে দিয়ে জেগে উঠেছে। আগে অভিযোগ না করলেও এখন তারা অভিযোগ দিচ্ছে। নারী নির্যাতন রোধে আমাদের প্রতিদিনের আন্দোলনের সঙ্গে এটিকে যোগ করতে হবে। ফতোয়াবাজদের চিহ্নিত করতে হবে। নারী নির্য়াতনের মামলায় আসামির পক্ষে যেসব আইনজীবী লড়ছেন তাদের মন মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। নারীদের উদ্দেশ করে সুলতানা কামাল বলেন, সংসদ সদস্যগণ ভোট চাইতে গেলে তাদের বলবেন কার্যকরভাবে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ না করলে আমরা আপনাদের ভোট দেব না। নারী নির্যাতন করে যাতে কেউ পার না পেতে পারে ‘উই কেন’ এর উচিত তার জন্য চেষ্টা করা।
উল্লেখ্য, আমরাই পারি সংগঠনটি বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৫টি দেশে পরিচালিত একটি গ্লোবাল ক্যাম্পেইন। ২০০৪ সাল থেকে সারাদেশের ৫৫টি জেলার ৪৭২টি উপজেলায় ১৬ হাজার ৬৬৬টি গ্রামে পারিবারিক নির্যাতন বন্ধে মানসিকতা ও আচরণ পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন নরওয়ের রাষ্ট্রদূত র‌্যাগনে বার্তে লান্ড, নেদারল্যান্ডসের এসআরএইচআর এ্যান্ড এডুকেশন বিভাগের ফার্স্ট সেক্রেটারি ইলা দে ভোগড, অক্সফাম জিবি এর কো-চেয়ারম্যান এমবি আকতার, আমরাই পারি-এর জাতীয় সমন্বয়ক জিনাত আরা হক।
অপরদিকে রাজধানীর হাজারীবাগের স্কুলছাত্রী তাসনীম রহমান করবী হত্যাকা-ের মামলাটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা হিসেবে তালিকাভুক্তির দাবি জানিয়েছে পেশাজীবী নারী সমাজ। আইনজীবী দম্পতি আফরোজা ফারহানা আহমেদ ও এসএম মিজানুর রহমানের মেয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী করবীকে গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর হাজারীবাগের বাসায় নিজ কক্ষে গলা কেটে হত্যা করা হয়।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি মাহফুজা খানম বলেন, এই ঘটনার পর হাজারীবাগ থানা পুলিশ তিন আসামিকে গ্রেফতার করলেও তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় মামলাটির সুষ্ঠু ও দ্রুত তদন্তের স্বার্থে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) প্রেরণ করে। পরবর্তীকালে গোয়েন্দা বিভাগ আরও তিন আসামিকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জেলহাজতে প্রেরণ করে।
মাহফুজা খানম অভিযোগ করেন, হত্যাকা-ের পর দীর্ঘ চার মাস পেরিয়ে গেলেও ঘটনাটির সঠিক তদন্ত ও সুরাহা হয়নি। তিনি শীঘ্রই এই হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে দ্রুত বিচারের সম্মুখীন করতে মামলাটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা হিসেবে তালিকাভুক্তির দাবি জানান। চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা হিসেবে তালিকাভুক্তির দাবিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেয়া হবে বলেও জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নিহত করবীর মা আফরোজা ফারহানা আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, এই মামলাটির তেমন কোন মনিটরিং নেই। আমি মা হিসেবে এর বিচার দেখতে চাই। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন করবীর বাবা এ্যাডভোকেট এসএম মিজানুর রহমান।