মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১২, ৫ পৌষ ১৪১৯
বিবেকের তাড়নায় বাবা বাংলাদেশের পক্ষে কলম ধরেছিলেন ॥ এষা দে
মোরসালিন মিজান ॥ একাত্তরে বাংলাদেশের বন্ধু ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক কলামিস্ট বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে এষা দে বলেছেন, তাঁর বাবা বিবেকের তাড়নায় বাংলাদেশের পক্ষে কলম ধরেছিলেন। একাত্তরে যেসব বিষয় গণমাধ্যমে নিয়মিত আসত সেগুলোর বাইরে গিয়ে নতুন লেখালেখির সূচনা করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারত সরকারের নীতি কী হওয়া উচিত তা তিনি যুক্তিতর্ক দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতি দেয়া ও সামরিক সহায়তা প্রদানের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন।
কলকাতার বিখ্যাত দৈনিক যুগান্তরের এই সম্পাদককে সম্প্রতি সম্মাননা জানায় বাংলাদেশ সরকার। বাবার পক্ষে বাংলাদেশ সম্মাননা ক্রেস্ট নিতে বাংলাদেশে এসেছিলেন মেয়ে ও ভারতীয় লেখিকা এষা দে। সে সময় তাঁর হোটেল কক্ষে জনকণ্ঠকে দেয়া একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি এসব কথা বলেন।
এষা দে বলেন, আমার বাবার পৈত্রিক ভিটা ছিল বাংলাদেশের শরিয়তপুরে। ফলে এ দেশের জন্য একটা আলাদা টান অনুভব করতেন তিনি। পাকিস্তানীদের বাঙালী ঠকানোর নীতি সম্পর্কে, নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে তাঁর জানা ছিল। তাই একাত্তরে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন বিবেকের তাড়নায় বাংলাদেশের পক্ষে কলম ধরেন তিনি। তবে যেসব বিষয় গণমাধ্যমে নিয়মিত আসত সেগুলো কমই লেখেন। তিনি মূলত বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারত সরকারের নীতি কী হওয়া উচিত তা যুক্তিতর্ক দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন সরকারকে। নিজের লেখায় বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে বিশেষ জোর দেন তিনি। এ ব্যাপারে নানা যুক্তি তুলে ধরেন। বাঙালীকে সামরিক সহায়তা দেয়ার আবশ্যকতাটুকুও গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেন। কেন এই সাহায্য দেয়া উচিত তা ব্যাখ্যা করে বলেন, পাকিস্তানীরা বাঙালীকে সকল ক্ষেত্রেই দুর্বল করে রেখেছে। সামরিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পায়নি বাংলাদেশ। এ অবস্থায় দেশটিকে সামরিক সহায়তা দেয়া খুব জরুরী। এসব কারণে আর কোন্্ কোন্্ রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হয়েছিল তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন বাবা। কিন্তু বাংলাদেশকে সামরিক সহায়তা দেয়ার ব্যাপারে ভারত সরকার কখনও কি দোদুল্যমানতায় ছিল?। তাহলে কেন এ বিষয়ে আলাদা করে তাঁকে লিখতে হয়েছিল বলে মনে করেন? এমন প্রশ্নে এষা বলেন, তখন পরিস্থিতি আসলে অনেক জটিল ছিল। নানামুখী চাপ সামলাতে হচ্ছিল ভারতকে। অনেক হিসাবনিকেশ করতে হচ্ছিল। ফলে কোন কোন সময় সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে বেশি সময় নিতে হয়েছে। ভাবতে হয়েছে। এই জায়গাটিতেই বাবার লেখা কাজে দিত। যেমন অনেকে বলার চেষ্টা করতেন, ভারত বাংলাদেশকে সামরিক সহায়তা দিলে চীন বসে থাকবে না। তারাও পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেবে। কিন্তু বাবা তখন ভারত সরকারকে অভয় দিয়ে লিখেছিলেন ভয় পাওয়ার কিছু নেই। চীন কখনই হিমালয় পেরিয়ে পাকিস্তানকে সাহায্য করতে আসবে না। বাস্তবে হয়েছিল তা-ই।
তাঁর মানে যুদ্ধ বিষয়ে বাস্তব জ্ঞান ছিল বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের। তাছাড়া ‘দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস’ গ্রন্থেরও লেখক তিনি। এসব কারণেই কি যুদ্ধের খুঁটিনাটি নিয়ে লেখা তাঁর জন্য সহজ হয়েছিল? এমন প্রশ্নে এষা বলেন, তা তো অবশ্যই। যুদ্ধের সংস্কৃতি আইনকানুন গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে প্রচুর পড়াশোনা ছিল তাঁর। তাছাড়া বাবার লেখা ‘দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস’ ১৪০০ পাতার বিশাল গ্রন্থ শুধু বাংলায় নয়, হিন্দি ভাষায় লেখা সেরা ক্ল্যাসিকগুলোর অন্যতম। সে অভিজ্ঞতা থেকেই জটিল সময়গুলোতে ভারত সরকারকে নানা পরামর্শ দেন তিনি। এক প্রশ্নের উত্তরে এষা জানান, যুগান্তরসহ বিভিন্ন কাগজে লিখেছেন বিবেকানন্দ। সেসব লেখা তখন বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও বিবেকানন্দের লেখাকে খুব আমলে নিতেন বলে জানান এষা।
আমরা যতদূর জানি, লেখালেখির পাশাপাশি অন্যান্য দেশে গিয়েও বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেছেন বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়। জনমত গঠনের কাজ করেছেন। সে সম্পর্কে আপনি কতটা জানেন? উত্তরে এষা বলেন, বাবা তো শুধু সাংবাদিক কলামিস্ট ছিলেন না। তিনি বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একাত্তরে ভারত-সোভিয়েত সুহৃদ সংঘের সভাপতি ছিলেন তিনি। শান্তি সংঘেরও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ফলে বিদেশীদের সঙ্গে তাঁর ভাল যোগাযোগ ছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় শান্তি সংঘের হয়ে বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন তিনি। তখন অনেকেই বাংলাদেশ সম্পর্কে ভাল জানতেন না। তিনি তাঁদের বাঙালীর ন্যায়ের সংগ্রাম সম্পর্কে ধারণা দেন। তারাও পরে বাংলাদেশের জন্য কাজ করেন।
এক প্রশ্নের উত্তরে এষা জানান, স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছিলেন বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়। সে সময় দেশীয় শত্রুদের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকা-ের সংবাদ পেয়ে প্রচ- কষ্ট পান তিনি। নেতার মৃত্যুর পরে বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থীদের উত্থান ঘটতে থাকে। বাংলাদেশের ধর্ম নিরপেক্ষ চরিত্রটি হারিয়ে যায়। এ বিষয়গুলোও খুব আহত করেছিল বাবাকে। আলোচনার এ পর্যায়ে আসে বর্তমান প্রসঙ্গ। ১৯৭১ সালে বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় যেসব লেখা লিখেছিলেন সেগুলো এখন কোথায় আছে? আলাদা করে সংরক্ষণের কোন কাজ কি আপনারা করেছেন? জানতে চাইলে এষা বলেন, ’৯৬ সালে উড়িষ্যা থেকে আমি কলকাতায় ফিরে বেশ কিছু লেখা খুঁজে বের করেছি। দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে। লেখাগুলো নিয়ে বাংলাদেশ থেকে একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে। তবে যুগান্তর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাবার অনেক লেখা খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেগুলো নিয়ে কেউ কাজ করতে চাইলে আমি সহায়তা করব।
এষা দে নিজেও লেখালেখি করেন। বেশ কয়েকটি বই রয়েছে তাঁর। তবে বেশির ভাগ উপন্যাস। বাবার মতো অনুভূতি আছে আজকের বাংলাদেশের জন্য। তবে তিনি পুরোপুরি বাবার মতো করে ভাবতে নারাজ। বলেন, বাংলাদেশ-পাকিস্তান যুদ্ধ প্রশ্নে নিরপেক্ষ থাকলেই ভাল করত ভারত। এটি হলে হয়ত একটু দেরি করে স্বাধীনতা পেত বাংলাদেশ। তবে ভারত সম্পর্কে আজকে যে বিরূপ ধারণা কেউ কেউ পোষণ করেন তা করতেন না। আর ভারতেও এখন এমন অনেক সমস্যা রয়েছে যেগুলো হয়ত থাকত না।