মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ২২ এপ্রিল ২০১২, ৯ বৈশাখ ১৪১৯
বর্ধন কুঠি, মীরেরবাগান হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক নিদর্শন
গাইবান্ধার কিংবদন্তির ইতিহাস
আবু জাফর সাবু, গাইবান্ধা
জেলায় ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং কিংবদন্তি তুল্য ঘঁনার সংখ্যাও খুব বেশি নয়। ভূতত্ত্বের দিক থেকে বিচার করতে গেলে এ এলাকা খুব প্রাচীনও নয়। গাইবান্ধায় মুসলিম ও হিন্দু যুগের কয়েকটি ঐতিহাসিক কীর্তির অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন কিংবদন্তিও ছড়িয়ে আছে এ এলাকাজুড়ে। এর মধ্যে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার অতীত স্মৃতি বিজড়িত বর্ধন কুঠি এবং গাইবান্ধা সদর উপজেলার ঘাগোয়া ইউনিয়নের মীরের বাগানের অতীত নিদর্শন এখন বিলুপ্তির পথে।
জেলার গোবিন্দগঞ্জ থানা সদরের প্রাচীন বর্ধন কুঠি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সোনালী উপাদান হয়ে ভগ্নপ্রায় অবস্থায় আজও দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৬৫ সালে এখানে গোবিন্দগঞ্জ কলেজ স্থাপিত হবার পর কলেজ ক্যাম্পাসের ক্রমবিস্তৃতি ও অন্যান্য কারণে সুউচ্চ বর্ধন কুঠির প্রাচীন অট্টালিকাগুলো অবহেলায় ধ্বংসের প্রায় শেষ ধাপে এসে দাঁড়িয়েছে।
সমসাময়িক ইতিহাসের উৎস বা উপাদান হিসেবে বর্ধন কুঠির রাজবংশ ও তাঁদের বিভিন্ন কর্মকা- অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতœতত্ত্বরূপে সংরক্ষণ করা হলে বর্ধন কুঠি তৎকালীন ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় যে শূন্যতা রয়েছে তা কিয়দংশ পূরণ করতে পারত।
প্রাচীন ইদ্রাকপুর পরগণার সদর কার্যালয় বর্ধন কুঠি পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজদ্দৌলার পতনের পরবর্তী পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতালাভকারী ইংরেজ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনেকটা প্রত্যক্ষভাবেই সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। যার বিবরণ ১৭৮১ সালে রংপুরের কালেক্টর মি. গুডল্যাডোর দৈনন্দিন দাফতরিক কাজ কর্মের কাগজপত্রে পাওয়া যায়।
রাজা আর্যাবরের ছেলে রাজা ভগবান ১৬০১ সালে যখন বর্ধন কুঠির নিকটবর্তী রামপুরে বাসুদেব মন্দির নির্মাণ করেন তখন মহারাজ মানসিংহ বাংলার সুবাদার ছিলেন। ১৬০৯ সালে রাজা ভগবানের সময়েই সুবাদার ইসলাম খান মানসিংহের স্থলাভিষিক্ত হন। পরবর্তী ধারাবাহিকতায় রাজা মনোহরের নাবালক পুত্র রঘুনাথের আমলে শাহ সুজাকে, ১৬৬৯ সালে আওরঙ্গজেবকে এবং ১৬৭৫ সালে পুনরায় রঘুনাথের পৌত্র হরিনাথের আমলে প্রবল প্রতাপশালী আওরঙ্গজেবকে ক্ষমতার শীর্ষ কেন্দ্রে দেখতে পাওয়া যায়। হরিনাথের প্রপৌত্র রাজা গৌরনাথ কোম্পানির সময়ের রাজা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ১৭৮১ সালে বর্ধন কুঠিতে রাজত্ব করেন। ইংরেজদের ক্ষমতা হিসেবে খ্যাতি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বর্ধন কুঠির জমিদারী পর্যায়ক্রমে রংপুর কালেক্টরেট ও ঘোড়াঘাটকেন্দ্রিক প্রশাসনের অধীনে চলে আসে। ইতিহাসখ্যাত চরিত্র দেবী সিংহের নাম বর্ধন কুঠিতে রক্ষিত সফল রাজাদের নামের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
১৯৭০ সালে দশ শালা বন্দোবস্তের সময় বর্ধন কুঠির জমিদারী বাকি খাজনার দায়ে বেহাত হয়ে যায়। বর্ধন কুঠির শেষ রাজা শৈলেশ চন্দ্র ভারত বিভক্তির সময় এদেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যান। ঐতিহাসিক বর্ধন কুঠির রাজবংশের ধারাবাহিক আলোচনার সূত্র ধরে অনায়াসে সমসাময়িক মোগল শাসন ও শাসকদের সঙ্গে তৎকালীন বাংলার দেশীয় রাজন্যবর্গ-জমিদারদের সম্পর্কের বিষয়ে কিছু মূল্যবান তথ্য লাভ করা সম্ভব। পাশাপাশি ইংরেজ বণিকের মানদ- কি করে রাজদ-রূপে দেখা দিল তারও আংশিক চিত্র এতে রয়েছে। গোবিন্দগঞ্জের বর্ধন কুঠি অনুসন্ধিৎসু গবেষকদের কাছে মহামূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। এছাড়াও বর্ধুন কুঠির জমিদারদের অমর সৃষ্টি সরোবর দুধ সাগর, রক্ত সাগরের জলরাশির নিচেও যে রহস্যময়তা লুকিয়ে আছে ইতিহাসের স্বাভাবিক গতিধারা অব্যাহত রাখতেই তা উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, দারিয়াপুরের মীরের বাগানের সঙ্গে ইতিহাস খ্যাত মীর জুমলার সম্পর্ক ছিল বলে কিংবদন্তি রয়েছে। বিশাল আমবাগানের জন্য (বর্তমানে যার বেশিরভাগই কেটে ফেলা হয়েছে) মীরের বাগানের খ্যাতি ছিল। ১৩০৮ সালে (তথ্যসূত্র : মসজিদ গাত্রের শিলালিপি) কলকাতার পীর সৈয়দ ওয়াজেদ আলী বাহারবন্দ পরগণার ঘন জঙ্গল থেকে পীর ইবনে শরফুদ্দিনের স্মৃতিবাহী কবর ও মসজিদের ধ্বংসাবশেষ উদ্ঘাটন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করেন। ৩ দশমিক ৯৫ শতক এলাকাজুড়ে অবস্থিত এ মাজার ও মসজিদের সঙ্গে শাহ সুলতান গাজী নামের এক ধর্ম প্রচারক কিংবা বীর যোদ্ধার সম্পর্কের কথা জানা গেলেও তাঁকে সঠিক পরিচয়ে চিহ্নিত করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। ময়মনসিংহের ক্বারী করিম বক্সের উত্তরাধিকারীগণ বংশ পরম্পরায় মোতওয়াল্লী হিসেবে এ ওয়াক্ফ সম্পত্তিটি রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছেন।