মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০১১, ৯ পৌষ ১৪১৮
স্কুলশিক্ষক থেকে মুদ্রা তৈরির গুরু
মহিউদ্দিন আহমেদ ॥ এক সময়ের মানুষ গড়ার কারিগর সগির আহমেদ এখন জাল মুদ্রা তৈরির গুরু। তার কাছ থেকে দীৰা নিয়ে জাল মুদ্রা তৈরি করে তিনজন এখন দেশের সম্মানিত ব্যক্তিদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। ওই তিন শীষ্যের শতাধিক ছাত্র দেশের বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তার নকল মুদ্রা তৈরির ২০টি মেশিন এখনও ব্যবহার করছে তার শীষ্যরা। বিয়ে করেছে তিনটি। এর মধ্যে দুই স্ত্রী মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে পালিয়েছে। গ্রেফতারের পর রিমান্ডে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে দেয়া জবানবন্দীতে এসব কথা বলেছে সগির। তার শীষ্যদের গ্রেফতার এবং নকল মুদ্রা তৈরির ২০টি মেশিন উদ্ধারে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান অব্যাহত রেখেছে গোয়েন্দারা।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে জন্ম সগিরের। লেখাপড়া শেষ করে কুমিলস্নার একটি স্কুলে শিৰকতা করত। উচ্চ বিলাসী সগির বেশিদিন মানুষ গড়ার কাজে নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। ১৯৯৫ সালে ছুটে আসে টাকার শহর ঢাকায়। রাজধানীতে এসে প্রথমে বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করে নেমে পড়ে শেয়ার ব্যবসায়। শেয়ার ব্যবসায় লোকসান করে দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলে। বন্ধুদের ধার দেনা না দিতে পেরে গা ঢাকা দেয়। এতেও রক্ষা নেই। যেখানে থাকে পাওনাদাররা সেখানেই হানা দিতেন। এমন সময় তার সঙ্গে পরিচয় হয় ভারতীয় এক পীরের মুরিদ হারুন-উর-রশিদ মোস্তফা চিশতীর সঙ্গে। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় মনোহরগঞ্জে। সগিরের সহযোগী হারুন-উর-রশিদ মোসত্মফা চিশতী আরেক রহস্যময় চরিত্রের মানুষ। কুমিলস্নার মনোহরগঞ্জে এ লোকটি ভারতের এক পীরের আশীর্বাদ নিয়েছেন। প্রতি বছর অন্তত একবার তিনি ভারত যান পীরের দরবারে। মাথায় সব সময় কালো পাগড়ি লাগানো থাকে। পীরের মুরিদ হিসেবে দাড়িও অনেক লম্বা করে। শানত্মির প্রতীক হিসেবে সাদা কাপড়ের লম্বা পোশাকও পরে নিয়মিত। গ্রেফতারের দিনও এ ধরনের পোশাক পরনে ছিল। অথচ এর অনত্মরালে তিনি দীর্ঘ এক যুগের অধিক সময় ধরে জাল মুদ্রা তৈরির সরঞ্জাম সরবরাহ করে আসছে। আস্তে আস্তে গড়ে তোলে জাল মুদ্রা তৈরি, পাচারের বিশাল নেটওয়ার্ক। মোস্তফা চিশতীর দায়িত্ব ছিল সগিরকে ছাপার প্লেট তৈরি ও কাগজ সরবরাহ করা। বাকি কাজ অন্য সহকারীদের নিয়ে শেষ করত সে। নারীর প্রতি অতিরিক্ত লোভ লালসা ও কয়েকবার গ্রেফতার হওয়ার কারণে টাকার পাহাড় গড়তে পারেনি সগির। তবে বর্তমানে টপ পজিশনে থাকা নিজের তিন শীর্ষকে নিয়ে গর্ব করে সে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজে সমস্যা হতে পারে বলে তিন শীর্ষের নাম উলেস্নখ করা হলো না।
চলতি বছরের জাল মুদ্রা তৈরি ও পাচার চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের বেশিরভাগই সগিরের শীর্ষ। তার কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে তারা দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে দেশীয় মুদ্রাসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা জাল করে আসছে। গ্রেফতারকৃত শীষ্যদের দেয়া তথ্যানুযায়ী গোয়েন্দারা দীর্ঘদিন ধরে তার খোঁজে মাঠে চষে বেড়ায়। সবশেষ গত ১৯ ডিসেম্বর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে লালবাগ থানাধীন ২১৭/৪ শহীদনগর হাজী আবু কালাম খানের ষষ্ঠ তলার পশ্চিম পাশের ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। একই সঙ্গে গ্রেফতার করা হয় তার দীর্ঘদিনের অপকর্মের সঙ্গী হারুন-উর-নশিদ মোসত্মফা চিশতীকে। এ অভিযান পরিচালনা করেন সহকারী পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ গোলাম আজাদ খান পিপিএম । গ্রেফতারের সময় উভয়ের কাছ থেকে বাংলাদেশী জাল টাকাসহ বিভিন্ন দেশের ৫ কোটি জাল মুদ্রা ও মুদ্রা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেফতারকৃত সগির ও হারম্ননের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫-ক ধারা অনুযায়ী রাজধানীর লালবাগ থানায় মামলা করা হয়। মামলার বাদী হন ডিবির উপপরিদর্শক আনিসুর রহমান। এ মামলায় তাদের ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। গত দুই দিনে গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে সগির ও তার সহযোগী। গোয়েন্দা পুলিশের কাছে স্বীকার করে সে ১৯৯৫ সাল থেকে জাল টাকার ব্যবসা করে আসছেন। তাছাড়া সে বাংলাদেশে প্রথম জাল টাকা তৈরি শুরু করে বলেও গোয়েন্দাদের কাছে স্বীকার করে। পরবর্তীতে অন্যরা তার কাছ থেকে শিৰা গ্রহণ করে। এতে করে গত ১৬ বছরে সে জাল মুদ্রা চক্রের সদস্যদের কাছে গুরুর খেতাব পেয়েছে। অবাক করার বিষয় হচ্ছে দীর্ঘ অপরাধ জীবনে সগির আহমেদ এর আগেও বেশ কয়েকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়। কিন্তু রহস্যময় কারণে ছাড়া পেয়ে যায় সে।