মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০১১, ৯ পৌষ ১৪১৮
জবাবদিহিতার অভাব_আড়াই শ' কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা
সরকারের বিভিন্ন কার্যালয় ও ছয় ব্যাংকের ১১ শাখায় অনিয়ম পেয়েছে সিএজি অফিস
শাহ্ আলম খান ॥ অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের আওতাভুক্ত রাজস্ব কার্যালয়গুলোতে চলছে নানা অনিয়ম আর রাজস্ব ফাঁকির মহোৎসব। এই কার্যালয়গুলোতে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না হওয়ায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে বছরের পর বছর ধরে রাজস্ব আদায়ের নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে। বৈদেশিক নির্ভরতা কমাতে সরকার রাজস্ব উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা কিছুতেই রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সম্প্রতি অভ্যনত্মরীণ সম্পদ বিভাগের আওতাভুক্ত কয়েকটি আঞ্চলিক রাজস্ব কার্যালয়ের কর্মকাণ্ডের ওপর সরকারের মহাহিসাব নিরীৰা কার্যালয়ের পরিচালিত এক বিশেষ নিরীক্ষায় প্রায় আড়াই শ' কোটি (মোট ২৪৮ কোটি ৯৬ লাখ ৯ হাজার ২২৮ টাকা) টাকার রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা ধরা পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরিমাণ অর্থ ব্যবসায়ী ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে ম্যানেজ ফর্মুলার ভিত্তিতে ভাগাভাগি হয়েছে কিংবা রেয়াত দেয়া হয়েছে। অথচ রাজস্ব আদায়কারী এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মমাফিক কর্মকা- পরিচালনা করলে এবং রাজস্ব সংক্রান্ত আইনের বিধিবিধানের সঠিক পরিপালন করলে এই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা হওয়ার কথা ছিল।
নিরীৰা বিভাগের কর্মকর্তারা তাদের নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে এ ব্যাপারে রাজস্ব ফাঁকির সুনির্দিষ্ট খাত ও ধারাগুলো চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে এই অর্থ আদায়যোগ্য এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হওয়া আবশ্যক বলেও সুপারিশ করেছে। আইনের অপব্যবহারের কারণে ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে যাওয়া রাজস্ব ক্ষতির কথা উলেস্নখ করে সংবিধানের ১৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মহাহিসাব নিরীৰা কার্যালয় ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতিকেও অবহিত করেছে।
সূত্র মতে, অভ্যনত্মরীণ সম্পদ বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন কার্যালয়ের ওপর নিরীৰা চালিয়ে মোট ৫টি পূর্ণাঙ্গ পৃথক প্রতিবেদন তৈরি হরা হয়েছে। এসব নিরীৰণে রাজস্ব সংক্রানত্ম বিভিন্ন ধারা-উপধারা কিংবা অনিয়মের ওপর মোট ৫৯টি আপত্তি পাওয়া গেছে। দৈবচয়নের ভিত্তিতে চালানো এসব নিরীৰণে জড়িত ফাঁকির পরিমাণ ২৪৮ কোটি ৯৬ লাখ ৯ হাজার ২২৮ টাকার কথা বলা হয়েছে।
নিরীক্ষিত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, অভ্যনত্মরীণ সম্পদ বিভাগের অধীনস্থ শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদফতর (ডেডো) ও ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ১১টি শাখার বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। এতে (২০০৫-২০০৭) পর্যন্ত সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকা-ে ২০টি অনিয়ম তদন্ত করে মহাহিসাব নিরীক্ষা কার্যালয় (সিএজি) মোট ৬৩ কোটি ১৪ লাখ ২১ হাজার ৮৭৫ টাকার রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা উদ্ঘাটনে সৰম হয়।
এছাড়া অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের অধীন কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট (আঞ্চলিক কার্যালয় চট্টগ্রামসহ ঢাকা কার্যালয়ের রাজস্ব কর্মকা-ের ওপর ২০০৭-০৮ অর্থবছরের নিরীক্ষায় ১১টি অনিয়ম পায় নিরীক্ষা কর্মকর্তারা। এতে রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ধরা পড়ে ৭১ কোটি ২১ লাখ ২৩ হাজার ৪০৩ টাকা। একইভাবে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা কার্যালয়ের ওপর নিরীৰণ চালিয়ে ৭টি অনুচ্ছেদে জড়িত রাজস্ব ফাঁকি মেলে ৪ কোটি ৭৯ লাখ ২২ হাজার ৮১৯ টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগেও ২০০৭-০৮ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষায় ১২টি অনিয়ম খুঁজে পাওয়া যায়। এসব অনিয়মের কারণে রাজস্ব ৰতি হয়েছে ৫২ কোটি ৫৭ লাখ ৫৭ হাজার ১২৯ টাকা।
ওদিকে অর্থ বিভাগভুক্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন ৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ১৬টি শাখার রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে রফতানি ভর্তুকি/নগদ সহায়তা প্রদানের ৰেত্রে অনিয়মজনিত ৯টি বিষয়ে তদনত্ম হয়। ২০০৫-২০০৭ পর্যনত্ম কর্মকা-কালীন এসব অনিয়ম থেকে ৫৭ কোটি ২৩ লাখ ৮৪ হাজার দুই টাকা রাজস্ব ৰতি ধরা পড়ে।
স্থানীয় ও রাজস্ব অডিট অধিদফতরের মহাপরিচালক মোঃ আব্দুল বাছেত খান এ ব্যাপারে নিরীৰিত প্রতিবেদনে বলেছেন, অডিট পর্যবেৰণের সঙ্গে জড়িত অর্থ আদায়ের বিষয়ে প্রশাসনিক কর্তৃপৰের কার্যক্রম ত্বরান্বিত হলে সরকারী কোষাগারে ওই পরিমাণ রাজস্ব জমা পড়া সম্ভব।
অপরদিকে সরাসরি নিরীৰার সঙ্গে জড়িত নিরীৰা বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, নিরীৰায় আপত্তির সঙ্গে জড়িত সমুদয় অর্থ আদায়যোগ্য এবং তা সরকারী কোষাগারে জমা হওয়া আবশ্যক। এই অর্থ আদায়ে অভিযুক্ত সংশিস্নষ্ট কর্মকর্তাদের দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করে অতিসত্বর আদায়ের উদ্যোগ নেয়াও প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের দায়িত্বশীল উর্ধতন এক কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন এবং নিরীক্ষায় জড়িত বড় অঙ্কের রাজস্ব ৰতির বিষয়টি ইতোমধ্যে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।