মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১১, ১ পৌষ ১৪১৮
কুষ্টিয়ার বিত্তিপাড়ায় ৪০ বছরেও নির্মিত হয়নি বধ্যভূমি কমপ্লেক্স
জাহিদুল আলম জয়, কুষ্টিয়া থেকে ফিরে ॥ কুষ্টিয়া শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের পাশে বিত্তিপাড়া বাজার। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশে তাদের দোসরদের সহায়তায় পাকিস্তানী বাহিনী বিত্তিপাড়া বাজারে তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে ক্যাম্প স্থাপন করে। পাকি বাহিনী সে সময় প্রতিদিন বিভিন্ন গ্রাম থেকে এলাকার মুক্তিসেনা, যুবক, সাধারণ মানুষদের ধরে নিয়ে এসে এখানে বন্দী করত। পরে পাশবিক নির্যাতনের মাধ্যমে তাদের হত্যা করা হতো। শুধু তাই নয়, কাউকে অর্ধেক, কাউকে পুরো মাটিচাপা দেয়া হতো। অনেককেই জীবনত্ম পুঁতে রাখা হতো। এদের কারও হাত, কারও পা বেরিয়ে থাকত। এই পাকি ক্যাম্পের আশপাশের লোকজন নিরীহ বাঙালীদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের গগনবিদারী চিৎকার শুনতে পেতেন। সংশিস্নষ্ট এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে কয়েক হাজার মানুষকে হানাদার পাকবাহিনী হত্যা করে পুঁতে রেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় এ স্থানটি যুদ্ধের পর দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দীর্ঘ ৩২ বছর পর ২০০৩ সালে এ জায়গাটি বধ্যভূমি হিসেবে শনাক্ত করে সেখানে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়।
সরেজমিন বিত্তিপাড়া বধ্যভূমি অঞ্চলে গেলে মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম বিশ্বাস স্মৃতিচারণ করেন, 'একাত্তরে আমরা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। কিন্তু এদেশের দালালদের কারণে অনেক সাধারণ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়। বিত্তিপাড়া বধ্যভূমি এলাকায় নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক নিরীহ মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে।' তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের পরপর সম্ভবত ১৯৭২ সালে বৃত্তিপাড়া বধ্যভূমিতে যারা শহীদ হয়েছিলেন তাদের মাথার খুলি, হাড়-হাড্ডি ব্যারিস্টার আমির-উল-ইসলাম ও মার্কিন নাগরিক জন স্টোন হাউস দুটি পিকআপে করে ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ঢাকায় এসব সংরৰণ করা আছে বলে তিনি জানান।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও আড়ালে রয়ে গেছে বৃত্তিপাড়ার স্মৃতিচিহ্ন। কিন্তু শহীদ বিশ্বাসের নেতৃত্বে এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা জায়গাটি বধ্যভূমি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রাণানত্ম চেষ্টা চালান। এজন্য শহীদ বিশ্বাসকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। তাদের ঐকানত্মিক চেষ্টায় ২০০৩ সালে বধ্যভূমি হিসেবে বিত্তিপাড়াকে চিহ্নিত করে স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়। তবে তা ছিল অনানুষ্ঠানিক। আনুষ্ঠানিকভাবে বিত্তিপাড়া বধ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে গত ৯ ডিসেম্বর। এ দিন 'বৃত্তিপাড়া মুক্তদিবস' অনুষ্ঠানে এ স্বীকৃতি দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নাসিম উদ্দিন আহমেদ। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলামের স্বপ্ন দেখেন, এখানে একটি কমপেস্নঙ্ নির্মাণ করা হবে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, 'অনেকদিন থেকেই আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি বিত্তিপাড়া বধ্যভূমি প্রাঙ্গণে একটি কমপেস্নঙ্ নির্মাণের জন্য। অনেকেই বিভিন্ন সময় আশার বাণী শোনালেও তা বাসত্মবায়ন হয়নি। এবার কুষ্টিয়া মুক্তদিবসে (১১ ডিসেম্বর) জেলা নেতৃবৃন্দ বলেছেন, বধ্যভূমির জন্য ৭ লাখ টাকার অনুদান দেবে সরকার। এটি বাসত্মবায়িত হবে আশা রাখি । কিন্তু না হওয়া পর্যনত্ম আশ্বসত্ম হতে পারছি না।'
মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম আরও বলেন, 'বর্তমানে বিত্তিপাড়া বধ্যভূমি কুষ্টিয়া কৃষি বিভাগের অধীনে। আমাদের দাবি, জায়গাটি বধ্যভূমির নামে দেয়া হোক।' তবে এ ব্যাপারে বর্তমান কুষ্টিয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নাসিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, পুরো জায়গাটি অবশ্য কৃষি বিভাগের অধীনে নয়। কিছু অংশ কৃষি বিভাগের অধীনে রয়েছে। তবে আমরা ওই অংশটুকুও বধ্যভূমির নামে করে নেয়ার চেষ্টায় রয়েছি। বধ্যভূমির জন্য অর্থ অনুদান প্রসঙ্গে নাসিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, সদ্য আমরা ৭ লাখ টাকার কাজ পেয়েছি। এ মাসের শেষের দিকে কাজ শুরম্ন হবে।