মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১১, ১ পৌষ ১৪১৮
তোমার স্বামীগ কাটিছি এলা তোমরা কুণ্ঠে যাবে যাও...
একাত্তর ভুলতে পারে না সুখানপুখুরীর স্বামীহারা নারীরা
মোরসালিন মিজান,
পঞ্চগড় থেকে ফিরে
আপনার নাম কী? প্রশ্ন করতেই চটজলদি উত্তর_ সুধামনি। স্বামীর নাম? আপনার স্বামীর নাম? এবার আর উত্তর নেই কোন। নিজেকে গুটিয়ে নিলেন বৃদ্ধা। কিছুতেই স্বামীর নাম বলবেন না। একই ব্যাপার দেখা গেল বাকিদের মধ্যেও। স্বামীর নাম মুখে নিতে রাজি নন তারা। পরে বিকল্প হিসেবে একজনের স্বামীর নাম বলতে বলা হলো অন্যজনকে। এবার জানা গেল, সুধামনির স্বামীর নাম যামুনী। একই নিয়মে জানতে হলো অন্যদের স্বামীর নাম। এর কারণ, স্বামীর নাম মুখে নেয়া পাপ। এ সংস্কার অমান্য করার সামান্য পাপটুকুও স্ত্রীরা করতে চান না। অথচ সেই স্বামীদের নৃশংসভাবে হত্যা করাকে একদমই পাপ মনে করেনি পাকিস্তানী জল্লাদ ও এদের দোসর রাজাকাররা। হিন্দু মেরে 'আলস্নাহর জমিন সাফ' করেছিল তারা। একাত্তরে তাই পঞ্চগড়ের সুখানপুকুরী গ্রাম পুরুষশূণ্য হয়ে গিয়েছিল। হিন্দু অধু্যষিত গ্রামটিতে মৃতু্যর সংখ্যা এত বেশি ছিল যে, এখন এটি বিধবার গ্রাম নামে পরিচিত। এই গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় প্রায় আড়াই শ' নারী বিধবা হন একাত্তরে। এদের অধিকাংশই আর বেঁচে নেই। বাকিরা গত চলিস্নশ বছর ধরে একলা জীবন টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। সমাজ বাধা সংস্কারে। তাই খুব অল্প বয়সে বিধবা হওয়া নারীদের আর বিয়ে হয়নি। ফলে তাদের কাছে সংসার বলতে কয়েক বছর বা মাসের সংসার স্মৃতি। এ স্মৃতি নিয়েই এতগুলো কাল একলা কাটিয়ে দিয়েছেন। এদের ত্যাগের খবর নিতে এতদূর গ্রামে পেঁৗছতে পারেনি রাষ্ট্র। সমাজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এরপরও জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, হিন্দু অধু্যষিত হওয়ায় এ গ্রামটিকে প্রধান টার্গেট করে স্থানীয় রাজাকাররা। বিষয়টি অাঁচ করতে পেরে ১৯ বৈশাখ পাশর্্ববতর্ী সীমানত্ম দিয়ে গ্রামের লোকজন ভারতে পালানোর প্রস্তুতি নেন। খুব ভোরে খাওয়া-দাওয়া না করে বেরিয়ে পড়েন তাঁরা। কিন্তু স্থানীয় রাজাকাররা তাঁদের পিছু নিয়ে বলে, আমরা আছি। কোন ভয় নেই। তোমরা বাড়ি চলে আস। সরল সহজ মানুষগুলো এ কথায় বিশ্বাস করে বাড়ি ফিরে আসেন। মহিলারা দুপুরের রান্না শুরম্ন করেন। কিন্তু বেলা ১২টার দিকে শুরম্ন হয়ে যায় চিৎকার চেচামেচি। মেঠো পথের সকল ধুলো শূন্যে উড়িয়ে দিয়ে গ্রামটির দিকে তেড়ে আসতে থাকে পাকিসত্মানী বাহিনী। দৃশ্যটি দেখে গ্রামবাসীর বোঝা হয়ে যায়, ফাঁদে পা দিয়েছেন তারা। আর তাই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য মানুষ এলোপাতাড়ি ছুটতে শুরম্ন করেন। কিছু দূর গিয়ে পেছনে ফেরে তাকান কেউ কেউ। কিন্তু তখন আর বাড়ি দেখা যায় না। শুধু আগুন চোখে পড়ে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সব বাড়ি ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায় তাদের। আক্রানত্মদের অন্যতম একজন বিধবা বালাশ্বরী জানান, পরে তারা বাড়ির মায়া ত্যাগ করে পাশর্্ববতর্ী সীমানত্ম দিয়ে ভারতে পারি জমানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সব পথই জানা রাজাকারদের। তাই অল্পদূর যেতেই ধরা পড়েন তাঁরা। বালেশ্বরী জানান, সে সময় তিনি ছিলেন তিন মাসের অনত্মঃসত্ত্বা। এছাড়াও দলে ছিল শিশু, বৃদ্ধসহ বহু নারী পুরম্নষ। সকলকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ইসলামপুর গ্রামের আমবাগানে। এর কিছুৰণের মধ্যে রাজাকাররা নারী শিশুদের কাছ থেকে পুরম্নষদের আলাদা করে ফেলে। সুধামনি নামের আরেক বিধবা জানান, পুরম্নষদের নিয়ে যাওয়ার সময় রাজাকাররা বলে, 'বেটা ছেলে মিছিল করিব'। কিন্তু এটিও ছিল প্রতারণা। মিছিলের নামে এক জায়গায় মূলত জড়ো করা হয় পুরম্নষদের। পরে বিকেল চারটার দিকে সুখানপুকুরী গ্রামের পাশর্্ববতর্ী ঢাপঢুপ বিলের ধারে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর শুরম্ন হয় রক্তের হুলিখেলা। মিলিটারিরা লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে পুরম্নষদের হত্যা করতে থাকে। নপুংশক রাজাকাররা নামে ধারালো অস্ত্র নিয়ে। পশু জবাইয়ের মতো করে এরা মানুষ জবাই করে চলে। জানা যায়, অন্যান্য জায়গার মানুষও এখানে ধরে আনা হয়। সব মিলিয়ে এ বধ্যভূমিতে মোট পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষ হত্যা করা হয়। এমন নৃশংসতায় বিল পাড়ের মাটি ভিজে নরম হয়ে যায়। নিজ দেশের মানুষের রক্তে বিলের পানি লাল হতে থাকে। নিজের মুখের ভাষায় ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ভটরি নামের আরেক বিধবা বলেন, 'খানরা ধরি নে গেইল। এলা গুলি কইশে হত্যা কইশে।' হত্যাকা- শেষ করে বাগানে ফিরে আসে রাজাকাররা। এ সময় বালাশ্বরীরা কাঁদতে কাঁদতে জানতে চান, 'পুরম্নষগনা কি কইলেন?' উত্তরে নিদারম্নণ সংবাদটি জানিয়ে দিয়ে রাজাকাররা বলে, তোমার স্বামীগ কাটিছি তোমরা এলা কু-ে যাবে যাও!
জানা যায়, সব হারানো নারীরা এরপর শ্রোতের মতো ভেসে ভারতের বেরম্নবাড়ি শরণাথর্ী ক্যাম্পে পেঁৗছেন। জয় বাংলা নামের ক্যাম্পটিতেই বাচ্চা জন্ম দেন বালেশ্বরী। সে সময়কার মানবতের জীবন যাপনের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপস্নুত হয়ে পড়েন তিনি। বলেন, কি যে কষ্ট তখন হয়েছে শুধু ভবগান জানেন।
তবে শুধু একাত্তরে নয়, বিজয়ের চলিস্নশ বছর পরও তাঁদের খবর শুধু ভগবানই রাখেন। দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা বিধবাদের চোখের দিকে তাকিয়ে সেটি অনুমান করা যায়। প্রতিটি নারীর চেহারা আগুনে পোড়া কয়লার মতো। শীতে পুরো শরীর ঢাকার কাপড় তাঁদের নেই। নাথু নামের বৃদ্ধা মহিলাটি শরীরজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন এক টুকরো ময়লা কাপড়। তাতে উপরের অংশ ঢাকা পড়েছে। কিন্তু হাঁটুর নিচে আর নামতে পারেনি। এখানেই শেষ নয়, বেশ কয়েকজনের মাথার চুল ছেলেদের চুলের চেয়ে ছোট করে কাটা। কেন? জানতে চাইলে এ প্রতিবেদককে হতবাক করে দিয়ে ভটরি জানান, লম্বা চুল রাখার খরচ অনেক। এত খরচ তারা কী করে করবেন? তাই চুল অস্বাভাবিক ছোট করে রাখেন তাঁরা! দুই বেলা খাবারও নিজের শ্রমে ঘামে জুটিয়ে নিতে হয় তাদের। জানা গেল, সকলেই এর ওর বাড়িতে কাজ করেন। মাঠে কাজ করেন কেউ কেউ। কথা বলার সময়ও তাই কাঁচি দেখা গেল বালাশ্বরীর হাতে। তাঁর শুকিয়ে যাওয়া আঙুলগুলোতে গাছের সবুজ রং মাখানো। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এত কাঠখড় পোড়ানো নারীরা এখনও আগের মতোই সরল-সহজ। তাঁরা পাকিসত্মানী মিলিটারি বুঝেন না। বুঝেন 'খান'। রাজাকার বোঝেন না। বোঝেন 'মুসলমান'। হাসিনা খালেদা তারা বুঝেন না। বুঝেন 'সরকার'। সব সরকারই তাঁদের কাছে এক। কারণ, কেউ তাঁদের কথা ভাবেনি। ভাবে না। আর তাই ভারাক্রানত্ম হয়ে বলেন, 'হামার কোন সরকার নাই'। অবশ্য এর পরও সরকারের প্রতি তাঁদের আনুগত্য আছে। সেটি বোঝাতেই হয়ত এ প্রতিবেদককে সরকারের লোক ভ্রম করে সুধামনি বললেন, আপনি সরকারের লোক। সরকারে আপনেরে পাঠাইল। তাইতো অসম্মান করতে পারি না!