মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১১, ৩০ অগ্রহায়ন ১৪১৮
মামলায় আটকে আছে ১০ হাজার কোটি টাকার বকেয়া রাজস্ব
শাহ্ আলম খান ॥ সারাদেশে ২০ হাজারেরও বেশি রাজস্ব সংক্রান্ত মামলায় আটকে থাকা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বকেয়া রাজস্ব আদায়ে তৎপর হয়ে উঠেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এসব মামলার দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তিতে চলতি মাসেই বহুল প্রতীক্ষিত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের (এডিআর) ফ্যাসিলিটেটর মনোনীতের কাজ শেষ হচ্ছে। এর যাত্রা শুরু হচ্ছে আগামী জানুয়ারিতেই। তবে মামলা পরিচালনায় আস্থাহীনতার সঙ্কট এড়াতে গঠিত এডিআরে থাকছে না এনবিআরের দায়িত্বশীল কোন কর্মকর্তা। এ ব্যাপারে অভ্যনত্মরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ ইতোমধ্যে জনকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন, এর পরিবর্তে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেৰিতে কমিশনের সকল ফ্যাসিলিটেটরই হবেন এনবিআরের নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত।
জানা গেছে, বিগত ১৭ বছরেরও অধিক সময় ধরে সরকারের রাজস্ব আদায়সংক্রান্ত বিভিন্ন কর অঞ্চল, কাস্টম হাউস এবং স্থল, নৌ ও সমুদ্রবন্দর দিয়ে ব্যবসায়িক কর্মকা-কালীন ভুল বোঝাবুঝি কিংবা আস্থাহীনতার রেশ ধরে সংৰুব্ধ হয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও ব্যবসায়ী মহল পরস্পরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। এনবিআর সূত্র জানায়, বেশিরভাগ মামলা হচ্ছে কাস্টমস সংক্রান্ত। এ খাতে মামলার পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজারের বেশি। এসব মামলায় আমদানি করা পণ্যের মূল্য বেশি ধরে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ শুল্কায়ন করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ব্যবসায়ীরা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়। অপরদিকে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি। আয়করসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা দুই হাজার।
সব মিলিয়ে আয়কর, শুল্ক ও মূসক-সংক্রান্ত এসব মামলার সংখ্যা চলতি অর্থবছরে ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। এর থেকে বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে শুধু আয়কর বিভাগেই আটকে আছে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব। অবশিষ্ট রাজস্ব আটকে আছে কাস্টমস ও মূসক বিভাগের অধীনে বিভিন্ন অঞ্চলে।
এসব মামলা পরিচালনায় ট্যাক্স ট্রাইবু্যনালের বিচারিক কার্যক্রমে সংৰুব্ধকারীদের আস্থা না থাকায় সংৰুব্ধের মাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। সুষ্ঠু মীমাংসার আশায় উভয়পৰই শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু উচ্চ আদালতেও এসব মামলার নিষ্পত্তিতে প্রয়োজনীয় বিচারক ও বিচারিক বেঞ্চ না থাকায় প্রায় ১৭ বছর ধরে এসব মামলার ফাইল আদালত চত্বরেই ফাইলবন্দী হয়ে রয়েছে। এদিকে এসব মামলার জট ছাড়াতে এবং ভুক্তভোগীরা তার থেকে দায়মুক্তি পেতে দীর্ঘদিন ধরেই বিকল্প কোন উপায় খোঁজার দাবি করে আসছিল। এরই পরিকল্পিত সমাধান হিসাবে দেখা হচ্ছে বিকল্পবিরোধী নিষ্পত্তি কমিশনকে (এডিআর)।
সূত্র মতে, গত ২৪ নবেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একটি পরামর্শক কমিটির সভায় এডিআর বিধিমালা প্রস্তুত করা হয়। ওই বিধিমালায় বলা হয়েছে, কমিশনে মনোনীতরা সরকারী কোন সংস্থায় চাকরিরত হওয়ার পরিবর্তে অবসরপ্রাপ্ত হবেন। এ ধারাবলে ব্যবসায়ীদের এডিআর কমিশন নিয়ে আস্থার সঙ্কট দূর হবে এবং সর্বগ্রহণযোগ্য বিবেচিত হবে বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি।
গঠিত এডিআরে বিচারিক নিষ্পত্তিতে কাজ করবেন এমন মনোনীতের সংখ্যা ৫ থেকে ৭ কিংবা তদুর্ধ হতে পারে। তবে সেটি নির্ভর করছে সংশিস্নষ্ট বিচারিক আদালতে মামলার জট ও জটিলতার ওপর।
কমিশনের বিধিমালা অনুযায়ী রাজস্ব-সংক্রানত্ম সকল মামলার পর্যায়ক্রমে দ্রম্নত নিষ্পত্তির লৰ্যে গঠিত এডিআরে মনোনীত প্রাথমিক সদস্য হবেন এনবিআরের অবসরপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তা। বিধি অনুযায়ী ওই কর্মকর্তা জয়েন্ট কমিশনার, কমিশনার ও সদস্য পদমর্যাদার যে কেউ একজন হবেন। দ্বিতীয় ব্যক্তি মনোনীত হবেন অবসরপ্রাপ্ত কোন জেলা জজ। তৃতীয় ব্যক্তি হবেন কর আইনজীবীদের দ্বারা মনোনীত কোন একজন, যার পেশায় নূ্যনতম ২০ বছরের যোগ্যতা রয়েছে। চতুর্থ মনোনীত ব্যক্তি হবেন একজন চার্টার্ড এ্যাকাউন্ট্যান্টেড, যার ওই পেশায় কমপৰে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এছাড়া কমিশনে ব্যবসায়ীদের মনোনীত একজন প্রতিনিধিকেও ফ্যাসিলিটেটর হিসাবে রাখার বিধান রাখা হচ্ছে।
সূত্র মতে, প্রসত্মাবিত বিধিমালা ইতোমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ে পাস হয়েছে। এখন শুধু ফ্যাসিলিটেটর মনোনীত করার অপেৰা। জানুয়ারির প্রথম দিকে এটি চলতি মাসেই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (এডিআর) গঠনে কাজ করছেন এনবিআরের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত সদস্য (আয়কর নীতি) মোঃ আমিনুর রহমান। তাঁর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এডিআর কমিশন নিয়ে ব্যাপক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এ কমিশনের মাধ্যমে ব্যবসায়ী এবং সরকার উভয়পৰই উপকৃত হবে। তিনি কমিশনের বিচারিক ৰমতা নিয়ে বলেন, কমিশন হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং প্রভাবমুক্ত। এখানে সব পৰেরই আত্মপৰ সমর্থন, যুক্তি উপস্থাপন ও খ-নে প্রত্যেককে পর্যাপ্ত সময় দেয়া হবে।
এনবিআর সদস্য (মূসক) মোঃ ফরিদউদ্দিন জানান, এডিআর কমিশনে বিচারিক ব্যয় পরিচালনায় খরচ হবে নগণ্য। পরস্পর যুক্তিতর্ক ও আলোচনা হবে সরাসরি। এর ফলে অতি অল্প সময়েই বাদী-বিবাদী তাদের মামলার দ্রম্নত সুরাহা করতে পারবেন।
এ ব্যাপারে এনবিআর চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ জানান, জানুয়ারির প্রথম দিকেই স্বল্প পরিসরে এডিআর কমিশন তাদের বিচারিক কার্যক্রম শুরম্ন করবে। প্রাথমিকভাবে স্বল্প পরিসরে কর অঞ্চল-১-এর অধীনে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকা রাজস্ব সংক্রানত্ম এসব মামলার বিরোধ নিষ্পত্তিতে কাজ শুরম্ন করবেন মনোনীত ফ্যাসিলিটেটররা। পর্যায়ক্রমে এ কার্যক্রম সারাদেশের রাজস্ব-সংক্রানত্ম মামলার নিষ্পত্তিতেই শুরম্ন করা হবে।
এদিকে বিরোধ নিষ্পত্তিতে এডিআর কমিশন গঠন ও তাতে মনোনীত ফ্যাসিলিটেটররা সরকারের নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত হওয়ায় ব্যবসায়ী মহলে স্বসত্মি বিরাজ করছে। এ বিষয়ে এফবিসিসিআইএর এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজস্ব-সংক্রানত্ম এসব মামলার বিরোধ যত দ্রম্নত মেটানো যায় ততই মঙ্গল। এর থেকে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্বপ্রাপ্তির বিষয়টি যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি বছরের পর বছর ধরে বয়ে বেড়ানো কর ফাঁকির অপবাদের দায় থেকেও মুক্তি মিলবে অনেক ব্যবসায়ীর।
আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদও এ বিষয়ে একটি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, রাজস্ব-সংক্রানত্ম ২০ হাজারের বেশি মামলা ঝুলনত্ম অবস্থায় রয়েছে। মামলাগুলোর দ্রম্নত নিষ্পত্তি সম্ভব হলে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্বপ্রাপ্তির পথ খুলে যাবে। তেমনি সংৰুব্ধরা মামলায় জয়ী হলে তাদেরও দায়মুক্তি ঘটবে, যা ব্যবসাবাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
উলেস্নখ্য, ১৯৯৩ সাল থেকে এনবিআরে ট্যাঙ্ ও কাস্টমসের মামলা দায়ের শুরম্ন হয়। তবে এ সময়ে যে হারে মামলার নিষ্পত্তি হয় তার প্রায় ৩০ গুণের চেয়েও বেশি মামলা দায়ের করা হয়। ট্যাঙ্ ফাঁকি, ট্যাঙ্ না দেয়া এবং এনবিআরের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করার লৰ্যেই মামলা করা হয়। একই সঙ্গে এনবিআরের সঙ্গে ট্যাঙ্ পেয়ারের মধ্যে ভ্যাট ডিমান্ডের বিরোধ নিয়েও মামলা দায়ের করা হয়।