মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১১, ৩০ অগ্রহায়ন ১৪১৮
পরের বার যখন আসবেন নিশ্চিত জানবেন, বলব চলুন আমি প্রস্তুত
জীবনের সঙ্গে দুর্লভ বোঝাপড়া ছিল কবীর চৌধুরীর
মোরসালিন মিজান
অনুমান করা মুশকিল, জীবনকে কী করে এতটা পড়ে ফেলেছিলেন কবীর চৌধুরী। কত যে বোঝাপড়া ছিল তাঁর জীবনের সঙ্গে! কখনও জীবনকে হাতের তালুতে নিয়ে লাটিমের মতো ঘুরিয়েছেন। আবার কখন নিশ্চিন্তে সমর্পিত হয়েছেন জীবনের একেবারে সাধারণ নিয়মের কাছে। এভাবে কেটেছে দীর্ঘ ৮৮ বছর। আর তার পর মঙ্গলবার পৃথিবীর পথে দীর্ঘ ভ্রমণ শেষ করেছেন তিনি। না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। বাঙালীর সকল দুর্দিনের ধ্রুবতারা খসে পড়ায় গোটা জাতি শোকাহত।
কিন্তু ওই যে জীবনের সঙ্গে বোঝাপড়ার গল্প! এ গল্পের কারণেই কবীর চৌধুরী নিজে মৃতু্য নিয়ে কখনও শঙ্কিত ছিলেন না। বরং ভাবা যেতে পারে, নিজের চাওয়া মতো সময়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন তিনি। তাঁর কবিতা, স্বহস্তে লেখা ইচ্ছাপত্র, সাৰাতকার একটু সচেতনভাবে খেয়াল করলে অদ্ভুত এ সত্যের সন্ধান মেলে।
আলোচনার প্রথমেই আসে একটি কবিতার প্রসঙ্গ। ২০০১ সালের ২৪ জানুয়ারি লেখা কবিতাটির শিরোনাম_ দরজায় টোকা। জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এটি লিখেছিলেন কবীর চৌধুরী। অত্যন্ত সহজ-সরল রচনায় জমদূতের সঙ্গে কথোপকথনরত অবস্থায় পাওয়া যায় তাঁকে। কল্পনাপ্রসূত হলেও, কথোপথনটির সঙ্গে বাস্তবতার আশ্চর্য রকম মিল। কবিতার শুরুটা এ রকম_ 'ঠুক ঠুক ঠুক। কে? ভেতরে আসুন। দরজা শুধু ভেজানো আছে।/ ও আপনি? তো কি খবর?/ কবীর চৌধুরীর এমন প্রশ্নের উত্তর প্রথমে কিছুটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন যমদূত। উল্টো জানতে চান_ 'তা, আপনি কি প্রস্তুত? যাবেন কি এখন?' সে সময়টির বর্ণনা করে অন্য পঙ্ক্তিতে কবীর চৌধুরী বলেন_ 'আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি। আমাকে দ্বিধান্বিত দেখে তিনি বলেন, যদি আরও কিছুকাল দেরি করতে চান/ তো করুন, আমার তেমন কোন সবিশেষ তাড়া নেই।/ তবে পরের বার যখন আসব তখন কিন্তু আর ইতসত্মত করার সময় পাবেন না।' এ পর্যায়ে জমদূতের কাছ থেকে পাঁচ-সাত বছর সময় অনেকটা চেয়েই নেন তিনি। এর কারণ ব্যাখা করে লিখেন_ 'আরও গোটা দশেক বই লিখবার ইচ্ছা আছে শুধু।/ তা হয়ে যাবে সেটা পাঁচ-সাত বছরের মধ্যেই।/' অবশ্য এ পরিমাণ বই লিখা না হলেও তিনি জমদূতকে আশ্বস্ত করেন এই বলে_ 'পরের বার যখন আসবেন/ নিশ্চিত জানবেন/ আমি বলব, চলুন, আমি প্রস্তুত।/ কোন দুশ্চিন্তা বা দুঃখবোধ দ্বারা আক্রান্ত/ হবো না আমি।'
বলা বাহুল্য, কবিতার কথোপথনই সত্য হয়েছে। রচয়িতা এর সত্যতা প্রমাণ করেছেন অথবা সত্যটি বহু আগে উপলব্ধি করার ৰমতা তিনি অর্জন করেছিলেন। জমদূত তাঁকে দশ বছর সময় বেশি দিয়েছিলেন। এ সময়ের মধ্যে দুই হাতে লিখেছেন তিনি। নতুন অনেকগুলো বই এ সময়ের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এরপর তাঁর দ্বারে কড়া নাড়ে মৃতু্য। সঙ্গত কারণেই তখন তিনি পুরো প্রস্তুত। জানা যায়, রাতে শিশুর মতো ঘুমুচ্ছিলেন তিনি। গভীর সে ঘুমের মধ্যেই মৃতু্য হয় তাঁর। সকালে মরদেহ পরীৰা শেষে চিকিৎসক জানান, বড় প্রশান্তির মৃত্যু ছিল। পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার সময় কোন কষ্ট তাঁর হয়নি। শেষ বারের মতো যাঁরা তাঁর মুখখানা দেখেছেন তাঁদেরও অভিমতটি এ রকম ছিল। কবীর চৌধুরীর পরিজন রামেন্দু মজুমদার জানান, এটিও তাঁর ইচ্ছার প্রতিফলন। বহুদিন হাসপাতালে শুয়ে থেকে কাউকে তিনি কষ্ট দিতে চাইতেন না। দিতেও হয়নি।
অল্প কিছু দিন আগে একটি সাৰাতকারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত এ বাঙালী বলেন, মৃতু্যর আগে দেখে যেতে চাই_ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচার শুরম্ন হয়েছে। তাঁর সে ইচ্ছাও অনেকাংশে পূরণ হয়েছে। গোলাম আযমকে গ্রেফতারের আইনী প্রক্রিয়া তিনি দেখে গেছেন।
মৃতু্য খুব সনি্নকটে জেনেই হয়ত সচেতনভাবে এবং স্বহসত্মে কিছু শেষ ইচ্ছার কথা লিখে গিয়েছিলেন তিনি। সে অনুযায়ী, খুব সাধারণ মানুষের মতো বিদায় নিতে চেয়েছিলেন তিনি। আর তাই মরদেহ শহীদ মিনারের সামনে রাখার অনুমতি দেননি। একটির বেশি জানাজা এড়িয়ে গেছেন। সাম্যের নীতিতে সারাজীবন অবিচল কবীর চৌধুরী সমাহিত হতে চেয়েছেন সাধারণ মানুষের মতো। তাঁর কবরে আরও নতুন কবর খোঁড়ার সুযোগ রাখারও নির্দেশ দিয়ে গেছেন। এ ৰেত্রেও তাই হয়েছে। মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সাধারণ মানুষের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়েছে বাঙালীর চেতনা জাগানিয়া শ্রেষ্ঠ এ মানুষটিকে।
তবে অনত্মিম বছরগুলো শুধু নয় বরং সারাজীবনই তিনি এমন গুছনো স্বভাবের ছিলেন। আর তাই জীবনকে তিনি পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। একইভাবে সবটুকু বিলিয়ে দিতে পেরেছিলেন প্রগতির জন্য, কল্যাণের জন্য। তাঁর গ্রহণের মানসিকতার কথা উলেস্নখ করে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক মফিদুল হক বলেন, সব সময় একটি বই তাঁর সঙ্গে থাকত। কয়েক মিনিটের অবসর জুটলেই পড়া শুরম্ন করে দিতেন। ফলে বাংলার একেবারে নবীন লেখকের লেখা সম্পর্কে তিনি জানতেন। একইভাবে জানতেন বিশ্বসাহিত্যের খবর। গ্রহণের পাশাপাশি তিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন অকাতরে। প্রচুর গ্রন্থ রচনা করে গিয়েছেন তিনি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাহিত্যকে বাঙালীর উপযোগী করে অনুবাদ করেছেন। একই উদ্দেশে দেশের সকল প্রগতিশীল আন্দোলন সংগ্রামে তাঁকে সামনের কাতারে পাওয়া গেছে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক জিলস্নুর রহমান সিদ্দিকী জনকণ্ঠকে বলেন, কবীর চৌধুরী আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার মতো ছিলেন। তাঁকে চিনি সেই পঞ্চাশের দশক থেকে। সে অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, সমসত্ম সামর্থ্য দিয়ে তিনি দেশকে সেবা করে গেছেন। কবীর চৌধুরীকে সকল নাগরিক আন্দোলনের পথপ্রদর্শক উলেস্নখ করে সাংবাদিক গবেষক শাহরিয়ার কবির বলেন, মৌলবাদ, যুদ্ধাপরাধ, সাম্রাজ্যবাদ এবং স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আজীবন লড়েছেন তিনি। সকল সঙ্কটের মুহূর্তে দেশ ও জাতির বিবেক হয়ে সামনে এসেছেন।
কবীর চৌধুরীর সাম্য চিনত্মার কথা জানিয়ে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মনজুরুল আহসান খান বলেন, এ কারণেই এত বড় একজন মানুষ সাধারণের মতো জীবনযাপন করেছেন। অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতা আড়ম্বর তিনি পছন্দ করেননি। জীবন ভাবনার চমৎকারিত্বের কারণেই এসব সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। এমন বোঝাপড়ার জীবন আরও পাক বাংলাদেশ, ভরে ওঠুক আলোয়_ কবীর চৌধুরীকে হারানো দিনে এমন প্রত্যাশাই ছিল সকলের।