মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০১১, ১৫ অগ্রহায়ন ১৪১৮
গ্রামের চিরচেনা রূপ আর আধুনিকতার সমন্বয় যেন এক স্বপ্নপুরী
নড়াইলের অরুণিমা এ্যাগ্রো ইকোপার্ক
রিফাত-বিন ত্বহা
এখনই সেই মৌসুম, যা পর্যটকদের কাছে প্রিয়। দেশের পর্যটন এলাকাগুলো এ সময় মুখরিত হয়ে ওঠে পর্যটকদের ভিড়ে। তাই পর্যটকদের ঢল নেমেছে অরুনিমাতেও। অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় পরিবেশ আর বিনোদনের আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধায় সন্তুষ্ট ভ্রমণপিপাসুরা। দেশের একমাত্র এগ্রো-ইকো-রিভারাইন-স্পোর্টস পর্যটন কেন্দ্র হলো 'অরুনিমা'। এর পুরো নাম অরুনিমা কান্ট্রিসাইড অব শাহ্বাজ টু্যরিজম্ লিঃ এবং মধুমতি টু্যরিজম লিঃ ও গল্ফ রিসোর্ট। ইতোমধ্যেই সেখানে ভিড় জমেছে বিনোদনপ্রিয় দেশী-বিদেশী পর্যটকদের। তাদের পদভারে এখন মুখরিত কৃষিভিত্তিক পরিবেশবান্ধব এ পর্যটন কেন্দ্রটি। গোটা শীত মৌসুম ধরেই পর্যটকদের ভিড়ে পরিপূর্ণ থাকবে নড়াইলের নড়াগাতী থানার পানিপাড়ার এ কান্ট্রিসাইডটি। দেশী বিদেশী পর্যটকদের আগমনে অনুন্নত পানিপাড়ায় লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। পর্যটকদের বিনোদনের পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থানের। সরকার আয় করছে রাজস্ব।
প্রতিনিয়ত দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত বিনোদনপ্রিয় মানুষ ও পর্যটক আসছেন চিত্রা-কাজলা-নবগঙ্গা ও মধুমতি বিধৌত বরেণ্য শিল্পী এসএম সুলতানের নড়াইলের এ অরুনিমা ইকোপার্কে। উপভোগ করছেন প্রকৃতিকে। আবাসিক সুবিধার তুলনায় পর্যটকদের ভিড় বেশি থাকায় রাত যাপন না করে অনেকেই দিনের বেলায় ফিরে যান। এজন্য বিনোদনপ্রিয় সচেতন লোকগুলো শীত মৌসুমের আগেভাগেই এ পর্যটন কেন্দ্রের কটেজগুলো বুকিং দিয়ে রেখেছেন। পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে।
দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আবাসিক সুবিধার জন্য এখানে রয়েছে এসি, নন-এসি ২০টি কটেজ; যার মধ্যে রুম রয়েছে ২৪টি এবং দুই-রুমবিশিষ্ট ভাসমান কটেজ রয়েছে একটি। এখানে আবাসিক বোটসহ প্রতিটি কটেজেই রয়েছে খাবারের সু-ব্যবস্থা। লেকের মাঝে রয়েছে দ্বীপ রেস্টুরেন্ট এবং সরকার অনুমোদিত মিনি বার। এ রেস্টুরেন্টে দেশী-বিদেশী খাবার, ফলের জুস, নিজস্ব খামারে উৎপাদিত সবজি ও মাছের ফ্রাইসহ আরও আছে অস্ট্রেলিয়ান মেশিনে তৈরি বারবিকিউ। এখানে আছে ৪শ' জনের সেমিনার বা কন্্ফারেন্সের ব্যবস্থা। এছাড়াও রয়েছে ৭৫ জনের আবাসিক সুবিধাসহ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা।
রাজধানী ঢাকা থেকে অরম্ননিমায় আসার সহজ একটি পথ রয়েছে। বিশ্বরোডে মাওয়া-কেওড়াকান্দি-ভাঙ্গা-ভাটিয়াপাড়া হয়ে গোপালগঞ্জের চন্দ্রদিঘলীয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে হাতের ডানে কিছুদূর গিয়ে বরফা ফেরিঘাট পার হলেই এই স্বপ্নপুরী ইকোপার্ক। আসতে সময় লাগবে সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা। খুলনা ও যশোর থেকে নড়াইলের কালিয়া হয়ে কান্ট্রিসাইডটিতে যেতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। এছাড়াও নড়াইল থেকে লোহাগড়া হয়ে মহাজন বাজার থেকে নবগঙ্গা ও মধুমতি নদী ফাইবার-বোটে পাড়ি দিয়ে ইকোপার্কে যাওয়া যায়। মহাজন থেকে নবগঙ্গা নদী পার হয়ে বড়দিয়া বাজার থেকে ভ্যান, মোটর-সাইকেল বা নছিমনযোগেও ইকোপার্কে যাওয়া যায়।
কৃষিভিত্তিক ও পরিবেশবান্ধব অরম্নণিমা সবুজ ছায়াঘেরা বনায়নে অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় পরিবেশে ৫০ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে অরম্ননিমা ইকোপার্ক। যা অরম্ননিমা ইকোপার্ক ও কান্ট্রিসাইড পানিপাড়া পর্যটন কেন্দ্র নামেও পরিচিত। বলা যেতে পারে, এটি একটি ফুল ও ফলের বাগান। আবার বলা যেতে পারে বৃহৎ একটি মাছের খামার। বিনোদনপ্রিয় মানুষের জন্য এখানে রয়েছে পিকনিকের ব্যবস্থা। মনে হবে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আবহমান গ্রাম-বাংলার চিরচেনা রূপ আর আধুনিকতার সুপরিকল্পিত সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে অরম্ননিমাকে। এ যেন মনের মাধুরী মেশানো কোন স্বপ্নপুরী।
এ পর্যটন কেন্দ্রের প্রবেশপথেই দেখা যাবে সারিবদ্ধ ঝাউগাছ, যেন আগন্তুককে অভ্যর্থনা জানাতে দাঁড়িয়ে আছে। হাজার হাজার ফুল ও ফলের চারাসহ বনজ ও ঔষধি বৃক্ষের চারা রোপণ করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ সৃষ্টি। যেমন রয়েছে আম, কাঁঠাল, লিচু, নারকেল, চেরি, স্টারআপেল, জলপাই, পেঁপে, কুলসহ অসংখ্য ফলের গাছ; তেমনি রয়েছে ড্যাফোডিল, ক্যামেলিয়া, লিলি, কুমারী পান্থ, পদ্ম, নীলপদ্ম, রঙ্গন, কাঞ্চন, দু'শ' প্রজাতির গোলাপ, মার্বেলটাস্ক, টগর, গ্যালাডুলাসসহ হরেকরকম ফুলের গাছ, যেগুলো পর্যটন কেন্দ্রের শোভাবর্ধনসহ প্রাকৃতিক রূপ এনে দিয়েছে। অরম্ননিমার অভ্যনত্মরে তিন একরের সবুজ মেহগনির বাগান যেন পরিণত হয়েছে সবুজ পাহাড়ে। এক একরের ঝাউবন, ৬৪৭টি আম্রপালি গাছের বাগান, ৫ কাঠার গোলাপ বাগান ও ১ হাজার ৪শ' প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি বৃক্ষ রয়েছে এখানে। ৬৬ বিঘা জমি নিয়ে রয়েছে ১৯টি বিশালাকৃতির পুকুর, যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করে দারম্নণভাবে। এসব পুকুরে রম্নই, কাতলা, মৃগেল, পাঙ্গাস, চিংড়ি, বোয়াল, কইসহ অর্ধ-শতাধিক প্রজাতির মাছ চাষ করে আয়ও হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
এখানকার গাছের ছায়ায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখির গান শুনতে শুনতে জলের ধারে অনায়াসে কাটিয়ে দেয়া যায় অনেকটা সময়। লেকের জলে ভাসমান পাখি আর দু'পাড়ের অসংখ্য গাছের ডালে পাখিদের সমারোহ দেখে অভিভূত হয়ে যান পাখি-প্রেমিকগণ। একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়ে শ্যামা, দোয়েল, ঘুঘু, কবুতর, টিয়া, ময়না, বুলবুলি, মাছরাঙ্গা, শালিখ, কোকিল, বক, হাঁসপাখি, বেলেহাঁস, রাজহাঁস, বক, পানকৌড়ি, সুঁইচোরা, চড়ুই, টুনটুনিসহ অসংখ্য বিলুপ্ত প্রায় দেশীয় পাখি। অসংখ্য অতিথি পাখির কলতান ভ্রমণপিয়াসী সবার মনেই জায়গা করে নেয়। এ রিসোর্টটিকে পাখি-সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করায় 'পাখির গ্রাম' নামেও এলাকাটির একটি পরিচিতি রয়েছে। এটি পরিণত হয়েছে পাখির অভয়ারণ্যে। পর্যটকদের বিনোদনের জন্য রয়েছে স্পীডবোট, প্যাডেল বোড, ২০ সিটের ভ্রমণ বোট, সুইমিং পুল, ঘোড়ার গাড়ি ও শিশুদের জন্য রয়েছে গেমস কর্নার। আরও রয়েছে একটি গলফ্ মাঠ।