মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২৩ নভেম্বর ২০১১, ৯ অগ্রহায়ন ১৪১৮
দেশবরেণ্য নারী নেত্রী একুশে পদকপ্রাপ্ত ডা. যোবায়দা আর নেই
মোঃ শাকিল মোলস্না, কুমিল্লা ॥ কুমিল্লার অর্ধশতাধিক সরকারী-বেসরকারী ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত থেকে দেশ ও সমাজের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ, কুমিল্লা ডায়াবেটিক হাসপাতালের উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, আমৃতু্য নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী দেশবরেণ্য নারী নেত্রী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত ডা. যোবায়দা হান্নান আর নেই। সোমবার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁকে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হলে মঙ্গলবার ভোর ৬টায় তিনি ইনত্মেকাল করেন(ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে কুমিল্লার রাজনৈতিক, পেশাজীবী, সরকারী-বেসরকারী সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানসহ সকল মহল যেন শোকবিহবল, প্রাণহীন, নিথর সত্মব্ধ হয়ে গেছে। তিনি স্বামী খ্যাতনামা চৰু বিশেষজ্ঞ ডা. ওয়ালী উলস্নাহ, দুই ছেলেসহ অনেক গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। বাংলাদেশ ডায়বেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী এবং মহাসচিব মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মরহুমার রুহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।
১৯৪৫ সালের ১৪ নবেম্বর এ মহীয়সী নারী চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মৃতু্যকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। তিনি তদানীন্তন পাকিসত্মান সরকারের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী মাহফুজুল হকের কন্যা। বৈবাহিক সূত্রে তিনি কুমিলস্না জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলার আশারকোটা গ্রামের স্থায়ী অধিবাসী হন। সামাজিক কর্মকা-ে অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একুশে পদক-২০০৪ এবং কুমিলস্নায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ডায়াবেটিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রপতি কতর্ৃক জাতীয় অধ্যাপক মোঃ ইব্রাহিম পুরস্কার-১৯৯৫ এবং সমাজসেবায় অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী কতর্ৃক জাতীয়ভিত্তিক সমাজসেবা পুরস্কার-১৯৯৭ লাভ করেন। এছাড়া শিৰা ও অর্থনীতিতে বিশেষ অদানের জন্য রোটারী ক্লাব অব মেট্রোপলিটন ঢাকা ফাউন্ডেশন কতর্ৃক সিড এ্যাওয়ার্ড, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অবদানের জন্য ঊষসী পুরস্কার-১৯৮৫, চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটি কর্তৃক ত্রিরত্ন পুরস্কার-১৯৯৬ লাভ করেছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে আমেরিকা, নেপাল, মালয়েশিয়া ও জাপানে আনত্মর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের পৰে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য এবং ৰেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ 'অনন্যা শীর্ষ দশ-২০০৫' পুরস্কার লাভ করেন।
যুগ যুগ ধরে অনেক নারী নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন স্বমহিমায় নিজের মহানুভবতা, কর্মনিষ্ঠা আর মানবজাতির প্রতি গভীর ভালবাসা দিয়ে। তাঁরা অর্জন করেছেন মানুষের অকুণ্ঠ ভালবাসা। ডা. যোবায়দা হান্নান তেমনি এক নাম। একজন ডাক্তার সর্বৰণই ব্যসত্ম থাকেন রোগীর সেবায়। কিন্তু মানুষের প্রতি ভালবাসার কারণে ডা. যোবায়দা হান্নান তাঁর চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি জড়িত হন নানান সমাজসেবামূলক কর্মকা-ে। সমাজের দারিদ্র্যপীড়িত ও অনগ্রসর শ্রেণীর জন্য তিনি পরিশ্রম করে গেছেন প্রতিনিয়ত, যার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন ২০০৪ সালে সমাজসেবায় একুশে পদক। ডা. যোবায়দা হান্নান আমৃতু্য কুমিলস্না জেলাসহ অন্যান্য জেলায় সমাজসেবায় বিশেষ অবদান রেখে গেছেন। তিনি অক্লানত্মভাবে কাজ করেছেন নারী শিৰা, কল্যাণ ও উন্নয়ন, গ্রাম উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম, চৰু চিকিৎসা, শিৰা কার্যক্রম এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে। কুমিলস্নায় ডা. যোবায়দা হান্নানের সমাজকর্মগুলো দীপ্যমান।
ডা. যোবায়দা হান্নান অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে ওঁৎপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হচ্ছে : তিনি প্রতিষ্ঠাতা ডা. যোবায়দা হান্নান মহিলা কলেজ, নাঙ্গলকোট (১৯৮৫), ডা. যোবায়দা হান্নান উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, নাঙ্গলকোট, (১৯৮৪), ডা. যোবায়দা হান্নান প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাঙ্গলকোট (১৯৯০)। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য : কুমিলস্না ডায়াবেটিক হাসপাতাল (১৯৮৫)। আজীবন সদস্য- ঝিনাইদহ ডায়াবেটিক সমিতি (১৯৯৪), বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি, ঢাকা (১৯৯৪), সমন্বিত অন্ধকল্যাণ পরিষদ, কুমিলস্না (১৯৯০), বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি, কুমিলস্না (১৯৯১), বিএমএ কুমিলস্না শাখা (১৯৯৪), বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (১৯৯০), সভাপতি : গাইনী ও অবস্টেটিক সোসাইটি (১৯৯৫), সামাজিক পুনরম্নদ্ধার ও সংশোধন কমিটি, কুমিলস্না (১৯৯১), নারী দীপিতা, কুমিলস্না (১৯৯০), নবাব ফয়জুন্নেছা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট (১৯৯৯), সহ-সভাপতি রম্নরাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট, কুমিলস্না (১৯৭৬), জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থা, কুমিলস্না (১৯৮৩), সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিটি, কুমিলস্না (১৯৮৫), প্রধান নির্বাহী বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অফথালমোলজি (বিকো) ও চৰু হাসপাতাল, আঞ্চলিক কমিশনার বাংলাদেশ গার্লস গাইড এ্যাসোসিয়েশন, কুমিলস্না অঞ্চল (১৯৮৮), চেয়ারম্যান- আরভিটিসি, জুরাইন, ঢাকা, সদস্য- বেইস, ঢাকা (১৯৮৫), আনত্মর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন (১৯৯০), উপদেষ্টা- মানসিক প্রতিবন্ধী শিৰা ও কল্যাণ সমিতি (১৯৯০), চেয়ারম্যান- প্রশিৰণ অনুষদ, বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতি কুমিলস্না (২০০৫)সহ অনেক সরকারী, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থেকে মানবসেবায় অসামান্য অবদান রাখেন।