মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২৩ নভেম্বর ২০১১, ৯ অগ্রহায়ন ১৪১৮
সাধারণ শিক্ষা উপেক্ষিত ॥ সুকৌশলে কয়েক হাজার নিকাহ রেজিস্ট্রারের চাকরি স্থায়ী
জিয়া আমলের বিধান মহাজোট আমলেও বহাল
তপন বিশ্বাস ॥ চারদলীয় জোট আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া কয়েক হাজার নিকাহ রেজিস্ট্রারের চাকরি স্থায়ী করা হয়েছে। মহাজোট সরকারের আমলে জারি করা মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন (সংশোধন) বিধিমালার মাধ্যমে তাদের চাকরি স্থায়ী করা হয়েছে। বিধিমালার মাধ্যমে সুকৌশলে তাদের চাকরি স্থায়ী করা হলেও অনেকের কাছে তা ছিল অজ্ঞাত। সম্প্রতি সুপ্রীমকোর্টে এ সংক্রান্ত একটি মামলা দায়েরের পর বিষয়টি নজরে এসেছে। সংশোধিত বিধিমালায় রেজিস্ট্রারের ৰেত্রে সাধারণ শিৰাকে বাদ দিয়ে শুধু মাদ্রাসা শিৰাকে যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) বিধিমালা ১৯৭৫-এর অধীনে নিকাহ রেজিস্ট্রার অস্থায়ীভাবে নিয়োগের বিধান ছিল। এর বিধি ৫-এর উপবিধি ২ ও ৩ অনুযায়ী বিধি ৪-এর অধীনে গঠিত উপদেষ্টা কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বিধি ৫-এর উপবিধি ৪-এর অধীনে স্থায়ী নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ দানের বিধান ছিল। সাধারণত আইন মন্ত্রণালয় থেকে বিধি ৫-এর উপবিধি ১ অনুযায়ী কোন ব্যক্তিকে অস্থায়ী নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ দান করে একই সঙ্গে বিধি ৫-এর উপবিধি ২, ৩ ও ৩(ক) অনুযায়ী স্থায়ী নিয়োগের জন্য উপযুক্ত প্রার্থী বাছাইক্রমে তিন জনের একটি প্যানেল পাঠানোর জন্য জেলা কমিটিকে নির্দেশ দেয়া হতো। এর ধারাবাহিকতায় বিগত জোট সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় কয়েক হাজার অস্থায়ী নিকাহ রেজিস্ট্রারকে নিয়োগ প্রদান করা হয়।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগে দুর্নীতি রোধে ১৯৭৫ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন বিধিমালা বাতিল করে ২০০৯ সালে নতুন করে এই বিধিমালা জারি করা হয়। নতুন এই বিধিমালায় অস্থায়ী নিকাহ রেজিস্ট্রারের নিয়োগের কোন বিধান রাখা হয়নি। কিন্তু উক্ত বিধিমালার বিধি ৪১-এর ১৯৭৫ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন বিধিমালার অধীনে কৃতকার্যবলীকে বৈধতা দিয়ে হেফাজত করা হয়েছে। এতে ১৯৭৫ সালের বিলুপ্ত বিধিমালার আলোকে চারদলীয় জোটের রাজনৈতিক বিবেচনায় অস্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কয়েক কাজার অস্থায়ী নিকাহ রেজিস্ট্রারকে স্থায়ী করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওই বিধিমালার ৪১ বিধির উপবিধি ১-এ বলা হয়েছে 'মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা ১৯৭৫ অতঃপর উক্ত বিধিমালা বলিয়া উলেস্নখিত এতদ্বারা রহিত করা হলো।' উপবিধি ২-এ বলা হয়েছে উক্তরূপ রহিতকরণ সত্ত্বেও, উক্ত বিধিমালার অধীনে গৃহীত যে কোন কার্যক্রম এমনভাবে অব্যাহত থাকবে যেন উক্ত কার্যক্রম এই বিধিমালার অধীনে সূচিত হয়েছে। আর নতুন এই বিধিমালায় অস্থায়ী নিয়োগের কোন বিধানই রাখা হয়নি। সে ৰেত্রে বিগত আমলের নিয়োগপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রারের নিয়োগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থায়ী হয়ে যাবে।
নতুন এই বিধিমালায় নিবন্ধন ফি আড়াই শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তালাক নিবন্ধন ফি বাড়ানো হয়েছে ১০ গুণ। তবে বাদ দেয়া হয়েছে নিকাহ্ রেজিস্ট্রারের অবসরের বয়সসীমা ৬৭ করার প্রসত্মাবটি। মাদ্রাসা বোর্ড থেকে পাস করা জামায়াতপন্থীদের নিকাহ্ রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ দেয়ার উদ্দেশে মহাজোট সরকারের আমলেও শিৰাগত যোগ্যতার ৰেত্রে বহাল রাখা হয়েছে জিয়াউর রহমানের আমলের বিধান। সাধারণ শিৰাকে পাশ কাটিয়ে মাদ্রাসা শিৰাই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। বয়স সংক্রানত্ম বিষয়ে বর ও কনের অভিভাবকের ওপরই দায়-দায়িত্ব ন্যসত্ম করা হয়েছে।
এতে বিধিমালায় বিবাহ নিবন্ধন ফি আদায়ের ৰেত্রে কোন সীমাবদ্ধতা রাখা হয়নি। এতে বলা হয়েছে, একজন নিকাহ্ রেজিস্ট্রার ৪ লাখ টাকা পর্যনত্ম দেনমোহরের ৰেত্রে প্রতি এক হাজার টাকা দেনমোহর বা এর অংশবিশেষের জন্য ১২ দশমিক ৫০ টাকা হারে বিবাহ নিবন্ধন করতে পারবেন। দেনমোহরের পরিমাণ ৪ লাখ টাকার অধিক হলে পরবর্তী প্রতি ১ লাখ টাকার দেনমোহর বা এর অংশবিশেষের জন্য ১শ' টাকা বিবাহ নিবন্ধন ফি আদায় করতে পারবেন। তবে দেনমোহরের পরিমাণ যাই হোক না কেন সর্বনিম্ন ফি ২শ' টাকার কম হবে না। আগে দেনমোহরের ১০ শতাংশ হারে নিকাহ্ রেজিস্ট্রার সর্বোচ্চ ৪ হাজার টাকা পেতেন। এখন এ ৰেত্রে কোন সীমাবদ্ধতা থাকল না।
একজন নিকাহ্ রেজিস্ট্রার তালাক নিবন্ধনের জন্য ৫শ' টাকা ফি গ্রহণ করতে পারবেন। এছাড়া নকল প্রাপ্তি ফি ৫০ টাকা, যাতায়াত বাবদ ফি প্রতি কিলোমিটার ১০ টাকা হারে এবং তলস্নাশি ফি ১০ টাকা গ্রহণ করতে পারবেন। আগে নিবন্ধন ফি ছিল ৫০ টাকা। এ ৰেত্রে ফি বেড়েছে ১০ গুণ।
জারিকৃত সংশোধিত বিধিমালায় শুধু মাদ্রাসা বোর্ড থেকে প্রয়োজনীয় শিৰাগত যোগ্যতা অর্জনের বিধান বহাল রাখা হয়েছে। এতে বিগত আমলের (জিয়াউর রহমানের শামনামলে) বিধান মহাজোট সরকারের আমলেও বহাল রাখা হলো।
উলেস্নখ্য, ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে মুসলিম (বিবাহ ও তালাক) নিবন্ধন আইন ১৯৭৪-এর অধীনে মুসলিম (বিবাহ ও তালাক) রেজিস্ট্রেশন বিধি জারি করা হয়। উক্ত বিধিমালায় নিকাহ রেজিস্ট্রারদের যোগ্যতার ৰেত্রে শুধু মাদ্রাসা থেকে পাস করা ব্যক্তিদের নিয়োগের বিধান করা হয়। এতে সমমানের শিৰাগত যোগ্যতাধারীরা অর্থাৎ উচ্চ মাধ্যমিক পাস ব্যক্তিরা নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ লাভ থেকে বঞ্চিত হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের এই নিয়োগ বিধিমালার আলোকে জামায়াতপন্থীদের নিয়োগ প্রদানের আইনগত সুযোগ সৃষ্টি করেন। পাশাপাশি ১৯৭৯ সালে আলীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য মাদ্রাসা বোর্ড অধ্যাদেশও জারি করেন। ফলে মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা থেকে পাস করা জামায়াতপন্থী হাজার হাজার লোক নিকাহ রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ লাভ করে। অথচ মুসলিম (বিবাহ ও তালাক) নিবন্ধন আইন ১৯৭৪-এর কোন বিধানে বলা হয়নি যে, নিকাহ রেজিস্ট্রার পদে কেবল আলীম বা দাখিল পাসকৃতদের নিয়োগ করতে হবে।
আইনের উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বাইরে গিয়ে জামায়াতপন্থীদের নিয়োগ দেয়ার জন্য শুধু মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে ডিগ্রীপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই বিধানটি করা হয়। এতে সাধারণ শিৰার অন্যান্য বোর্ডের অধীনে যাঁরা এইচএসসি বা স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেছেন তাঁরা এই নিয়োগ লাভে বঞ্চিত হচ্ছেন। শুধু একটি শ্রেণীকে নিয়োগ লাভের সুযোগ প্রদানের জন্য প্রণীত এই বিধিমালা সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৯-এ বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কোন নিয়োগের ৰেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৯ সালে প্রণীত উক্ত বিধিমালা বিগত কোন সরকারই পরিবর্তন করেনি। মহাজোট সরকার আসার পর পরই এই বিধিমালা পরিবর্তনের লৰ্যে নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগের যোগ্যতা ডিগ্রী বা দাখিল পাস নির্ধারণের প্রসত্মাব করা হয়। একই সঙ্গে নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগের বাছাই কমিটি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নির্ধারণ করারও প্রসত্মাব করা হয়। কিন্তু ২০০৯ সালের বিধিমালাটি জারির পূর্বে রহস্যজনক কারণে নিকাহ রেজিস্ট্রারের যোগ্যতা জিয়াউর রহমানের শাসনামলের ন্যায় বহাল রেখে রাতারাতি বিধিটি জারি করা হয়।
সংশোধিত বিধিমালায় জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন সনদ ইত্যাদি পর্যবেৰণের জন্য বর ও কনের জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদ বা জুনিয়র সার্টিফিকেট বা মাধ্যমিক সার্টিফিকেট বা সমমানের পরীক্ষার সনদ পরীৰার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। উলিস্নখিত কাগজপত্র না থাকলে বর ও কনের বয়স সম্পর্কে তাদের মাতা-পিতা বা আইনানুগ অভিভাবক বয়স সংক্রান্ত হলফনামা প্রদান করবেন।