মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২৩ নভেম্বর ২০১১, ৯ অগ্রহায়ন ১৪১৮
বাঙালিত্ব চর্চার বাতিঘর ছায়ানট, সরব মুক্তির গানে
অর্ধশতবার্ষিকী উদ্যাপনে ব্যাপক প্রস্তুতি
মোরসালিন মিজান
ওয়াহিদুল হক আজ বেঁচে নেই। তবে ছায়ানট পেয়েছে নতুন প্রাণ। সন্জীদা খাতুন বয়সের ভারে নু্যব্জ। কিন্তু যৌবনটুকু তিনি ছায়ানটকে বিলিয়েছেন। এভাবে নিবেদিতপ্রাণ বহু মানুষের প্রেম আর শ্রম ঘামে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বাঙালিত্ব চর্চার শ্রেষ্ঠ এ প্রতিষ্ঠান। স্বপ্নদ্রষ্টাদের নাম অনেকে জানেন না। কিন্তু ছায়ানটকে জানেন। জানতে কেউ কেউ বাধ্য হয়েছেন। কারণ ধানমণ্ডির শঙ্করে অবস্থিত সংস্কৃতি ভবন বর্তমানের নয় শুধু। ভবিষ্যতের বাতিঘর। আর এ বাতিঘরের বয়স এখন পঞ্চাশ! অফুরান আনন্দের এ বারতা ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে বাতাসে। চলছে নানা উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি।
তবে শুরুটা শঙ্কাযুক্ত ছিল। তখন ১৯৬১ সাল। মোটা মাথার পাকিস্তানীরা পারলে বাঙালীদের নতুন করে বাপ দাদার নাম শেখায়। এ অবস্থায় নিজের শিকড় আঁকড়ে থাকা কঠিন কাজ। তবে হাল ছাড়লে হবে কেন? তাই জন্মশত বার্ষিকীতে 'হিন্দু' রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করার উদ্যোগ নেন কয়েকজন প্রগতিশীল। বিচারপতি মাহবুব মুর্শেদ, ডক্টর গোবিন্দচন্দ্র দেব, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মতো মুক্ত চিন্তার মানুষেরা সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দেন। এগিয়ে আসেন ঢাকার গোপীবাগ র্যাঙ্কিন স্ট্রিটের সংস্কৃতিকর্মীরা। সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুবের রক্তচৰু উপেৰা করে উদ্যাপিত হয় রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী। রচিত হয় বিরল এক ইতিহাস। আর এ ইতিহাসই পরে যুক্ত হয় ছায়ানটের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সভাপতি বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সন্জীদা খাতুন জনকণ্ঠকে জানান, সফল এ আয়োজনের পর সকলে মিলে বনভোজনে জয়দেবপুর যান। এ দলে ছিলেন সিধু ভাই (মোখলেসুর রহমান), রোজ বু (শামসুন্নাহার রহমান), সাংবাদিক আহমেদুর রহমান, ছানা (মীজানুর রহমান), মানিক (সাইফউদ্দীন আহমেদ), কবি সুফিয়া কামাল, সাইদুল হাসান, ফরিদা হাসান, ওয়াহিদুল হক এবং আরও কয়েকজন। সেখানে বসেই সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্য সমিতি গঠন করা হয়। এ সমিতিই আজকের ছায়ানট। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, কাজ প্রাধান্য দিতে গিয়ে ছায়ানটের পুরনো কাগজপত্রসহ অনেক কিছুই তেমন সংরৰণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে ছায়ানটের প্রথম সভা, প্রথম কমিটি ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত জানা মুশকিল এখন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সন্্জীদা খাতুন নিজেও স্মৃতি হাতড়ে কিছু বের করতে পারেননি। ফলে ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয় বটে। মাঠে মারা গেছে জন্মদিন পালনের সুযোগটি! তবে উদ্দেশ্য সব সময় পরিষ্কার। সে উদ্দেশ্য চমৎকার ব্যাখ্যা করে ছায়ানটের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগ্রামের পুরোধা ওয়াহিদুল হক লিখেছিলেন_ ছায়ানট এখন বাঙালিত্ব চর্চার এক পীঠস্থান, যে বাঙালিত্বের মধ্য দিয়ে বিশ্বমানবতায় পৌঁছতে চায় ছায়ানট। তাঁর মতে, সংস্কৃতি জন্ম দেয় জাতীয়তার, দেশের, রাষ্ট্রের, রাজনীতির এবং পরম গুরম্নত্বের সমাজ-সুনীতির। ছায়নটের কাজটা এই সব কিছুর_উদার_বিসত্মার এবং গভীর_ একাধারে ব্যাস্টিক ও সামস্টিক চরিতার্থতার সাধনা। সে সাধনায় কেটেছে ছায়ানটের পঞ্চাশ বছর। আর পঞ্চাশে উনি্নত করায় নারী হয়েও যিনি বিস্ময়কর ভূমিকা পালন করেছেন এবং করছেন তিনি সন্জীদা খাতুন। অর্ধশতাব্দীর ছায়ানট। ভাবতে কেমন লাগে? জানতে চাইলে সন্জীদা কয়েক সেকেন্ড নীরবে পার করেন। তারপর বলেন, কীভাবে চলে গেল এতগুলো দিন! সত্যি এ এক আশ্চর্য অনুভূতির ব্যাপার! এ কথা বলে বোঝানো দুঃসাধ্য কাজ। অত্যনত্ম প্রতিকূল সময়ে বাঙালী সংস্কৃতির বোধ ফিরিয়ে আনার লৰ্য নিয়ে আমরা কাজ শুরম্ন করেছিলাম। সেটি আজ যথেষ্ট পূর্ণতা পেয়েছে। 'স্থির প্রত্যয়ে যাত্রা' ভবিষ্যতেও একইভাবে অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, সরকারী চাকরি করার কারণে বহু কাল নেপথ্যে কাজ করতে হয়েছে সন্জীদা খাতুনকে। ছায়ানটের প্রথম দিককার কার্যক্রম পরিচালিত হতো মোখলেসুর রহমানের বাসা থেকে। তখন সভাপতি ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ফরিদা হাসান। তাঁদের সামনে রেখে কাজ এগিয়ে নিতেন ওয়াহিদুল হকের মতো দূর দৃষ্টি সম্পন্ন প্রাজ্ঞজনেরা। এ জন্য কর্মীদের প্রধান শক্তি করা হয়েছিল। এ সম্পর্কে ওয়াহিদুল হকের লেখাটি এ রকম_ ছায়ানটের ছিল এক দৃঢ়সংবদ্ধ নিবেদিতচিত্ত কমর্ী বাহিনী। নেতৃত্বের ব্যাপারটি চিরকাল গৌন ছিল। নিজের লেখায় দুই কর্মীর কথা বিশেষভাবে উলেস্নখ করেছিলেন ওয়াহিদুল হক। একজন আজকের সভাপতি সন্জীদা খাতুন। অন্যজন শামসুন্নাহার রহমান। বাকিদের মধ্যে তিনি উলেস্নখ করেন হোসনে আর মাক্কি, শামসুন্নাহার আহমেদ, সায়েরা মহিউদ্দীন, নুরম্নন্নাহার আবেদীন, কামাল লোহানী, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, সাইফুদ্দৌলা প্রমুখের নাম।
জানা যায়, ছায়ানটের কার্যক্রম শুরম্ন হয়েছিল পুরনো গানের আসর দিয়ে। বাঙালীকে তার ইতিহাসের সঙ্গে একাত্ম করতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে তখনও নিশ্চিত হয়নি যে, ছায়ানট সঙ্গীত ৰেত্রেই প্রধানত কাজ করবে। ধীরে ধীরে এ লৰণ স্পষ্ট হতে থাকে এবং তা সন্জীদা খাতুনের হাত ধরেই। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের বিষয়টিকেও বিশেষ গুরম্নত্ব দেয়া হয়। এ জন্য শিল্পী ও যন্ত্রী সংগ্রহ এবং তৈরির কাজ চলে। তাদের অংশগ্রহণে কিছু কালের মধ্যেই অনুষ্ঠানগুলো জনপ্রিয় হয়ে ওঠতে থাকে। ছায়ানটের আলোচিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে আরও ছিল ঋতুভিত্তিক বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠান। ১৯৬৭ সালে রমনার অশ্বত্থ তলায় শুরম্ন হওয়া পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানটি তো এখন বাঙালী সংস্কৃতির গুরম্নত্বপূর্ণ অংশ। এ ছাড়া শুরম্ন থেকেই মানবতার পাশে দাঁড়ানোকে কর্তব্য হিসেবে নেয় ছায়ানট। সেই ১৯৬২ সালে দৰিণ উপকূলে প্রাকৃতিক দুর্যোগগ্রসত্ম মানুষের জীবন বাঁচাতে কাজ করে এর কমর্ীরা। ১৯৭০ সালের ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাসের সময় ত্রাণ নিয়ে ছুটে যায় ছায়ানট। এভাবে যখনই প্রয়োজন হয়েছে তখনই মানবতার জন্য কাজ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এর কমর্ীদের ছিল অনন্য সাধারণ ভূমিকা। বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গানে গানে স্বাধীনতার মর্মবাণী ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁরা। জানা যায়, শুধু মুক্তিযুদ্ধের শেষ ছয় মাসে মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থার ব্যানারে ছায়ানটের কমর্ীরা দুই শতাধিক সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করে। স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশেও কর্তব্য নির্ধারণ করতে ভুল করেনি ছায়ানট। সব ধরনের অপশক্তির বিরম্নদ্ধে লড়ে নিজের সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে। আর তাই বার বার আঘাত এসেছে। বিশেষ করে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বর্বর বোমা হামলার ঘটনাটির কথা কোন দিনই হয়ত ভুলতে পারবে না বাঙালী। এ প্রসঙ্গে ডা. সারওয়ার আলী বলেন, এ আঘাত সকল বাঙালীর বুকে বিঁধে আছে। তবে ছায়ানট থামতে যানে না। বরং সামনের পানে এগিয়ে চলেছে।
আর এ এগিয়ে চলার জন্য একটি স্থায়ী ভবনের খুব দরকার ছিল। সে লৰ্যে বহু দিন ধরে কাজ চলছিল। তবে এ ৰেত্রেও সংগ্রাম! জান যায়, বহু কাল এ ঠিকানায় ও ঠিকানায় কার্যক্রম পরিচালনার পর ১৯৯৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরম্নল হক হলের পাশে একটি জায়গা বরাদ্দ পায় ছায়ানট। এখানেই পাঁচতলা ভবনের ভিত্তিপ্রসত্মর স্থাপন করেন কবি সুফিয়া কামাল। কিন্তু কিছু সন্ত্রাসী ছাত্র ভিত্তিপ্রসত্মর গুঁড়িয়ে দেয়। তবে ওই যে, হাল ছাড়া যাবে না। সুতরাং আবার শুরম্ন হয় নতুন করে। এবার সাবেক অর্থমন্ত্রী এএমএস কিবরিয়ার সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয় ছায়ানট কমর্ীদের। প্রথমবারের মতো জানা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন ছায়ানটেরই ছাত্রী। এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কেউ কেউ ছিলেন ছায়ানটের কাছের মানুষ। ফলে নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে ২০০০ সালে ছায়ানটকে ধানম-ির মতো গুরম্নত্বপূর্ণ জায়গায় প্রায় এক বিঘা জমি দেয় শেখ হাসিনা সরকার। এখানেই পরে বহু দিনের স্বপ্ন পূরণের কাজ শুরম্ন হয়। ২০০২ সালের এপ্রিলে নির্মাণের ছাড়পত্র দেয় রাজউক। তবে সরকার ততদিনে বদলে গেছে। আর তাই নতুন বিপত্তি। চারদলীয় জোট সরকার নানা অযুহাতে ছায়ানট ভবনের বিরম্নদ্ধে দাঁড়ায়। অনুমোদিত নকশার সঙ্গে পরিবর্তনের অভিযোগে কাজ স্থগিত করে দিতে একদম দেরি করেনি রাজউক। পরে তিন তিনবার নকশা জমা দেয়া হয়। কিন্তু রাজউকের মন গলতে চায় না। এ সময়টির কথা উলেস্নখ করে সন্জীদা খাতুন জনকণ্ঠকে বলেন, তারা আমাকে নানাভাবে অপমান অপদস্থ করার চেষ্টা করেছেন। তবে আমি থামিনি। জানা যায়, এভাবে চলে যায় দুই বছর। পরে সংস্কৃতিসেবী ও সংবাদকমর্ীরা সরব হলে ২০০৫ সালে নকশাটি অনুমোদন দেয় রাজউক। সকল সুহৃদের ঐকানত্মিক প্রচেষ্টায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় ছায়ানট ভবন। বিশাল এ ভবনের প্রতিটি ইট-কাঠ এখন তুলে ধরছে বাঙালী সংস্কৃতির মাহাত্ম্য। ছায়ানটের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক খায়রম্নল আনাম শাকিল জানান, দিন দিন এর কার্যক্রম বাড়ছে। এখন সঙ্গীত বিদ্যায়তন, শিকড়, ভাষার আলাপ ও সুরের জাদু রঙের জাদু শিরোনামে চলছে কয়েকটি কার্যক্রম। সঙ্গীত বিত্যায়তনে বিশুদ্ধ বাংলা সঙ্গীতের চর্চা হচ্ছে। শিকড়ের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে নিজ দেশের পাখি, ফুল, নদী, ঋতু ইত্যাদি নানা বিষয় শেখানো হচ্ছে। ভাষার সৌন্দর্য বজায় রাখতে চলছে ভাষার আলাপ কার্যক্রম। অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে সুরের জাদু রঙের জাদু নামের গান ও ছবি অাঁকার কোর্স। প্রতিদিন অসংখ্য ছেলে মেয়ের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠছে ছায়ানট। তবে এ মুখরতায় নতুন মাত্রা যোগ হবে আগামী শুক্র ও শনিবার। এ দু্ই দিন বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হবে ছায়ানটের পঞ্চাশ বছর পূর্তি। সে লৰে সকল প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। আনন্দের ঝর্ণাধারায় এখন শুধু ভেসে যাওয়ার প্রতীক্ষা। প্রিয় এ প্রতীৰায় আরও পঞ্চাশ আসুক। পঞ্চাশের পর পঞ্চাশে ঘুরে দাঁড়াক দেশ_ আমাদের তাই প্রত্যাশা।