মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ১১ অক্টোবর ২০১১, ২৬ আশ্বিন ১৪১৮
গজল সম্রাট জগজিৎ সিং আর নেই
জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত গজল সম্রাট জগজিৎ সিং আর নেই। দীর্ঘ রোগ ভোগের পর সোমবার সকালে মুম্বাইয়ের লীলাবতী হাসপাতালে স্বজন ও ভক্তশ্রোতা সবাইকে শোকসাগরে ভাসিয়ে চিরবিদায় নিলেন সবার প্রিয় এ গায়ক। মসত্মিষ্কে রক্তৰরণের কারণে ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে মুম্বাইয়ের লীলাবতী হাসপাতালে ভর্তির পর মস্তিষ্কে জরুরী অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর আইসিইউতে রাখা হয় তাঁকে। প্রায় তিন সপ্তাহ পর সেখানেই তাঁর মৃতু্য ঘটে। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০। খবর এএফপি, বিবিসি ও টাইমস অব ইন্ডিয়া অনলাইনের।
জগজিৎ সিং উত্তর ভারতের রাজস্থান রাজ্যের শ্রী গঙ্গানগরে এক দরিদ্র পরিবারে ১৯৪১ সালের ৮ ফেব্রম্নয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। বাবা অমর সিং এবং মা বচন কাউরের ১১ সনত্মানের মধ্যে জগজিৎ ছিলেন তৃতীয়। জগজিতের সঙ্গীতচর্চার শুরম্ন ছেলেবেলা থেকেই। হরিয়ানার কুরুক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে গ্রাজুয়েট জগজিৎ গঙ্গানগরের অন্ধ সঙ্গীত শিক্ষক পণ্ডিত ছগনলাল শর্মার কাছে দু'বছর তালিম নেন। এর পরের ছয় বছর ভারতীয় ক্ল্যাসিক সঙ্গীতে সাইনিয়া ঘরানার গুরম্ন জামাল হোসেনের কাছে শেখেন খেয়াল, ঠুমরি আর ধ্রুপদ। একদিন ভাগ্যান্বেষণে মুম্বাই (বোম্বে) আসেন। এখানে তিনি বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল ও পার্টিতে গান গাওয়া শুরম্ন করেন। এক পর্যায়ে '৭০ ও '৮০-এর দশকের মাঝামাঝি স্ত্রী চিত্রার সঙ্গে গান গেয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছেন। গজলের পাশাপাশি জগজিৎ বলিউডের হিন্দী ফিল্মের জন্য গান লেখেন ও কণ্ঠ দেন। বিশেষ করে ১৯৮১ সালে 'প্রেমগীত' ও পরের বছর 'আর্থ' ছবির সঙ্গীতের জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। গত শতাব্দীর আশির দশকের হিন্দী সিনেমা আর্থ, প্রেমগীত, সাথ সাথ থেকে নিয়ে হালের দুশমন, সারফারোশ, তুম বিন, তারকিবসহ তাঁর গাওয়া সব ফিল্ম সঙ্গীতই পেয়েছে তুমুল জনপ্রিয়তা। সর্বশেষ তিনি 'খুশীবান' ছবিতে গান করেন।
উপমহাদেশের সঙ্গীতাকাশে মেহেদি হাসান, নূরজাহান, বেগম আখতার এবং তালাত মেহমুদ; যাঁরা ছিলেন জগজিতের আশৈশব স্বপ্নের তারকা, সেই একই আকাশে নক্ষত্র হয়ে জ্বলে ওঠেন তিনি। প্রায় পাঁচ যুগের দীর্ঘ সময়ে জগজিতের এ পর্যনত্ম ৮০টি এ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৩ সালে ভারত সরকারের সর্বোচ্চ খেতাব পদ্মভূষণে সম্মানিত এ শিল্পী গত চার দশক ধরে একাধারে হিন্দী, পাঞ্জাবী, উর্দু, বাংলা, গুজরাটী, সিন্ধী ও নেপালী ভাষায় গান শুনিয়ে এসেছেন উপমহাদেশের শ্রোতাদের। '৯০ দশকের প্রথম দিকে ঢাকার শেরাটন হোটেলের (রূপসী বাংলা) বলরম্নমে এক কনসার্টে গান গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন জগজিৎ। বাণিজ্যিক সাফল্যের বিচারে জগজিৎকে ভারতের সর্বকালের সেরা গজল গায়ক ও সঙ্গীতকার হিসেবে মানা হয়।
কাব্যিক ঢঙে গজল পরিবেশনের রীতি মধ্যপ্রাচ্যে শুরম্ন হলেও দ্বাদশ শতকে তা ভারতেও ছড়িয়ে পড়ে। তবে '৭০ দশকের আগ পর্যনত্ম এ ধরনের গায়কী ঢঙ কেবল এলিট শ্রেণীতেই সীমাবদ্ধ ছিল। জগজিৎ সিং প্রথমবারের মতো গজলের গায়কী এ ঢঙ সাধারণ জনগণের কাছে তুমুল জনপ্রিয় করে তোলেন। তিনি গজলে ভারতীয় ক্ল্যাসিক ঢঙের সঙ্গে পশ্চিমা যন্ত্রের মিশেল ঘটান। এতে গজল আধুনিক রূপ নেয়।
১৯৬৯-এর ডিসেম্বরে বিয়ে করেন জগজিৎ সিং আর চিত্রা। এরপর ওয়ার্ডেন রোডের ছোট্ট এক রম্নমের বাড়িতে সংসার শুরম্ন হয় গজল দুনিয়ার জনপ্রিয়তম জুটি জগজিৎ-চিত্রা সিংয়ের। ১৯৭১ সালে জগজিৎ-চিত্রা দম্পতির ঘরে আসে একটি পুত্রসনত্মান, যার নাম রেখেছিলেন বিবেক। ১৯৭৬ সালে জগজিৎ আর চিত্রা সিংয়ের প্রথম লংপেস্ন রেকর্ড বা এলপি এ্যালবাম 'আনফরগট্যাবলস' প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি জগজিৎ সিংকে। তুমুল ব্যবসা, জনপ্রিয়তা, ছবিতে গান গাওয়ার অফার সব যেন পস্নাবনের ঢলের মতোই নেমে আসে।
তাঁর গাওয়া বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে রয়েছে_ এক দইয়ে দৌলত ভি লে লো, আপনিহি আপকো জিন্দা রাখনা কিতনা মুশকিল হ্যায়, হোঁটোসে ছুলো তুম মেরা গীত অমর কার দোদ, দমেরা কাতিল মেরা মুন্সিফ হ্যায় কেয়া ইন্সাফ ও মুঝেস কারেগাদ। গজলশিল্পী জগজিৎ সিং যে গানটি গেয়ে দুনিয়াজুড়ে সঙ্গীতভক্তদের হৃদয়মন্দিরে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন সেটি হলো- ইয়ে দৌলতভি লে লো/ ইয়ে শোহরতভি লে লো/ ভালে মুঝ সে ছিন লো মেরি ইয়ে জওয়ানি/মাগার মুঝকো লওটা দো বাচপান কা সাওয়ান/ ও কাগাজ কি কাশি্ত ও বারিশ কি পানি...।