মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ১১ অক্টোবর ২০১১, ২৬ আশ্বিন ১৪১৮
ধান গাছে পাখি_ ধ্বংস করছে শত্রুপোকা, উৎপাদনে সহায়ক
সরকারের কৃষিবান্ধব পরিকল্পনায় সাফল্য
তাহমিন হক ববি, নীলফামারী
আমন ধানের ক্ষেতে ধৈঞ্চা গাছ। সেই গাছে উড়ে এসে বসছে পাখি। ঘাপটি মেরে ধরে ধরে খেয়ে নিচ্ছে ৰেতের শত্রু পোকা মাকড়। আর উপকারী পোকার বংশ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করছে।
আমন ক্ষেতে মাজরা, পাতা মোড়ানো, ঘাসফড়িং, চুঙ্গি, লেদাপোকা প্রভৃতি ক্ষতিকারক পোকামাকড় আক্রমণে কৃষককে এখন আর রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগ করতে হচ্ছে না। ওই পাখি কীটনাশকের কাজ করে ফেলছে। এতে করে কৃষককুল বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে। আর ওই গাছের গুটিফল আর পাতা আমন ৰেতে ঝরে পড়ে তৈরি করছে জৈব সার।
ই-কৃষি প্রযুক্তির পাশাপাশি এবার রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার কমিয়ে আনতে বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব পরিকল্পনায় নজিরবিহীন সাফল্য নিয়ে এসেছে লাইভ পার্চিং। উত্তরের নীলফামারীসহ রংপুর বিভাগের আট জেলার কৃষককুলের কৃষিবান্ধব পার্চিং পদ্ধতির কার্যকারিতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আগামীতে এর পরিধি ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়বে বলে কৃষকরা মনে করছেন।
কৃষকরা বলছে ই-কৃষি যেমন তাদের চাষাবাদে সময় কমিয়ে এনেছে, তেমনি লাইভ পার্চিং পদ্ধতি কীটনাশক ব্যবহার না করে ফসলের ক্ষেতে ক্ষতিকারক পোকা দমনের পথ দেখিয়ে জৈব সারও দিয়েছে। কৃষকরা বলছে, লাইভ পার্চিং পদ্ধতি বিশেষ করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে তাদের মাঝে। কারণ এ পদ্ধতি প্রয়োগে ফসলের ৰেতে রোপণ করতে হয়েছে আফ্রিকান ধৈঞ্চা নামের গাছ। যে গাছটির চারা কৃষি বিভাগের পৰে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে। আর এই গাছের ঝরেপড়া পাতা থেকে ক্ষেতে তৈরি হচ্ছে জৈব সার। পাশাপাশি ক্ষেতের পোকা দমনে আর কীটনাশক প্রয়োগ করতে হচ্ছে না। এতে অর্থও সাশ্রয় হচ্ছে।
প্রতিবছর আমন ধান আবাদে শত্রু ও ৰতিকারক পোকামাকড় দমনে কৃষকদের ক্ষেতে রাসায়ন কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়। এতে ক্ষতিকারক পোকার সঙ্গে সঙ্গে উপকারী পোকাও ধ্বংস হচ্ছে। এতে করে ৰেতের উর্বরাশক্তি দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।
কৃষকরা বলছে আমন ক্ষেতে মাজরা, পাতা মোড়ানো, ঘাসফড়িং, চুঙ্গি, লেদাপোকাসহ নানা ধরনের ৰতিকারক পোকামাকড় আক্রমণ করে থাকে। ফলে আমন ধানের ব্যাপক ৰতি হয়। আর পোকামাকড় দমনে রাসায়নিক কীটনাশক আমন ক্ষেতে প্রয়োগ করতে গিয়ে প্রতারণার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে ৰতিগ্রসত্ম হচ্ছে। এ অবস্থায় চলতি আমন মৌসুমে আমন ক্ষেতের পোকামাকড় দমনে রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগের পরিবর্তে লাইভ পার্চিং পদ্ধতি প্রতি কৃষকদের আগ্রহী করে তুলেছে কৃষি বিভাগ। জানা যায়, লাইভ পার্চিং শব্দটি জীবনত্ম পার্চিং হিসেবে বোঝানো হয়েছে। জমিতে আফ্রিকান ধৈঞ্চা গাছে অসংখ্য পাখি বসে ফসলের শত্রম্ন পোকা খেয়ে উপকারী পোকার বংশ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করছে এবং কীটনাশক ওষুধের ব্যবহার বহুলাংশে কমে আনছে।
চলতি মৌসুমে নীলফামারী জেলায় আমনের আবাদ হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৮৭৫ হেক্টর জমিতে। আর যে সব এলাকার আমন ৰেতে ৰতিকারক পোকার আক্রমণ হয় বেশি সে সব এলাকার কৃষকদের এই পদ্ধতি গ্রহণে কৃষি বিভাগ এগিয়ে আসে। সংশিস্নষ্ট সূত্র মতে আমন ধানের ৰেতে লাইভ পার্চিং পদ্ধতি নিয়ে আসা হয় এবার নীলফামারী সদরে ১১ হাজার ৩৩৫ হেক্টরে, সৈয়দপুর উপজেলায় ৭ হাজার ২৪০ হেক্টরে, ডোমার উপজেলায় ১২ হাজার ১২৫ হেক্টরে, ডিমলা উপজেলায় ২ হাজার ৯৮ হেক্টরে, জলঢাকা উপজেলায় ২ হাজার ৪৭০ হেক্টরে ও কিশোরীগঞ্জ উপজেলায় ১ হাজার ৯৮২ হেক্টরসহ মোট ৩৭ হাজার ৩৫০ হেক্টরে।
ডিমলার কৃষক সাইফুল ইসলাম বললেন, তিনি এবার ৭ বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করেছেন। প্রতি বছর ধানের ৰেতে পোকার আক্রমণের শিকার হয়। পোকা মারতে টাকা খরচ করে বাজার থেকে অধিক মূল্যে কীটনাশক কিনে ৰেতে প্রয়োগ করেন। কিন্তু কোন কোন সময় কীটনাশক কাজ করে না। তার ওপর লোকসান গুনতে হয়। এবার কৃষি বিভাগ যেন জাদুর খেলা দেখাল। তাদের কথা মতো এবং তাদের বিনামূল্যে দেয়া আমন ৰেতে ধৈঞ্চার গাছ লাগাই। ওই গাছে প্রতিদিন অসংখ্য পাখী উড়ে এসে বসে। পাখীরা ধৈঞ্চার ডালে আশ্রয় নেয় এবং ধানের জমিতে ৰতিকারক পোকা ধরে ধরে খেয়ে ফেলে। ফলে ৰেত পোকামুক্ত থাকছে বিনা কীটনাশক প্রয়োগে। যা বড়ই উপকার করেছে আমাকে। জলঢাকার কৃষক হাসিনুর বললেন, তিনি তাঁর আমন ৰেতে লাইভ পার্চিং পদ্ধতির মাধ্যমে নজিরবিহীন সাফল্য পেয়েছেন। একদিকে পাখি পোকা খেয়ে ফেলছে, অন্যদিকে ধৈঞ্চা গাছের পাতা ও গুটি জমির মাটিতে ঝরে পড়ে নাইট্রোজেন সার সংযোজন করছে। কি যে উপকার পাচ্ছি তা বলার অপেৰা রাখে না। ডোমারের কৃষক মাইজালী মিয়া বললেন, কৃষি কাজে আফ্রিকান ধৈঞ্চা গাছ যে আমন ৰেতে এমন উপকার করে আগে জানলে এত দিন যে ৰতির শিকার হয়েছি তা আর হতো না।
সৈয়দপুর উপজেলার কয়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম জানান, তিনি এ বছর ৩ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করেছেন। প্রতিবছরই আমন ক্ষেত বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় আক্রমণ করে। তখন ক্ষেতের পোকা দমনে রাসায়নিক সার প্রয়োগে তাদের প্রচুর অর্থ ব্যয় হতো। কিন্তু এবার লাইভ পার্চিং পদ্ধতি অর্থাৎ ধৈঞ্চা গাছ লাগানোর ফলে তেমন একটা পোকামাকড়ের আক্রমণ হয়নি আমন ক্ষেতে। ধৈঞ্চা গাছে বসে পাখিরা ৰেতের ৰতিকারক পোকামাকড় খেয়ে ফেলছে। ফলে কৃষিবান্ধব এ পদ্ধতি প্রয়োগে তাঁর আমন চাষাবাদে বেশ উপকার হয়েছে এবং ফলনও ভাল হবে।
কয়া পশ্চিমপাড়ার কৃষক রজব আলী বলেন, পোকামাকড় দমনে পার্চিং পদ্ধতি তিনি প্রয়োগ করে উপকার পেয়েছেন।
কৃষি বিভাগের নীলফামারীর উপ-পরিচালক তিন তিনবার বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদকধারী মামুনুর রশিদ জানান, বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব সরকার। কৃষকদের উপকারে এবার ক্ষেতের পোকামাকড় দমনের কৃষিবান্ধব পদ্ধতি হচ্ছে পার্চিং। পোকামাকড় দমনে মূলত দু'ধরনের পার্চিং পদ্ধতি রয়েছে। এর একটি হচ্ছে 'লাইভ পার্চিং', যা আমন ক্ষেতে ধৈঞ্চা গাছ লাগানো। গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম সেচবানিয়া রোস্টট্রাটা। এটি আফ্রিকান জাত। অপর পদ্ধতিটি হচ্ছে 'ডেড পার্চিং' অর্থাৎ ফসলের ক্ষেতে গাছের ডাল কিংবা বাঁশের কঞ্চি পুঁতে দেয়া। তবে লাইভ পার্চিং কৃষকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে।
তিনি বলেন, সাধারণত আমনের বীজ বপনের সময় আমন বীজের সঙ্গে ধৈঞ্চা গাছের বীজও আমন বীজতলায় বপন করা হয়। আমন চারার সঙ্গে সঙ্গে এটিও লক লকিয়ে যথাযথভাবে বেড়ে ওঠে। এরপর জমিতে আমন বীজ বপনের ৫/১০ দিনের মধ্যে আমন ক্ষেতে ধৈঞ্চা গাছ রোপণ করতে হয়। তবে আমন বীজতলা থেকে তোলা একটি ধৈঞ্চা গাছ ২/৩টি অংশে কেটে আমন ক্ষেতে রোপণ করা হয়। আমন ধান গাছ বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এ গাছগুলোও বেড়ে ওঠে। পরবর্তীতে এ ধৈঞ্চা গাছগুলো যখন আমন গাছ অতিক্রম করে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ডালপালা ছড়িয়ে বেড়ে ওঠে, তখন এসব ধৈঞ্চা গাছে উড়ে এসে বসে বিভিন্ন পাখি। আর ওই পাখিগুলো আমন ক্ষেতের ৰতিকারক পোকামাকড় ধরে খেয়ে ফেলে। তাছাড়া ধৈঞ্চা গাছের ঝরেপড়া পাতা ও গাছের গুটি ফল আমন ক্ষেতের জমিতে ঝরেপড়ে প্রতিনিয়ত তৈরি করে জৈব সার। এতে করে লাইভ পার্চিং পদ্ধতির কারণে একদিকে আমন ক্ষেতে আক্রানত্ম পোকামাকড় দমন হয় অপর দিকে ক্ষেতে কৃষকদের রাসায়নিক কীটনাশক আর প্রয়োগ করতে হয় না। অন্যদিকে জমির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করার প্রয়োজন হচ্ছে না। ফলে আমন চাষাবাদে কৃষকদের অর্থনৈতিক দিকে থেকেও সাশ্রয় হচ্ছে। কারণ রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করতে কৃষকের অনেক অর্থ ব্যয় হতো। তাই কৃষি বিভাগের পরামর্শে এবার নীলফামারীর ৬ উপজেলার বিভিন্ন কৃষি বস্নকে এবং বিশেষ করে রংপুর বিভাগের আট জেলায় কীটনাশক দমনে কৃষিবান্ধব লাইভ পার্চিং ও ডেড পার্চিং পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন কৃষকরা। তিনি জানান, কৃষি বিভাগ লাইভ পার্চিংয়ের জন্য ধৈঞ্চার বীজ বিনামূল্যে সরবরাহ করেছে কৃষকদের মাঝে। তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ গোটা দেশে ছড়িয়ে দেয়া গেলে কৃষিক্ষেত্রে বৈপস্নবিক পরিবর্তন ঘটবে। ফসলে ভরে উঠবে দেশ। ব্যবহার কমবে রাসায়নিক কীটনাশকের।