মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ৯ অক্টোবর ২০১১, ২৪ আশ্বিন ১৪১৮
মৈত্রী ট্রেনে কমেছে যাত্রী বেড়েছে হয়রানি
মিজান চৌধুরী ॥ চিকিৎসার জন্য ভারত যেতে অমিতোষ পাল বেছে নেন বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী এঙ্প্রেসকে। প্রায় ১৩ ঘণ্টা পর পৌঁছেন ভারতে। এর মধ্যে চার ঘণ্টা কেটেছে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনে। দেশে ফিরে দুর্ভোগ ও কষ্টের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি মৈত্রী এঙ্প্রেস ব্যবহার না করার পণ করেন।
শুধু অমিতোষ পাল নয়, অনেক যাত্রীই এখন মৈত্রী এঙ্প্রেস ব্যবহার করছেন না। ফলে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা মৈত্রী এঙ্প্রেস। এদিকে মৈত্রী এঙ্প্রেসকে জনপ্রিয় করতে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানের সভাপতিত্বে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে মৈত্রী এঙ্প্রেসের কার্যক্রম তদারকি করতে রেলের (অপারেশন) মহাপরিচালককে প্রধান করে ৬ সদস্যের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রম্নপ গঠন করা হয়।
কমিটি মৈত্রী এঙ্প্রেসকে জনপ্রিয় করতে ঈশ্বরদী স্টেশন থেকে ট্রেনে যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা পরীৰা-নিরীৰা, এক ট্রেনের টিকেট অন্য ট্রেনে ব্যবহারের বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে আলোচনা, যাত্রীদের হয়রানি কমানো ও সময় বাঁচানোর জন্য মালামাল দ্রুত স্ক্যানিংয়ের ব্যবস্থা, অন বোর্ড ইমিগ্রেশন সিস্টেম চালুর বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে। এছাড়া খুলনা-বেনাপোল ট্রেনটি খুলনা-যশোর-বেনাপোল-নওগাঁ হয়ে কলকাতা পর্যন্ত চলাচলের জন্য সরকারের অনুমোদন গ্রহণে কাজ করবে।
মৈত্রী ট্রেনের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে বলা হয়, যে ধারণা নিয়ে ট্রেনটির যাত্রা শুরম্ন হয় কিন্তু তা বাসত্মবায়ন হয়নি। যাত্রীদের কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনে আড়াই ঘণ্টাসহ মোট সাড়ে ১০ ঘণ্টা সময় লাগছে উলেস্নখ করে বলা হয়, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের কাজকে সহজ করতে পারলে দুই ঘণ্টা কমিয়ে সাড়ে ৮ ঘণ্টায় ভারতে যাত্রী পেঁৗছে দেয়া সম্ভব।
ওই বৈঠকে সময় কমিয়ে আনা, ব্যাগ চেকিংয়ের তিনটি স্থানের জায়গায় দুইটি স্থান, যাত্রীদের সুবিধার জন্য রিটার্ন টিকেট ব্যবস্থা, ডগ স্কোয়ার্ড দিয়ে যাত্রীদের লাগেজ চেকিং, ভারতের হাইকমিশন থেকে যাত্রীদের ভিসাপ্রাপ্তির বিড়ম্বনা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের পর থেকে অন্য কোন স্টেশনে যাত্রী না তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়।
জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে ২০০৮-এর ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষে ঢাকা-কলকাতা রম্নটে যাত্রা শুরম্ন করে মৈত্রী এঙ্প্রেস। ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব) আবদুল মতিন ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশন থেকে মৈত্রী (৩১০৮) এঙ্প্রেসটি উদ্বোধন করেন। দু'দেশের মধ্যে ট্রেন যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত নতুন করে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে_ এমন মনত্মব্য সেদিন ছিল সবার মুখে।
২৩৪ আসনের ট্রেনটি ২০০৮ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর এই সাড়ে ৮ মাসে ৭ হাজার ৮৪১ যাত্রী বহন করে। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এ ৯ মাসে যাত্রী বহন করে ৭ হাজার ৮১১ জন। প্রথম বছর থেকে যাত্রীর সংখ্যা দ্বিতীয় বছরে এসে আরও হ্রাস পায়। বর্তমান প্রতিট্রিপে গড়ে ৬০/৬২ যাত্রী চলাচল করছে। প্রতিমাসে (৮ দিনে) লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রায় পৌনে তিন লাখ টাকারও বেশি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুুক রেলওয়ের একাধিক উর্ধতন কর্মকর্তার মতে, দু'দেশের মধ্যে মৈত্রী এঙ্প্রেস দু'টি চলাচলে সোহার্দপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার হবে এবং লাভবান হবে দু'দেশই। কিনত্ম ভারত সরকারের অনাগ্রহ, ভারতীয় সীমানত্মে যাত্রীদের হয়রানি, ভিসা জটিলতা এবং বিদ্যমান সমস্যা সমাধান না হওয়ায় মৈত্রী এঙ্প্রেসের এ বেহালদশা। ভারত-বাংলাদেশ সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে যে মৈত্রী এঙ্প্রেস যাত্রা শুরম্ন করেছিল তা আজ ভোগানত্মি আর লোকসানের প্রতীক। যাত্রী সঙ্কটের কারণে ইতোমধ্যে দু'টি বগি সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ মৈত্রী এঙ্প্রেসের (৩১০৮) এখন আসন সংখ্যা ২৩৪। ভারত মৈত্রী এঙ্প্রেস (৩১০৭) আসন সংখ্যা ২৬২।
জানা গেছে, মৈত্রী এঙ্প্রেসের জন্য প্রতিমাসে তেল খরচ হয় সাড়ে ৫ লাখ টাকার। স্টাফদের খরচ ২ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। মোট খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৮ লাখ টাকা। যাত্রীদের কাছ থেকে প্রতিমাসে আয় হচ্ছে প্রায় ৫ লাখ টাকা। প্রতিমাসে প্রায় পৌনে ৩ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের এক উর্ধতন কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে জানান, প্রায় ৩ বছরে গড়ে প্রতিট্রিপে ৬০ থেকে ৬২ যাত্রী হয়েছে। সম্প্রতি কিছুটা যাত্রী বেড়েছে বলে জানা গেছে।
চলতি বছরের মে মাসে ৩ হাজার ৭৪৪ আসনের জায়গায় মাত্র ৮৭২ যাত্রী ঢাকা-কলকাতা গেছে। রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, কখনও কখনও ২০/২৫ যাত্রী নিয়েও ট্রেনটি ঢাকা থেকে কলকাতা ছেড়ে গেছে। যাত্রীর মধ্যে ৯০ শতাংশ বাংলাদেশী আর ১০ শতাংশ ভারতীয়। দুটি মৈত্রী ট্রেন যাত্রীর আয় থেকে ৭৫ শতাংশ টাকা পাচ্ছে বাংলাদেশ আর ২৫ শতাংশ টাকা পাচ্ছে ভারত। মৈত্রী এঙ্প্রেসের এ দুরবস্থার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহ, ভারতীয় সীমানত্মে যাত্রীদের হয়রানি, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনে দীর্ঘ সময় লাগাসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধান না হওয়ায়ই মূলত দায়ী। সূত্র জানায়, মৈত্রী এঙ্প্রেসের ব্যাপারে ভারতের কোন আগ্রহ নেই।
ভিসা জটিলতা চরমে উঠেছে। ভিসাও দিচ্ছে কম। বাংলাদেশ সীমানত্মে দর্শনা স্টেশনে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনে সময় লাগত ২ ঘণ্টা ও ভারতের গেদে'তে সময় লাগত ৩ ঘণ্টা। এখন গেদে'তে ৩০ মিনিট ও দর্শনায় ১ ঘণ্টা কমিয়ে আনা হয়েছে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা গেদে কাস্টম এলাকার একটি নির্দিষ্ট জায়গায় যাত্রীদের অপেক্ষা করতে হয়। যাত্রীদের অভিযোগ, গেদে স্টেশনে যাত্রীদের প্রতিনিয়তই হয়রানির শিকার হতে হয়। একশ্রেণীর কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন কর্মচারীর হয়রানি সহ্য করতে হয় যাত্রীদের। তারা বকশিশের জন্য পিছু লেগে থাকে।