মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ৯ অক্টোবর ২০১১, ২৪ আশ্বিন ১৪১৮
সড়ক, জনপথের ৫১ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা
মাঠে নামছে দুদক
রাজন ভট্টাচার্য ॥ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশনে গিয়ে অনুকম্পা নেয়া সড়ক ও জনপথের আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজদের কেউ রেহাই পাচ্ছেন না। সড়ক ও জনপথের ৫১ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হচ্ছে চলতি মাসেই। দুর্নীতির মাধ্যমে তাঁদের অর্জিত সম্পদ অনুসন্ধানে মাঠে নামছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আজকালের মধ্যে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পৰ থেকে দুর্নীতিবাজ সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ফাইল পাঠানো হচ্ছে দুদকে। এর পরপরই আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হবে। পার পাচ্ছেন না অবসরপ্রাপ্ত দুর্নীতিবাজরাও। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বলছে, অনুকম্পা পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাকরিরত কিংবা অবসরে যাওয়া সবাইকেই আনা হচ্ছে আইনের আওতায়।
শুদ্ধি অভিযান শুরু ॥ ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে যোগাযোগ সেক্টরে শুরু হয় শুদ্ধি অভিযান। এই দিন সড়ক ও জনপথ বিভাগের ২১ কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। সওজ, বিআরটিএ-রেল বিভাগ মিলে মোট ২৫ জনের বিরুদ্ধে ওএসডির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ওএসডি হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তিন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, আট নির্বাহী প্রকৌশলী, তিন সহকারী প্রকৌশলী এবং ছয় উপ-সহকারী প্রকৌশলী রয়েছেন। তাঁরা হলেন সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সাহবাউদ্দিন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুূল আজিম জোয়ার্দার এবং জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) বদরুল আলম। ওএসডি হওয়া নির্বাহী প্রকৌশলীরা হলেন মঞ্জুর আহমেদ ভূইয়া, খন্দকার গোলাম মোসত্মফা, পিয়ার মোহাম্মদ, জর্জেজ হোসেন, সানাউল হক, এ কে এম আজাদ রহমান, আবু সালেহ মোঃ নুরুজ্জামান, শফিউল আজম ভূইয়া। ওএসডি হওয়া তিন সহকারী প্রকৌশলী হলেন মোসত্মাক আহমেদ চৌধুরী, নূর আলম ও আবুল বাশার। ওএসডি হওয়া এসব কর্মকর্তা বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ট্রুথ কমিশনে গিয়ে নিজেদের দুর্নীতির কথা স্বীকার করে অনুকম্পা নিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় এবার বিভাগীয় মামলাসহ দুদকের তদনত্মের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ সওজের ২১ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ওএসডি করার সঙ্গে সঙ্গে এঁদের বিরম্নদ্ধে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে পরামর্শ চাওয়া হয়। আইন মন্ত্রণালয় মতামতে জানায়, যারা ট্রুথ কমিশনে গিয়ে নিজের দুর্নীতি স্বীকার করে অর্জিত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়েছিলেন তাদের সকলের বিরম্নদ্ধে সরকারী কর্মচারী (শৃঙ্খলা এবং আপীল) বিধিমালা ১৯৮৫ অনুযায়ী বিভাগীয় মামলা দায়ের করে তদনত্মপ্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহন করা যাবে। একই সঙ্গে এদের দুর্নীতিমূলক কার্যকলাপ এবং অর্জিত সম্পদ সম্পর্কে দুদকের অনুসন্ধান-তদনত্মে কোন বাধা না থাকায় এঁদের সকলের বিরম্নদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দুদকে নথি প্রেরণ করতে হবে। শনিবার যোগাযোগ সচিব মোজাম্মেল হক খান জনকণ্ঠ'কে জানান, আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজদের বিরম্নদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি চলমান রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে পরামর্শ পাওয়ার পর বিষয়টি আরও জোরদার হয়েছে। আগামী দু'একদিনের মধ্যে দুর্নীতিবাজ সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ফাইল পাঠানো হবে দুর্নীতি দমন কমিশনে। ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে দুদককে তদনত্মের বিষয়টি জানানো হয়েছে।
তিনি জানান, বিভাগীয় মামলার বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন। মন্ত্রণালয়ের পৰ থেকে মামলা দায়ের করা হবে। একজন ইনকোয়ারি অফিসার বিভাগীয় মামলার পুরো বিষয়টি দেখভাল করবেন বলে জানান তিনি। বলেন, এর মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে কাজের পরিবেশ সৃষ্টি হবে। দুর্নীতির পথ থেকে অনেকেই সরে আসবেন।
তিনি তৃতীয় গ্রেডের
কর্মকর্তা বলে... তিনি তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা। সওজের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন কিছুদিন। নানামুখী চাপে তিনি পদত্যাগ করেছেন সম্প্রতি। সদ্য পদত্যাগ করা সওজের প্রধান প্রেকৌশলী মোঃ শাহাবউদ্দিনের বিরম্নদ্ধে বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নথি খোলা হয়েছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে। অভিযোগনামা ও অভিযোগের বিবরণীও প্রস্তুত। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বলছে, সওজের সাবেক এই প্রধান প্রকৌশলী একজন তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা। তাঁর বিরম্নদ্ধে বিভাগীয় মামলা রম্নজু করার জন্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদন প্রয়োজন। এই প্রেৰাপটে বিভাগীয় মামলা রম্নজু করতে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য খসড়া সারসংৰেপ প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন বিভাগীয় মামলার পরিবর্তে অধিকতর তদনত্ম করার জন্য বিষয়টি দুদকে প্রেরণ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। এর প্রেৰিতে তাঁর অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি তদনত্ম করবে দুর্নীতি দমন কমিশন। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-৪ (শৃঙ্খলা) শাখার একটি নোটসিটে বলা হয়, গত ২৬ সেপ্টেম্বর শাহাবউদ্দিনের বিরম্নদ্ধে খসড়া অভিযোগ বিবরনী পাওয়া যায়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুনর্ীতির কথা স্বীকার করে ট্রুথ কমিশনে (সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশন) গিয়ে যাঁরা জরিমানা দিয়ে অনুকম্পা গ্রহণ করেছেন তাঁদের মধ্যে সওজের তিন কর্মচারীসহ প্রকৌশলী রয়েছেন ৪৪ জন। এক প্রকৌশলী ইতোমধ্যে মারা গেছেন। কর্মরত আছেন ২১ জন। যাঁদের সবাই এখন ওএসডি। তবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ট্রুথ কমিশনে গিয়ে অনুকম্পা পাওয়া সওজের ৫১ কর্মকর্তা/কর্মচারীর নথি পাঠানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন সম্প্রতি বলেন, যারা ট্রুথ কমিশনে গিয়ে দুনর্ীতির স্বীকারোক্তি দিয়েছে তাদের কারও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে ঠাঁই হবে না।
সওজের আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সওজের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শাহাবউদ্দিন, নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুর আহমেদ ভূঁইয়া, সানাউল হক, খন্দকার গোলাম মোসত্মফা, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ নুরম্নল হক, নির্বাহী প্রকৌশলী পিয়ার মোহাম্মদ, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী গোলাম মোহাম্মদ, নির্বাহী প্রকৌশলী জর্জেস হোসেন, নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল আজিজ জোয়ার্দার, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোসত্মাক আহমেদ চৌধুরী, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ নূর আলম, ওয়ার্ক সুপারভাইজার আবদুল লতিফ বিশ্বাস, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সোহরাব উদ্দিন মিয়া, উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবদুর রাজ্জাক, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী বদরম্নল আলম ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবদুল মতিন।
অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবিএম ফখরম্নল আলম, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী একেএম ফয়জুর রহমান, প্রধান সহকারী টেকনিক্যাল রেজাই রাবি্ব মাতলুবুদ দারাইন, নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হক, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, নির্বাহী প্রকৌশলী এমএ মুকতাদির, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আদম আলী গাজী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোসত্মাক হোসেন, সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী, এমদাদুল হক, উপ-সহকারী প্রকৌশলী কাজী নজরম্নল ইসলাম, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী দারম্নল ইসলাম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী এএস সাইফুল ইসলাম, আবুল বাশার মিয়া, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবু সালেহ মোঃ নুরম্নজ্জামান, একেএম আজাদ রহমান, আবদুল হালিম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জলিলুর রহমান প্রামাণিক, হাবিবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী মৃধা নজরম্নল ইসলাম এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ। এঁদের সবাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ট্রুথ কমিশনে গিয়ে নিজেদের দুর্নীতির কথা স্বীকার করেন।
এর আগে চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ট্রুথ কমিশনে গিয়ে অনুকম্পা চাওয়া কর্মকর্তা কর্মচারীদের ফাইল তলব করা হয়। আট মে সংশিস্নষ্ট বিভাগের ৫১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর দলিল পাঠানো হয় প্রধানমন্ত্রীর দফতরে। প্রাপ্ত তথ্য ও দলিলাদি বিবেচনায় তাঁদের বিরম্নদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার সিদ্ধানত্ম হয়। এরপর মামলার বিষয়ে পরামর্শ চেয়ে আইন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়।